Image description

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলের সপ্তম কাউন্সিলকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দুই বিষয়ে বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান তেমন তৎপরতা দেখা না গেলেও ভেতরে ভেতরে ঠিকই কাজ চলছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। সে অনুযায়ী ব্যস্ত সময় কাটছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের। কাউন্সিলের তারিখ, নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে শিগগিরই দলীয় রূপরেখা দেওয়া হবে।

ক্ষমতাসীন বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর দলীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে তা ইতোমধ্যে এক দশক অতিক্রম করছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল। মূলত প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি বিএনপি, বলে দাবি নেতাদের।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পরপরই সপ্তম কাউন্সিলের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সদ্য নির্বাচিত হওয়া রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের মহাসচিব থাকাকালে ইতোপূর্বে একাধিকবার বলেছিলেন, খুব শিগগিরই দলের কাউন্সিল হবে। এক্ষেত্রে চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের জানুয়ারি-নাগাদ দলের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচিটি দ্রুত সম্পন্ন  করতে চান দলীয় হাইকমান্ড। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কৌশল ও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে। যদিও গুরুত্বপূর্ণ দুই ইস্যুতে চূড়ান্তভাবে কোনও কিছু খোলাসা করেননি নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দলীয় কাউন্সিল যেকোনও রাজনৈতিক দলের একটি নিয়মিত কর্মসূচি। তবে নানা সীমাবদ্ধতায় বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল সঠিক সময়ে করা সম্ভব হয়নি। এরইমধ্যে সপ্তম কাউন্সিলের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ নিয়ে কাজ করছেন নেতারা। অপরদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও বসে নেই দল।’’ কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় দুইটির মধ্যে সমন্বয় হবে কীভাবে প্রশ্নে মনি বলেন, ‘‘দুইটি তো আলাদা ইস্যু। তাই এক্ষেত্রে আলাদা টিম কাজ করছে। বিএনপির যেকোনও কাজই চলে স্বাভাবিক গতিতে। বিশেষ করে আগামীতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে কারা আসবেন, ভেতেরে ভেতরে তাদের আমলনামা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত এককভাবে করার সিদ্ধান্ত। দুটি বিষয়ই সমন্বয় করছেন দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান।’’ চূড়ান্ত কিছু জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি জানান।

কাউন্সিল বাস্তবায়নে মনিটরিং অ্যান্ড ডিজাইন কমিটি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, আসন্ন কাউন্সিলের আগে তৃণমূলকে গুছিয়ে নিতে চায় দলটি। এক্ষেত্রে জেলা ও মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। জেলার আংশিক কমিটিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ করা হবে। আর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হবে। অপরদিকে আগের আহ্বায়ক কমিটিগুলোতে কাউন্সিল করা হবে। শীর্ষ নেতারা আগেই জানিয়েছেন, এবার দল সাজানো হবে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে। আর প্রাথমিকভাবে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সমন্বয় করতে একটি মনিটরিং অ্যান্ড ডিজাইন কমিটি  গঠন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী একটি ছোট টিম ইতোমধ্যে কাজ শুরু করছে। তবে এসব কমিটিতে কারা আছেন, দলের পক্ষ থেকে তা এখনও জানানো হয়নি।

সূত্র আরও জানায়, কাউন্সিল বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে কাজ করবে একটি কোর কমিটি। এসব কাজ তদারকি করতে শিগগরিই স্থায়ী কমিটির সদস্য, যুগ্ম-মহাসচিব ও সিনিয়র নেতারা সাংগঠনিক বিভাগীয় এলাকা সফর করবেন। আর কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ হওয়ার পরপরই দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য প্রচার ও উপ-কমিটি শুরু করবে। এছাড়া যোগাযোগ অভ্যর্থনা তদারকির জন্যও থাকবে আরও কয়েকটি উপকমিটি। একই পদ্ধতিতে সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলোগেুলোকে পুনর্গঠন করা হবে বলে জানা গেছে।

কোন কৌশলে  করবে স্থানীয় নির্বাচন?  

দলীয় কাউন্সিলের প্রস্ততির পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক যুগ্ম মহাসচিব বলেন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপিতে প্রার্থী নির্ধারণ করবে স্থানীয় কমিটি। আর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়ন দেবে কেন্দ্রীয় কমিটি। এক্ষেত্রে ক্লিন ও গণমুখী ইমেজের প্রার্থীদের বাছাই করা হবে। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে দলের জন্য নিবেদিত ও ত্যাগী নেতাদের। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আমলনামা দলীয় হাইকমান্ডের হাতে পৌঁছেছে। তফশিল ঘোষণার পরপরই তাদের নাম প্রকাশ করা হবে। তবে প্রার্থী নির্ধারণ করতে গিয়ে বঞ্চিতদের পক্ষ থেকে অসন্তোষের আশঙ্কাকাকেও মাথায় রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে মন্ত্রী-এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য লবিং করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থের লেনদেনও হতে পারে। এই বিষয়গুলোতে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা সমন্বয় করবেন। তারা ব্যর্থ হলে তাদেরকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হবে। এরপরও সমাধান না হলে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্রটি আরও জানায়, দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হলে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। এক্ষেত্রে বিজয়ী হলেও সংশ্লিষ্ট নেতার জন্য দলের দরজা আজীবন বন্ধ থাকবে।

দলের আরেকটি সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধীদলগুলো আগেভাগে নিজস্ব প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করলেও বিএনপি এক্ষেত্রে কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি কিছুটা গোপনীয়তা বজায় রাখতে চায়। ভেতরে-ভেতরে অনেক জায়গায় প্রার্থী নির্ধারণও করা হয়ে গেছে। সূত্রটি আরও জানায়, মূলত সপ্তাহের প্রতি শনিবার সাংগঠনিক বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে এই ইস্যুতেই মতবিনিময় সভার আয়োজন করছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূলত সেখানেই আগামী স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া এগিয়ে রাখছেন তিনি। সাপ্তাহিক ওই বৈঠকে জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলছেন। সেখানে তাদের কাছ থেকে দলের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রতিশ্রুতি নিচ্ছেন। এতে নেতারাও দলের স্বার্থে ছাড় দেওয়ার ওয়াদা করছেন। সব মিলিয়ে বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বলে জানান নেতারা।

দুই ইস্যুতে আরও অপেক্ষায় রাখতে চায় হাইকমান্ড?

বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, আসন্ন কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন— দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। সেই আলোকে দলের উচ্চ পর্যায়ের টিম কাজ করছে। আর পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এখনই এসব বিষয়ে প্রকাশ্য কিছু বলতে চাচ্ছেন না নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি একটি বড় দল। তাই আমাদেরকে একইসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংগঠনিক কাজ— দুই দিক ঠিক রেখেই পথ চলতে হয়। সে অনুযায়ীই আগামী কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে।’’ কাউন্সিলের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এ নেতা জানান, এ বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে দলের সপ্তম কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে এ বিষয়ে কিছুটা প্রস্তুতি চলছে। যদিও এখনও চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হয়নি। যদিও সমন্বয় কমিটি কাজ করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দলের প্রস্তুতি কতটুকু? এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে আমাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতি চলছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন দলের হাইকমান্ড।’’ তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয় নির্বাচনকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিএনপি। শতভাগ সাফল্য অর্জনে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সমন্বয় থাকবে।’’ সামনের দুই এজেন্ডা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে  আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি জানান।