Image description

পাবনায় কয়েক সপ্তাহের লাগামহীন লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি খামারিরা। হিট স্ট্রোকে মুরগির মৃত্যুতে কমছে ডিম উৎপাদন। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে লোকসানে খামার বন্ধ করতে হবে অনেকের।

খামারিদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে গত কয়েক বছরে মুরগির বাচ্চা, ফিড ও ওষুধের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। উৎপাদন খরচের অনুপাতে বাড়েনি ডিম-মুরগির দাম। টিকতে না পেরে ইতোমধ্যে সাত হাজারের বেশি প্রান্তিক খামারি ব্যবসা গুটিয়েছেন। কোনোমতে টিকে থাকা খামারিদের জন্য এখন লোডশেডিং ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে।

সদরের খামারি নাজমা খাতুন জানান, মাসখানেক আগে এনজিওর ঋণে তিনি ৩৫০টি ব্রয়লার মুরগি কেনেন। খাবার, ওষুধ, বাচ্চা কেনাসহ প্রায় এক লাখ টাকার বিনিয়োগ। গত এক সপ্তাহে দিনে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে হিট স্ট্রোক, শ্বাসকষ্টসহ নানা কারণে ৮০টি মুরগির মৃত্যু হয়। পরে বাধ্য হয়ে বাকি মুরগি কম দামে বিক্রি করেন। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হবে বলে জানান তিনি।

 

খামারে খাবার ও পানি সরবরাহ, সঠিক তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু এখন দিন-রাত মিলে ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহারে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

 

সহজ বিপণনব্যবস্থার কারণে ২০০০ সালের পর থেকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পাবনায় কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার গড়ে উঠেছে। বর্তমানে জেলাটি মুরগি ও ডিম উৎপাদনে দেশের অন্যতম। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাবনার ডিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ কা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে মুরগি। স্ট্রিম ছবি
বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে মুরগি। স্ট্রিম ছবি

প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, পাবনায় নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত তিন হাজার ৪৩টি মুরগির খামার রয়েছে। অথচ পাঁচ বছর আগেও এর প্রায় তিনগুণ। গত দুই-তিন বছরে পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। দুই-তিন বছর আগে যে ফিডের বস্তার দাম ছিল ২ হাজার ৪০০ টাকা, এখন তা ৩ হাজার ৪০০। ওষুধের দাম বেড়েছে। অনেক ভ্যাকসিন ও ওষুধ আমদানি বন্ধ। এতে সংক্রামক রোগে মুরগি মারা পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে খামারিদের জন্য নতুন ধাক্কা লোডশেডিং।

খামারে খাবার ও পানি সরবরাহ, সঠিক তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু এখন দিন-রাত মিলে ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহারে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

সদরের মালিগাছা ইউনিয়নের খামারি ওয়াসিম জানান, তাঁর খামারে তিন হাজার ৩০০ মুরগির মধ্যে মাত্র হাজারখানেক বেঁচে আছে। তীব্র গরমে মুরগি কম খাবার খাচ্ছে, রোগবালাই বাড়ছে এবং ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। এক হাজার মুরগি থেকে আগে দিনে ৩২ থেকে ৩৫ খাঁচি ডিম পাওয়া গেলেও, এখন তা নেমে এসেছে ২৪ থেকে ২৬ খাঁচিতে।

জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মনি জানান, জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় ২০০ টাকা হারে দিনে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা বাড়তি লাগছে। বাধ্য হয়ে অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই কম দামে মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ খামার একেবারে বন্ধ করেছেন। পোলট্রি খাতকে বাঁচাতে হলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কবে উন্নতি হবে, জানাতে পারেননি স্থানীয় নেসকো ও পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা। পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা। সারা দেশেই একই চিত্র। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে লোডশেডিং কমে আসবে।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, হিট স্ট্রোক থেকে মুরগি বাঁচাতে খামারিদের স্যালাইন ও বিটেইনজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকার পোলট্রি খাতে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। খাদ্য ও ওষুধে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এসব সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে খামারিরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।