লোয়ি ইনস্টিটিউটের নিবন্ধ
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউট। এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চীনের বৃহত্তর প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়ান ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় শেখ হাসিনা জানান, তিনি ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান। দেশে ফিরে তাঁর লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জাতীয় ঐক্য এগিয়ে নেওয়া বলেও জানান তিনি।
তবে লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ভারতের ওপরও পড়তে পারে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দমনে সহিংস ভূমিকার অভিযোগে অনুপস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। জাতিসংঘের এক তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিলেও অর্থনৈতিক চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এদিকে হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবও প্রকাশ্যে আসে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নয়াদিল্লি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে তাঁর অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু নয়াদিল্লি এখনো সেই দাবি পূরণ করেনি। ফলে ভারতে হাসিনার অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও বিস্তৃত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তাঁর প্রথম বড় বিদেশ সফরে চীন যান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এ অবস্থায় হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নয়, ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দিল্লির জন্য একদিকে সাবেক মিত্র শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নিবন্ধটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হাসিনা ভারতে অবস্থান করলে ঢাকার সঙ্গে অবিশ্বাস আরও বাড়তে পারে এবং বাংলাদেশ চীনের দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতে হাসিনার দেশে ফেরা ছাড়াও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শীর্ষনিউজ