Image description
দেশের রাজনীতিতে নতুন করে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাক্যযুদ্ধ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এ ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে জামায়াত ও এনসিপিকে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে, এনসিপির নেতাদের ধারাবাহিক ঔদ্ধত্যমূলক বক্তব্য রাজনৈতিক অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। আবার জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের একটি অংশ ঐক্যের শক্তি এনসিপির কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে। এতে সরকারবিরোধী ঐক্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
 
গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সংগঠক আলিফ চৌধুরী গুরুতর আহত হন। তার চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার সফল হলেও ক্ষতিগ্রস্ত চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
 
হবিগঞ্জের ঘটনার পরদিন শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গেলে এনসিপির নেতা-কর্মীরা পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। এরপর বৃহস্পতিবার সিলেটেও এনসিপির বহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার জন্য বিএনপি এবং দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছে এনসিপি। দলটির অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং হামলার মাধ্যমে মাঠের রাজনীতিতে তাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
 
বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘তারেক রহমান বেশি দিন সরকার চালাতে পারবে না।’ গতকাল শুক্রবার দুপুরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত পদযাত্রা ও সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
 
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমাদের দলের তিনটি প্রধান এজেন্ডা ছিল একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং আওয়ামী লীগ আমলের অপরাধের বিচার। ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বিএনপিও যদি এই সংস্কারে যে ৭০ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে, এটার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে জনগণের সামনে বিএনপির পতন হবে।’
 
এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেছেন, ‘বর্তমানে বিএনপি যেভাবে আমাদের বাধা দেওয়ার, প্রতিরোধ করার, গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে, এটা হচ্ছে ব্রেইনলেস আওয়ামী লীগের মতো। মানে, তাদের তো ওইটুকু ছিল, এরা ওইটুকুও শো করতে পারছে না।’ গতকাল শুক্রবার দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
 
হবিগঞ্জে মামলা প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, ‘এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে বিএনপি এমন আচরণ করছে, যা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখতে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে, গলা টিপে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা শুনলাম, আমাদের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। আসলে ছিনতাই একটা হয়েছে, তারেক রহমান ও বিএনপির মান-সম্মানের ছিনতাই হয়েছে। কিন্তু ছিনতাই তারা করেছে। তাদের কাজের মাধ্যমে ছিনতাই করেছে। এখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে তাদের তো মুখ দেখানোর মতো অবস্থা নেই। এইজন্য তাদের এখন এই অবস্থা।’
 
এদিকে এনসিপির ওপর হামলার ঘটনাকে ঘিরে ছাত্রশিবিরের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামের একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে হামলার ঘটনাগুলো খুবই সুপরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। উদ্দেশ্য যা হতে পারে— জুলাই মাসে জামায়াতকে যতটা সম্ভব আলোচনার বাইরে রাখা এবং এনসিপির প্রতি জনসমর্থন (পাবলিক সিম্প্যাথি) তৈরি করা। গুড প্ল্যান, গুড মুভ। (ডিপ পাওয়ার)।’ যদিও সমালোচনার মুখে তিনি পোস্টটি সরিয়ে নেন। তবে এতে বিতর্ক থামেনি।
 
জাহিদুল ইসলামের বক্তব্যের পর জামায়াত-সমর্থিত কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের বক্তব্য প্রচার করা হয়। একটি পোস্টে দাবি করা হয়, ‘পাতানো খেলায় নিরীহ আলিফের চোখ বলি হলো।’ এ বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এনসিপির নেতা-কর্মীরাও তীব্র প্রতিবাদ জানান।
 
জামায়াত-সমর্থকদের বক্তব্যের জবাবে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সম্প্রতি জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিতর্কিত ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘জামায়াতের ৬০ বছর বয়সী সংসদ সদস্য ১৭ বছরের কিশোরীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছেন, সেটা এই জুলাই মাসেই ছিল। ঘটনাটি শুধু আলোচনাতেই ছিল না, বরং বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছিল। কিছু মানুষ দেখলাম, যারা হামলার প্রতিবাদ না জানিয়ে এর মধ্যে ডিপ প্ল্যানের (গভীর পরিকল্পনা) গন্ধ পাচ্ছে। এনসিপির রাজনীতি দাঁড়ালে কারও কারও অসুবিধা হবে, এটাই স্বাভাবিক। নিজেদের ব্যর্থতা অস্বীকার করে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখা এক রকম অসুখ। আরোগ্য কামনা করি। আমীন।’
 
উল্লেখ্য, হবিগঞ্জের ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলটির ১০ নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলার আবেদন করেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন রুকন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
 
মামলার অন্য আসামিরা হলেন— হবিগঞ্জ জেলা জাতীয় শক্তির আহ্বায়ক নুর আলম চৌধুরী, জেলা কমিটির সদস্য ফখরুল জাকির, আ. হাই কামাল, রুহাম গাজী, সদস্যসচিব মাহবুবুল বারী চৌধুরী মুবিন, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ উদ্দিন তারেক, জেলা আহ্বায়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং জেলা কমিটির সদস্য ওয়াদুদ মাহমুদ চৌধুরী।
 
একই ঘটনায় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদকে প্রধান আসামি করে ১১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়।
 
গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় মামলাটি করেন। সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে গত বুধবার রাত ৯টার দিকে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের (এসপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা।