Image description

ছাত্রদল যেভাবে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস শুরু করেছে, তা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এই সরকারের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বক্তারা।

 

তারা বলেন, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে তাদের মাঠে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও গণহত্যার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে দিয়েছে।

 

বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিষয় আড়াল করার জন্য ক্যাম্পাসগুলোকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে।

 

বুধবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সব গণহত্যার বিচার নিশ্চিতকরণ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়াসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে’ আয়োজিত ছাত্র গণজমায়েতে তারা এসব কথা বলেন।

 

সমাবেশে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, গতকাল ক্যাম্পাসগুলোতে যারা হামলা চালিয়েছে, তারা প্রকৃত ছাত্র নয়; বরং তারা ছাত্র সন্ত্রাসী ও বহিরাগত। ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে যাদের দিয়ে কমিটি করেছে, তাদের অনেকের ছাত্রজীবন ১৫ থেকে ২০ বছর আগেই শেষ হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসব ‘আদুভাই’ দিয়ে ক্যাম্পাসের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে ভাড়া করা সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাসে আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়ায় সশস্ত্র হামলা এবং রাতে ঘুমন্ত শিক্ষার্থী ও ঢাকা গ্রাফিক্স আর্টস কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগও করেন তিনি।

 

শিবির সভাপতি বলেন, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের লাগাম টানা না হলে এবং বিএনপির বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা না হলে রাজপথে তাদের সন্ত্রাস প্রতিহত করা হবে।

 

তিনি আরও বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। বারবার তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পূর্বের ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্ত ফিরিয়ে আনতে তারা ক্যাম্পাসগুলোতে আবারও হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু করতে চায়।

 

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এই ‘সন্ত্রাসী দলের’ লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রজনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সহনশীলতাকে দুর্বলতা মনে না করার আহ্বান জানান তিনি।

 

তিনি বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি এবং ক্যাম্পাসগুলোতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বারবার অবহিত করা হলেও এবং ডিএমপি কমিশনার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের আশ্বাস দিলেও হামলাকারীদের হাতে চাপাতি, গ্রিজ, কোদাল ও রিভলভার দেখা গেছে। তাদের পাশে পুলিশ অবস্থান করেছে এবং ছাত্রলীগকে যেভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ বাহিনী আবারও নব্য ফ্যাসিবাদের আশ্রয়দাতায় পরিণত হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

 

তিনি বলেন, প্রতিটি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এরপর কোনো ক্যাম্পাসে রক্তপাত হলে এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। জাতীয় রাজনীতি উত্তপ্ত হলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি রক্তবিন্দুর জবাব নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

 

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা ভেবেছিলাম বিএনপির সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে এবং এবার শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ফিরে আসবে। সেখানে মেধার চর্চা ও গবেষণা হবে এবং আলোকিত মানুষ তৈরি হবে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, ক্যাম্পাসগুলো দখল করে পুনরায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার এই পরিবেশ জুলাই বিপ্লবের ফসল। ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে নিজেদের চরিত্র ও আদর্শের মাধ্যমে ছাত্রদলকে পরাজিত করেছে এবং ছাত্রসমাজের সমর্থন পেয়েছে। এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরাজয়কে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েই ছাত্রদল সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

তিনি সরকারকে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। অন্যথায় জনগণ সরকারকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি পুলিশের আইজিপি ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের উদ্দেশে অভিযোগ করে বলেন, গতকাল পুলিশের উপস্থিতিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী, গুন্ডা ও বহিরাগতরা ‘হায়নার মতো’ হামলা চালিয়েছে।

 

তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের আগের আইজি ও কমিশনারের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তারাও একই ধরনের কাজ করেছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের রক্ষা করতে পারেননি।

 

তিনি আরও বলেন, ভারতের সেবাদাস শেখ হাসিনা জনতার আন্দোলনের মুখে কীভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ইতিহাস বর্তমান সরকারের জানা আছে। জানা না থাকলে তা জেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সেই পরিণতি স্মরণে থাকলে এত দ্রুত এসব কর্মকাণ্ডে জড়ানোর কথা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম এমপি বলেন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ভালো করেই চেনে। তারা জানে বলেই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল।

 

তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে চলমান গণঅভ্যুত্থানকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ইসলামী ছাত্রশিবির ধৈর্য, সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে চলমান গণআন্দোলন এগিয়ে নিয়ে শেখ হাসিনার পতন ত্বরান্বিত করাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বিরোধের মূল কারণ মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নয়; বরং ছাত্রদল টেন্ডারবাজি করতে চায় এবং ছাত্রশিবির তা করতে দিতে চায় না।

 

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টই এর ফয়সালা হয়ে গেছে। নতুন করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে ছাত্রদের মন জয় করা যাবে না এবং মেধা ও কোটার ভিত্তিতে কোনো হল তো দূরের কথা, একটি আসনও দখল করতে দেওয়া হবে না।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের ক্যাম্পাস দখলের পরিকল্পনা শুধু ছাত্রশিবিরকে বের করে দেওয়া নয়; বরং ক্যান্টিনে বিনা মূল্যে খাওয়া এবং ক্যান্টিনগুলোকে দেউলিয়া করার পরিকল্পনাও এর অংশ।

 

৫ আগস্ট বিজয় উৎসব পালনের দিনে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে দাঁড়ানো বাংলাদেশ, বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য লজ্জার বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে বাধ্য হয়ে তারেক রহমানকে নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

তিনি তারেক রহমানকে ছাত্রদলকে নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছাত্রদলকে সামলানো না হলে ছাত্রলীগ যেমন আওয়ামী লীগের পতন ত্বরান্বিত করেছে, এই ছাত্রদলও তারেক রহমানের রাজনৈতিক পতন আরও দ্রুত নিশ্চিত করতে পারে।

 

ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় আয়োজিত ছাত্র গণজমায়েতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর শাখার নেতারা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।