Image description

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে জ্বালানি বাজার।

আজ শনিবার বিকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ আশঙ্কার কথা জানান। ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে দলের অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে গোলাম পরওয়ার বলছিলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের পরিবর্তে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে।

তিনি জানান, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একটি খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার দিনের মধ্যে এ বিষয়ে খসড়া প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, ‘এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’

জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাত যুক্ত হলে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং এতে দাম কমবে— সরকারের এমন যুক্তিও নাকচ করেন জামায়াতের এই নেতা। তার মতে, এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বৃহৎ ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বড় অঙ্কের ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে খুব অল্পসংখ্যক বড় শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষেই এ খাতে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।

এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে নতুন করে বেসরকারি একচেটিয়া বাজার তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) লোকসানি ও অদক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে বেসরকারিকরণের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল।

বর্তমান জ্বালানি সংকটকে বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখারও বিরোধিতা করেন গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক সংকটই মূলত এর পেছনে কাজ করছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশের ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান করছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন—এ তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।

এদিকে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটের মধ্যে গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

তার আশঙ্কা, এত কম সময়ে দরপত্র আহ্বান ও প্রক্রিয়া শেষ করা হলে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দামে তেল কেনা এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

‘দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

জামায়াত বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেলের বাজার রয়েছে। এ বাজার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য অতিরিক্ত মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার বাড়তি আয়ে পরিণত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।

জ্বালানি তেলকে সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখার আহ্বানও জানিয়েছে দলটি। গোলাম পরওয়ার বলেন, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিমান চলাচলের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জ্বালানি সরাসরি সম্পৃক্ত।

দেশে বর্তমানে একটি মাত্র শোধনাগার (ইস্টার্ন রিফাইনারি) থাকা এবং দেশের সীমিত জ্বালানি মজুত সক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। যুদ্ধ, দুর্যোগ বা বড় ধরনের সংকটের সময় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্র কীভাবে জ্বালানি সরবরাহে বাধ্য করবে— এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দুর্গম ও অলাভজনক এলাকাতেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একইভাবে জ্বালানি সরবরাহ করবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামতও তুলে ধরে জামায়াত। দলের সেক্রেটারি জেনারেল সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটিকে মুনাফার খাতের পরিবর্তে সীমিত মুনাফায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করাই জনস্বার্থসম্মত।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানিকে মুনাফার পরিবর্তে সেবাখাত হিসেবে বিবেচনার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার আশঙ্কা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থায় গেলে এলপিজি খাতের মতো জ্বালানি তেলের বাজারেও সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জামায়াতের দাবি, গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়ার সূচনা ইতোমধ্যে হয়েছে।

বেসরকারিকরণের উদ্যোগ বন্ধের পাশাপাশি নীতিমালা প্রণয়নে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। খসড়া নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিন জনমত নেওয়া, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি এবং বিপিসিকে বেসরকারিকরণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি বিপিসিতে স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং জ্বালানি তেল ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করার দাবি করেছে জামায়াত। প্রতি তিন মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশের পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি তাদের। শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা কমানোর সব সুপারিশ প্রত্যাহারের আহ্বানও জানানো হয়।

গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বাজার অর্থনীতি কিংবা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়। তাদের আপত্তি জবাবদিহিহীনভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায়। প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।’