Image description

জুলাই সনদ ঘোষণা

জুলাই বিপ্লব থেকে ধাপে ধাপে জুলাই সনদ প্রণয়ন হয়। প্রথমে অভ্যুত্থান তারপর অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতির লক্ষ্যে সনদ প্রণয়নের দাবি তারপর দাবির প্রেক্ষিতে ঐকমত্য কমিশন গঠন অতঃপর রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সনদ প্রণয়ন সম্পন্ন হয়। এরপর আসে জুলাই সনদ ঘোষণার প্রসঙ্গ। সেটিও ঘটা করে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সুসম্পন্ন হয়।

তবে জুলাই সনদ ঘোষণা কোনো সাংবিধানিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছিল না। ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্ব প্রদানের একটি পদক্ষেপ।

জুলাই সনদ স্বাক্ষর

জুলাই সনদ ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসে জুলাই সনদে স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ। বিষয়টি ছিল এমন যে, জুলাই সনদ যখন স্বাক্ষরিত হবে তখন সেই স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রকাশ পাবে। সেই অঙ্গীকারটি হলো আগামী দিনের বাংলাদেশে এই জুলাই সনদকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

 

সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী

যখনই এই স্বাক্ষরের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হল তখনই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে সেই প্রশ্ন সামনে আসল।

 

বাস্তবায়ন পদ্ধতিটি পূর্বেই চূড়ান্ত হওয়া আবশ্যক- এমন দাবি ওঠার কারণ ছিল, জুলাই সনদের ভেতরের বক্তব্য এবং এর বিভিন্ন ধারা-উপধারা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিদ্যমান সংবিধানের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বিরোধের সূত্রপাত ঘটবে। কারণ দেশের চলমান সংবিধানের কিছু ধারার সাথে জুলাই সনদের কিছু ধারার স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। এমতাবস্থায়, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কীভাবে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে নানামুখী আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।

 

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনিভাবে চূড়ান্ত রূপ লাভ করার পূর্বেই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হল যে, জুলাই সনদ সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেছে। এখন দলগুলোর মাধ্যমে এই সনদে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন করতে হবে; যেখানে সকল রাজনৈতিক দল এই মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে যে, তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে।

 

তবে এই স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আপত্তি উত্থাপন করে। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল, দলগুলো যে এই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে জাতির সামনে একমত হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে এবং এর বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করছে, তা সুনির্দিষ্ট কোন আইনি উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে? রাষ্ট্র কি একটি নতুন গণপরিষদ গঠন করে সেই গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান তৈরি করে তার ভেতরে জুলাই সনদকে স্থায়ী রূপ দেবে; নাকি স্রেফ একটি সাধারণ সংসদ গঠন করে সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা পরবর্তী সময়ে অন্য যেকোনো পক্ষের কলমের খোঁচায় কিংবা আদালতের রায়ে মুহূর্তের মধ্যে বাতিল হয়ে যেতে পারে?

 

এনসিপির স্পষ্ট দাবি ছিল, স্বাক্ষর করার পূর্বে এই বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিটি আগে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হোক। এই আইনি নিশ্চয়তা না পাওয়ার কারণে এনসিপি তখন জুলাই সনদের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি বর্জন করে এবং তাতে যোগদান থেকে বিরত থাকে। তবে আমরা যারা জুলাই সনদকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলাম, আমাদের মধ্যকার কিছু রাজনৈতিক দল এই যুক্তিতে ও চিন্তায় সনদে স্বাক্ষর করলাম যে, আপাতত জুলাই সনদটি প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হলে প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অন্তত অগ্রসর হবে এবং পরবর্তী ধাপে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পদ্ধতিটি নির্ধারণ করা যাবে। মূলত এই কৌশলগত চিন্তাকে সামনে রেখেই আমরা স্বাক্ষর প্রদান করেছিলাম।

 

জুলাই সনদে অন্তহীন প্রতারণার ঘটনা

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এই স্বাক্ষর গ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণে পর্দার আড়ালে একটি মারাত্মক ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনাটি হল, স্বাক্ষরের চূড়ান্ত মুহূর্তে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এই মর্মে অঙ্গীকার করতে অস্বীকৃতি জানাল যে, তারা ক্ষমতায় গেলে এই জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়ন করবে। কারণ এটি যদিও কোনো প্রত্যক্ষ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয় ছিল না, তবে এটি ছিল একটি জাতীয় অঙ্গীকারের বিষয়; যার মাধ্যমে রাষ্ট্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জুলাই সনদের ভেতরে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার অনেকগুলোর সাথে বিএনপির দ্বিমত আছে। এখন বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করে ঘোষণা দিয়ে দেয় যে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে এটি বাস্তবায়ন করবে, তবে জাতির সাথে তারা একটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই কারণে বিএনপি শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করা নিয়ে অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে।

 

এমতাবস্থায় সরকারের একটি পক্ষ অন্য সব দলকে অন্ধকারে রেখে বিএনপির সাথে পর্দার আড়ালে একটি গোপন আঁতাত করে। সেই আঁতাতের রূপরেখাটি ছিল এই যে, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পূর্বে সব দলকে জুলাই সনদের যে সর্বশেষ কপিটি দেখতে দেওয়া হয়েছিল (যেখানে দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হওয়া বিষয়গুলো মূল সনদে এবং ভিন্নমতের বিষয়গুলো নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে সংকলিত ছিল) সেখানে বিএনপির স্বার্থ রক্ষার্থে একটি বিশেষ নোট গোপনে জুড়ে দেওয়া হল। যাতে বলা হল, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

 

রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে যে, জুলাই সনদে রাষ্ট্রের যে ১৩টি মৌলিক বা কাঠামোগত পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তার মধ্যে প্রায় ১০টি বিষয়ের সাথেই বিএনপির দ্বিমত ছিল এবং সেগুলোতে তাদের নোট অব ডিসেন্ট ছিল। ফলে বিএনপি নেপথ্যে সরকারের সাথে এই গোপন আঁতাত বা সমঝোতাটি করে ফেলল যে, তারা জুলাই সনদের মূল রূপরেখার ভিত্তিতে নয়, বরং নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে যা উল্লেখ করবে, কেবল ততটুকুই বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে।

 

সনদের ভেতরে গোপনে এমন একটি শর্ত বা অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে দেওয়ার পর, বিএনপি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করল। অথচ মাঝখান দিয়ে যে এমন একটি নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটে গেছে তা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের জানা ছিল না। এই সুনির্দিষ্ট ঘটনাটিকেই মূলত অন্তহীন প্রতারণা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সমগ্র জুলাই বিপ্লবের সূচনা থেকে বর্তমান সরকার গঠন হওয়া পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে যদি কোনো প্রতারণার ইতিহাস থেকে থাকে, তবে তা ঘটেছে ঠিক এই জালিয়াতির ঘটনাটির মাধ্যমে। যেখানে দেশের অন্য সকল রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে একটি অভিন্ন সনদের কথা বলে স্বাক্ষর নেওয়া হল, অথচ তাদেরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে রেখে ভেতরে পরিবর্তন করা হল। তাও এমন পরিবর্তন, যার মাধ্যমে সনদ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হয়ে যায়।

 

এটি মূলত বিএনপি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যকার একটি অনৈতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে তারা পর্দার আড়ালে এই ভয়ঙ্কর কাজটি সম্পন্ন করেছে। স্বাভাবিক নিয়মে বিএনপি পরিষ্কারভাবে বলতে পারত যে, এই শর্তে তারা স্বাক্ষর করবে কিংবা তারা অনুষ্ঠান বর্জন করতে পারত। অথবা, সরকার যদি বিএনপির এই বিশেষ শর্তটি মানতেই চেয়েছিল, তবে তা গোপনে না করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সকল রাজনৈতিক দলকে জানাতে পারত। কিন্তু সরকার সেই সততার পথ অবলম্বন না করে চাতুর্যের সাথে গোপনে শর্তটি লিখে দেয়। যেহেতু স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সবাই কেবল নিজ নিজ স্বাক্ষর প্রদানের জন্য উপস্থিত হয়েছিল এবং সনদের খসড়া নিয়ে দীর্ঘ পড়াশোনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ আগেই সম্পন্ন হয়ে এসেছিল, তাই স্বাক্ষর করার টেবিলে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে পুরো দলিলটি পুনরায় পড়ার প্রয়োজন কেউ বোধ করেনি। প্রত্যেকে এই সরল বিশ্বাসে স্বাক্ষর করতে গিয়েছিল যে, পূর্বে যে কপিটি যাচাই করে সম্মতি দেওয়া হয়েছে, সেটিই স্বাক্ষরিত হচ্ছে।

 

জালিয়াতির দৃষ্টান্ত

এই ঘটনাটিকে একটি বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা যায়; যেমন- কোনো ব্যক্তির সাথে জমি বিক্রয়ের চুক্তি হলো যে, তার নিকট ১০ লক্ষ টাকা কাঠাপ্রতি মূল্যে ৫ কাঠা জমি মোট ৫০ লক্ষ টাকায় বিক্রয় করা হবে এবং দলিলের ভেতরের সমস্ত লেখাজোখাও সেই অনুযায়ী ঠিক করা হল। কিন্তু যখন চূড়ান্ত স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত হল তখন বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে দলিলের পাতা পরিবর্তন করে গোপনে ৫ কাঠার স্থানে ৫০ কাঠা লিখে বিক্রেতার স্বাক্ষরটি গ্রহণ করা হল। এখন যদি দাবি করা হয় যে, আপনি আমার নিকট ৫০ কাঠা জমিই বিক্রয় করেছেন, তবে তা যেমন একটি প্রতারণা ও জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হয়; জুলাই সনদের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে অন্ধকারে রেখে শর্ত পরিবর্তন করার এই ঘটনাটিও ঠিক তেমনি একটি অন্তহীন ও ঐতিহাসিক প্রতারণা।

 

জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং পরিশেষে তার ওপর স্বাক্ষর গ্রহণের এই সমগ্র প্রক্রিয়ার নেপথ্যে উপরোক্ত ঘটনা বা নেতিবাচক অধ্যায় যুক্ত হয়ে রইল। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তার নিজস্ব দাবি ও স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেবে, সেটি স্বাভাবিক হলেও, অন্য পক্ষগুলোকে অন্ধকারে রেখে গোপন আঁতাত করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে, যা জুলাই সনদ স্বাক্ষরের ইতিহাসে একটি স্থায়ী কলঙ্কের দাগ রেখে দিল। অপর দিকে, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি শুরুতেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করেছিল যে. সনদটি কোন্ সুনির্দিষ্ট আইনি উপায়ে বাস্তবায়িত হবে, তা আগে নির্ধারণ করা হোক। ফলে এনসিপির অংশগ্রহণ ছাড়াই বাকি দলগুলোর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জুলাই সনদটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হল।

 

চলবে...