Image description

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবগুলো এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে বিএনপিকে ‘হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে’ দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।

শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

সিজিএসের গবেষণা প্রকল্প ‘রিফর্ম ওয়াচ’-এর আওতায় জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে প্রস্তুত মধ্যবর্তী প্রতিবেদনের ফলাফল উপস্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিতে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ১৬টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তবে সবগুলো বিএনপির দেওয়া নয়। বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাব এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে বিএনপিকে হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীদের আসন নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। সেখানে ৫০টি সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি আরও ৫০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

বিএনপির এই নেতা বলেন, বিভিন্ন আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে বাস্তবসম্মত কোনো পথ নেই। দীর্ঘদিনের নির্যাতনের মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীরা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শাহাদাত বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করাই জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেক সময় আমাদের ধারণা থাকে, সবকিছু একসঙ্গে হয়ে যাবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র মূলত একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি এবং ধারাবাহিক চর্চার বিষয়।

তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে একটি ভালো নির্বাচন হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর অনেকেই এটিকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলে মনে নাও করতে পারেন।

সংলাপে বিএনপির সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা, বেকারত্ব ও বৈষম্য বেড়েছে। এসব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা জরুরি। ৫ আগস্টের পর আরও পরিণত রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা, আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের পর মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত এবং একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা হলে মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, জুলাইয়ের চেতনার আলোকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার করতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পুলিশের পুরোনো দমনমূলক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কারের বড় একটি সুযোগ তৈরি হলেও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে পরবর্তী সময়ে সেই ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। জুলাই সনদের উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিবাচক হলেও এর সূচনাপ্রক্রিয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

তিনি বলেন, সংসদের বিদ্যমান কমিটিগুলো সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিল আকারে পাস করতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কমিশন ও বিচারক নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিশেষ করে পুলিশ সংস্কার জরুরি।

বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে কার্যকর ভূমিকা এবং সংসদের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রকৃত অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্থানীয় সরকারকে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত করাও জরুরি।

জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে সহনশীল রাজনীতির চর্চা গড়ে ওঠেনি। ক্ষমতার পরিবর্তন বারবার সংঘাতের মধ্য দিয়ে হয়েছে। সরকার পরিবর্তিত হলেও কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসেনি। সহনশীল মানসিকতা ছাড়া গণতন্ত্র এগোতে পারে না।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, রাষ্ট্রে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে আমলাতন্ত্রের সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই সনদে নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের গণতান্ত্রিক চাহিদা এবং নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, গণতন্ত্রকে নিয়মিত চর্চার মধ্যে রাখতে হবে এবং জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচার বিভাগ, পুলিশ ও গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর সংস্কার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, জুলাইয়ের সংস্কারকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। নারীদের বাস্তব রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সদস্য লামিয়া ইসলাম বলেন, দেশের সংকটের সময়ে নারীরা সবসময় সামনের সারিতে থেকেছেন। তাই নীতিনির্ধারণেও তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সময়ের সঙ্গে আইন ও সংবিধান হালনাগাদ করা প্রয়োজন। ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর সংস্কার জরুরি।

খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম বলেন, পুলিশ প্রশাসনের ঔপনিবেশিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, মৌলিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে নিতে হবে। স্থানীয় সরকার ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমান সুযোগ, মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণেও রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না এলে পুরোনো ব্যবস্থাই বহাল থাকবে।

১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য তাসমিয়া প্রধান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া এবং সংস্কার কার্যক্রম শুরু না হওয়া হতাশাজনক। প্রকৃত সংস্কার হলে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়বে।

একই জোটের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নী বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি নারীদের নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, সংস্কারের জন্য স্পষ্ট ও অগ্রাধিকারভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। রাজনৈতিকীকরণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে জবাবদিহি, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, গণভোট ও সংস্কার নিয়ে নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থানের বৈপরীত্য জনগণকে হতাশ করতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।