১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নাম–বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। এরপর কেটে গেছে ৪৮ বছর।
এই সময়ে দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো রাজপথে; কখনো এককভাবে, কখনো জোটের রাজনীতিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থেকেছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অবশ্য বিএনপির জন্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।
কারণ, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে দলটি। ফলে প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্তির এই সময়টিতে বিএনপির সামনে শুধু অতীতের সাফল্য স্মরণ করার সুযোগ নেই; বরং ক্ষমতায় ফিরে দলটি কোন পথে হাঁটবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যেভাবে শুরু
বিএনপির জন্ম বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক বছরের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির আত্মপ্রকাশ। দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রাখা হয় জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় স্বনির্ভরতার মতো বিষয়।
প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুতই বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির বড় জয় তাকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করে।
কিন্তু দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বেশিদিন নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেয়নি সময়। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন তিনি। এরপর বিএনপির সামনে তৈরি হয় নেতৃত্বের বড় প্রশ্ন।
খালেদার আবির্ভাব
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। শুরুতে তিনি ছিলেন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পরে ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে ওঠেন বিএনপির প্রধান মুখ।
১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। সেই সরকারে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল–রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামো থেকে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।
ক্ষমতা, বিরোধিতা এবং আবার ক্ষমতা
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তবে একই বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পায় এবং খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির সামনে নতুন সংকট তৈরি হয়। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বিরোধী রাজনীতিতে চলে যায়।
দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি
পরবর্তী বছরগুলো বিএনপির জন্য ছিল রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময়। নির্বাচন নিয়ে বিরোধ, সরকারবিরোধী আন্দোলন, মামলা এবং দলীয় নেতৃত্বের নানা সংকট–সব মিলিয়ে বিএনপিকে দীর্ঘ সময় রাজপথে থাকতে হয়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি দলটি। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব বিএনপির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান বিদেশে থেকে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে থাকেন। ফলে বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্র ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের দিকে সরে যায়।
২০২৪: বদলে গেল রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ছিল একটি বড় বাঁকবদল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি তখন নতুন বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। এরপর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন দলটির জন্য নিয়ে আসে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন।
নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পায়। মূল নির্বাচনের পর বগুড়া-৬ আসনটি তারেক রহমান ছেড়ে দেওয়ায় এবং শেরপুর-৩ আসনে একজন বৈধ প্রার্থী মারা যাওয়ায় দুই আসনে উপনির্বাচন হয়। উভয় আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাওয়া দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির দাপুটে প্রত্যাবর্তন যেমন, তেমনি পাহাড়সম জনপ্রত্যাশার চাপের স্মারক হয়ে আছে।

তারেক রহমানের বিএনপি
বিএনপির এবারের প্রত্যাবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্ব। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলের নেতৃত্ব এখন তার ছেলে তারেক রহমানের হাতে। বিএনপির প্রতিষ্ঠার সময় যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল, তার সঙ্গে ২০২৬ সালের বাংলাদেশকে তুলনা করলে ব্যবধান অনেক।
তখন রাজনীতির প্রধান মাধ্যম ছিল সভা-সমাবেশ, মিছিল ও সংবাদপত্র। এখন রাজনীতির বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তরুণ ভোটার, অনলাইন প্রচার এবং তাৎক্ষণিক জনমতের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সামনে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রশ্ন নয়; দলটির পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা ও সংগঠনকে নতুন প্রজন্মের কাছে কতটা কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক ভাষা হাজির করার চেষ্টা করছেন।
বিএনপি কী করবে?
বিরোধী দলে থাকা আর সরকার পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। বিএনপি এতদিন যে বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করেছে, এখন সেগুলোর বাস্তব সমাধান দেওয়ার দায়িত্ব দলটির ওপর।
অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি–এসব ক্ষেত্রেই সরকারের কাজের ফলাফল সাধারণ মানুষ সরাসরি দেখতে চাইবে। দলের ভেতরেও রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় তৃণমূল পর্যায়ে নানা ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কোন্দল ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার খবরও সামনে এসেছে।
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এসব নিয়ন্ত্রণ করা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে।
পুরোনো বিএনপি, নতুন বাংলাদেশ
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি বড় অংশ। জিয়াউর রহমানের সময়ের বিএনপি, খালেদা জিয়ার সময়ের বিএনপি এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি–তিনটি পর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। দলটির সামনে এখন যে বাংলাদেশ, সেটিও ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশের মতো নয়।
এই সময়ে তরুণদের প্রত্যাশা বদলেছে। অর্থনীতির কাঠামো বদলেছে। তথ্যপ্রযুক্তি রাজনীতির ধরন বদলে দিয়েছে। আর ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর ভোটারদের বড় একটি অংশের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ফলে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্মদিন হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি এমন একটি দলের ৪৮ বছর পূর্তি, যে দলটি প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুত ক্ষমতায় গেছে, ক্ষমতা হারিয়েছে, রাজপথে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে, নেতৃত্বের সংকট পার হয়েছে এবং আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে।
এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো–ক্ষমতায় ফিরে তারা নিজেদের ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কীভাবে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার মডেলে রূপ দেয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এবার কী করছে বিএনপি?
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
১ সেপ্টেম্বর সকালে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন। এ ছাড়া আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো কর্মসূচিও রয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরেও এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ, ৪৮ বছর আগে যে দলটির জন্ম হয়েছিল, একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায়, সেই দলই আজ আরেকটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়।
ইতিহাস বিএনপিকে বারবার সুযোগ দিয়েছে। এবার সেই ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হলো–ক্ষমতায় ফিরে দলটি কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করে।