সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে গ্রেপ্তারের পর তার প্রতারণা ও প্রভাব বিস্তারের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এরশাদ জীবিত থাকাবস্থায় বারিধারার একটি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির চুক্তি করা হয়। ক্রেতার কাছ থেকে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে তাকে অ্যাপার্টমেন্টটি রেজিস্ট্রেশন করে দেননি বিদিশা। পরে গোপনে আরেকজনের কাছে অ্যাপার্টমেন্টটি বিক্রি করেন তিনি। শুধু এই ঘটনা নয়, আওয়ামী শাসনামলে প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় গুলশানে আরেকটি ফ্ল্যাট ও নিকেতন আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ি দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ‘নিজের সন্তান’ নিয়েও নানা জালিয়াতি ও প্রতারণার তথ্য এখন সামনে আসছে। একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর গুলশান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিদিশার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা রয়েছে। সেই মামলায় দুই বছরের সাজাও হয়েছে। সাজার পরোয়ানা থাকায় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিদিশার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলায় গত ২০ মে বিদিশাকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম ওই রায় ঘোষণা করেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি বিদিশাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর আগে আওয়ামী শাসনামলে এই মামলায় গুলশান থানা পুলিশ বিদিশাকে গ্রেপ্তার করতে তার বাসায় যায়। তখন বিদিশা অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া গুলশান থানার তৎকালীন ওসির চাকরি খাওয়ার হুমকি দেন। একপর্যায়ে চাপের মুখে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এরপর হাইকোর্টের মাধ্যমে ওই মামলার বিচারে স্থগিতাদেশ নেন বিদিশা। কিন্তু বাদী পক্ষ উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্থগিতাদেশ বাতিল করে মামলা বিচার পর্যায়ে নিয়ে যান।
২০০১ সালে বারিধারার একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্দেশ্যে তিনি বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বারিধারা এলাকার প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য ৮০ লাখ টাকায় চুক্তি হয়
মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন জানান, তিনি মিরপুর-১০ এলাকায় স্যানিটারি পণ্যের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী। ২০০১ সালে বারিধারার একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্দেশ্যে তিনি বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বারিধারা এলাকার প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য ৮০ লাখ টাকায় চুক্তি হয়।
২০০১ সালের ১০ জুলাই বিদিশা বাদীকে বনানীর রজনীগন্ধা অফিসে ডেকে নেন এবং তার মনোনীত ব্যক্তি ও বন্ধু আব্দুল রাজ্জাকের নামে ৭৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিতে বলেন। বাদী স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে ওই টাকা পরিশোধ করেন। পরে উভয়ের মধ্যে বায়নানামা সম্পাদিত হয়।
আওয়ামী লীগ আমলে এরশাদকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে বিদিশাকে ব্যবহার করা হতো। এ কারণে তখনকার সরকার ও প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতেন বিদিশা। একই সঙ্গে পাশের একটি দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল
চুক্তি অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বাকি টাকা পরিশোধের পর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা ছিল। ২০০২ সালের ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে আরেকজনের কাছে সাব-বিক্রি করে রেজিস্ট্রেশন করে দেন।
বিষয়টি জানার পর, ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিলে বিদিশা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৭২ লাখ টাকার একটি চেক দেন বিদিশা। তবে নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকে জমা দিলে হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়।
মোশারফ হোসেনের অভিযোগ, এরপর বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে টাকা কিংবা ফ্ল্যাট কোনোটিই বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। একইসঙ্গে টাকা ফেরত বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করলে সন্ত্রাসী দিয়ে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। মামলায় দাবি করা হয়, বিদিশা বাদীকে জানিয়েছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের কাছ থেকে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
প্রসঙ্গত, এ মামলার রায়ের পর গত ২০ মে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বিদিশাকে কল করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এই মামলার বিষয়ে আমার কোনো আইডিয়া নেই।’
জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে এরশাদকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে বিদিশাকে ব্যবহার করা হতো। এ কারণে তখনকার সরকার ও প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতেন বিদিশা। একই সঙ্গে পাশের একটি দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এ কারণে নানা অপকর্ম করেও তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি। অপকর্মের কারণেই এবার গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। তার এই গ্রেপ্তারের পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই বলেও দাবি সূত্রটির।