Image description

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতার পুরোনো আলোচনা আবার নতুন করে সামনে এসেছে। এসব হামলার পেছনে বিএনপির ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীদের দায়ী করা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার আড়ালে দলটির আরও বড় কিছু সমস্যা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে–যার একটি এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক দুর্বলতা, আর অন্যটি হলো মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নড়বড়ে অবস্থান। এই দুই কারণেই ধীরে ধীরে দলটির প্রতি মানুষের আস্থা কমে আসছে।

সম্প্রতি এনসিপি নেতাদের ওপর পর পর কয়েকটি হামলার পর এ নিয়ে আলোচনা আরও তুঙ্গে ওঠে। হবিগঞ্জের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা তৈরির পর, সিলেট অঞ্চল থেকে মিছিল শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন দলের প্রধান সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী।

স্থানীয় পত্রিকার খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের কারণেই স্থানীয় বিএনপি সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা চালায়। তবে ঘটনার পেছনে কারণ যা-ই থাক না কেন, বিশ্লেষকরা একে বাংলাদেশের রাজনীতির এক পুরোনো ও গভীর ব্যাধি হিসেবেই দেখছেন। আর তা হলো প্রতিপক্ষের ভিন্নমত বা সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই এনসিপির জন্ম। সেই আন্দোলন রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের এক নতুন দলকে সামনে নিয়ে আসে এবং মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও সমর্থন পায়। সেই সময় দেশের মানুষ এই আন্দোলনকে পুরোনো ও পচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এক বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। তাদের সাধারণ সমর্থকরা ভেবেছিলেন, এই নতুন শক্তিই দেশে জবাবদিহিতা আনবে, শাসনব্যবস্থার সংস্কার করবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে।

দলটির জন্ম হয়েছিল এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। সে সময় আওয়ামী লীগ মূলধারার রাজনীতিতে পুরোপুরি অনুপস্থিত, আর অন্যদিকে বিএনপি প্রধান শক্তি হিসেবে মাঠে রয়ে গেছে। ফলে অনেক সাধারণ মানুষ এনসিপিকে দেশের প্রধান দুই ধারার বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এনসিপির এই সুদিনের পেছনে তাদের সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে আন্দোলনের প্রতি মানুষের আবেগ এবং পুরোনো দলগুলোর ওপর ক্ষোভই বেশি কাজ করেছিল।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি ৬টি আসনে জয় পায় এবং বিরোধী জোটের একটি ছোট অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

একটি সামাজিক আন্দোলন যখন একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। তা ছাড়া, আন্দোলনের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছিলেন, আবার তারাই পরবর্তীতে এনসিপি গঠনে অংশ নেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলন, সরকার আর এনসিপি—এসবের মধ্যকার পার্থক্য একরকম ঝাপসা হয়ে যায়।

কিন্তু আন্দোলন থেকে যেসব বড় বড় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এসেছিল—যেমন বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতি দমন—সেগুলোর কাজ মানুষের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ধীরগতিতে এগোতে থাকে।

কাগজে-কলমে এনসিপি ও অন্তর্বর্তী সরকার আলাদা হলেও, মানুষ মনে মনে দুটোকে এক করেই দেখেছে। ফলে সরকারের কাজকর্মে ধীরগতি দেখে মানুষের মনে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তার দায় এনসিপির ওপরও গিয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন থেকে মানুষের মনে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা যেহেতু সরকারের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল, তাই সরকারের পারফরম্যান্সের দায় থেকে এনসিপি নিজেদের পুরোপুরি আলাদা করতে পারে না।

পাশাপাশি, সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন এনসিপির ভাবমূর্তিকে আরও সংকটে ফেলে দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা সবকিছুতে স্বচ্ছ থাকবে, উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাবও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, শেষ পর্যন্ত সেই কথা রাখা হয়নি।

একই সময়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক উপদেষ্টা ও প্রাক্তন ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর গুঞ্জন উঠতে থাকে। যদিও এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের কোনোটিরই সত্যতা পাওয়া যায়নি, তবুও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, অভিযোগ ওঠার পর তদন্তে দেরি হলে সত্য-মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার আগেই মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যায়।

এর পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও রদবদল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়, যার অনেকগুলোই রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর এবং এখনো সমাধান হয়নি।

এদিকে, ২০২৫ সালে এনসিপি তাদের নতুন আর্থিক নীতি এবং ক্রাউডফান্ডিং বা জনগণের কাছ থেকে তোলা তহবিলের কথা ঘোষণা করে। মানুষের কাছে তাদের স্বচ্ছতা প্রমাণের এটি একটি দারুণ সুযোগ ছিল। কিন্তু বাস্তবে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব একেবারেই অস্পষ্ট থেকে যায়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে নেতারা পরবর্তীতে এনসিপি গঠন করেছিলেন, তারা বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য মানুষের কাছ থেকে ১১ কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে ২ কোটি টাকার মতো খরচ করা হয় এবং বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও সেই টাকার সম্পূর্ণ হিসাব—কোথা থেকে কত এলো, কোথায় কত খরচ হলো এবং বর্তমানে তা কী অবস্থায় আছে–তারা সেটি পরিষ্কার করে জানাননি।

শুধু সরকারি নীতি বা হিসাব-নিকাশই নয়, বিশ্লেষকদের মতে, নেতাদের সাধারণ চলাফেরা ও চালচলনও মানুষের মন তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

আন্দোলনের পর প্রাক্তন কয়েকজন ছাত্রনেতার জীবনযাত্রায় যে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর চর্চা হচ্ছে। তাদের দামি গাড়ি ব্যবহার করা কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশার ছবি দেখে অনেকেই সমালোচনা করছেন।

অবশ্য কেবল জীবনযাত্রার ধরন দেখেই কাউকে দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী বলা যায় না। কোনো প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের মতে, আন্দোলন শুরুর সময় নীতি ও নৈতিকতার যে কথাগুলো বলা হয়েছিল, বাস্তব জীবনের এই বৈপরীত্য এনসিপির সেই নৈতিক জোরকে দুর্বল করে দিয়েছে—যে নৈতিকতার শক্তিতে তারা নিজেদের পুরোনো দলগুলোর চেয়ে আলাদা বলে দাবি করত।

শাসনব্যবস্থা আর ভাবমূর্তির এই টানাপোড়েনের পাশাপাশি এনসিপির সামনে আরও একটি বড় লড়াই ছিল—একটি রাজপথের আন্দোলনকে একটি গোছানো রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়া।

জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথে যে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল দেখা গিয়েছিল, দল গঠনের পর তা আর ধরে রাখা যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো আন্দোলননির্ভর দল গঠনের ক্ষেত্রে এটি খুব পরিচিত একটি সমস্যা। সাময়িক আন্দোলন বা গণজোয়ারকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়া খুব কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন শক্ত তৃণমূল সংগঠন, বাস্তবসম্মত নিজস্ব নীতি তৈরি এবং মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ—যেখানে এনসিপি বেশ পিছিয়ে পড়েছে।

সমালোচকদের মতে, এনসিপি নিজেরা নতুন কোনো গঠনমূলক নীতি বা পরিকল্পনা তৈরির চেয়ে শুধু অন্যের কথার জবাব দেওয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর রাজনীতিতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। দেশের মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট কোনো লিখিত রূপরেখা দেখা যায়নি; বরং তারা আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণার ওপর বেশি জোর দিয়েছে।

তা ছাড়া, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের স্বচ্ছতা কিংবা রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি বাংলাদেশের সব দলের জন্যই একটি বড় সমস্যা। ফলে এনসিপিকে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সাধারণ মানদণ্ড দিয়ে বিচার করলে চলবে না, তারা নিজেদের যে ‘উচ্চ আদর্শ ও সংস্কারের প্রতীক’ হিসেবে দাবি করেছিল, সেই মানদণ্ডেই তাদের মেপে দেখতে হবে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি বিষয়ে একমত—এসব সমালোচনা বা দুর্বলতা কোনোভাবেই এনসিপির রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার যৌক্তিকতা তৈরি করে না।

তারা পরিষ্কারভাবে বলছেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য বা মতের অমিল কখনোই সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারে না। তবে তারা এটিও মনে করিয়ে দেন, হামলার শিকার হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা সহানুভূতি তৈরি হলেও, তা এনসিপির জন্য স্থায়ী জনসমর্থনে রূপ নেয়নি। কারণ, দলটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক পরিপক্কতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যেসব বড় বড় প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি।

তবে এতসব ধাক্কা ও টানাপোড়েনের পরও এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে একবারে শেষ হয়ে গেছে, তা মানতে নারাজ বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, মানুষের মনে হারিয়ে যাওয়া আস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হলে এনসিপিকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। দলের আয়-ব্যয় ও সংগঠনে পূর্ণ স্বচ্ছতা আনতে হবে, দলের ভেতরের গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে, দেশের মূল সমস্যাগুলো নিয়ে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিতে হবে এবং নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে নিঃসংকোচে সহযোগিতা করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, এনসিপির ভবিষ্যৎ কেবল ‘জুলাই আন্দোলনের জন্ম দেওয়া দল’—এই পরিচয়ের ওপর টিকে থাকবে না। দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা সমাধানে তারা কতটা যোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে তাদের টিকে থাকা।

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে যে বিশাল আশার আলো সৃষ্টি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়ে এনসিপি কি সত্যিই দেশের মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হতে পারবে? ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথচলায় এর উত্তর লুকিয়ে আছে।