ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দেশত্যাগ করে দিল্লিতে অবস্থান নেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই দেশেই থাকছেন তিনি। দীর্ঘদিন রাজস্থানের আজমীর শরিফে ‘খাদেম’ হিসেবে থাকার পর হাসানাত আব্দুল্লাহ বর্তমানে ছোট ছেলে সেরনিয়াবাত আশিক আব্দুল্লাহকে নিয়ে বাস করছেন মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ে। ওখানকার অভিজাত বান্দ্রা এলাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কাটছে তার জীবন। আগামীর সময়ের প্রতিনিধিকে এসব তথ্য জানিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কলকাতায় পলাতক থাকা তিন নেতা।
তাদের দেওয়া তথ্যমতে, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসানাত আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসেবে নির্বিচারে মনোনয়ন বাণিজ্য করে গেছেন। ভোলায় তোফায়েল আহমেদ ও ঝালকাঠিতে আমির হোসেন আমুর কারণে এ দুই জেলায় প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও বিভাগের বাকি জেলাগুলোতে ছিল তার নিয়ন্ত্রণ। এই জেলাগুলোর ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন এবং কমিটি বাণিজ্য করে আয় করেছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। একমাত্র কন্যা কান্তা আব্দুল্লাহকে ভারতে স্থায়ী করেছেন বহু আগেই। দিল্লি, রাজস্থান, কলকাতা ও মহারাষ্ট্রে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি কিনেছেন হাসানাত আব্দুল্লাহ।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পলাতক এক নেতা বলছিলেন, ‘দেশে কোনো গণ্ডগোল বাধলে হাসানাত আব্দুল্লাহ সবার আগে পালিয়ে যেতেন। জুলাই আন্দোলনেও তা-ই করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন দেশে না ফেরায় আমরা কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম যে দেশে বড় কিছু হবে। কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পেয়েই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।’
পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে রয়েছেন বরিশাল আওয়ামী লীগের একজন সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা সব কিছুই জানি, তবে বলতে গেলে নিজেদের ওপরে থুথু মারা হয়। হাসানাত ভাই রাজস্থানের আজমীর শরিফের খাদেম। সেখানে তার যাতায়াত বহু বছর ধরে। দেশ থেকে পালিয়ে প্রথমে তিনি কলকাতার ফ্ল্যাটে ওঠেন। সেখান থেকে আজমীর শরিফে চলে যান। সরকার পতনের পর তিনি কিছুদিন ছিলেন দিল্লির ফ্ল্যাটে। তারপর দিল্লি, আজমীর শরিফ ও কলকাতায় আপ-ডাউন করছেন। বর্তমানে তিনি মুম্বাইয়ে রয়েছেন। সেখানকার বান্দ্রায় অর্থাৎ সব থেকে বিলাসবহুল জায়গায় বসবাস করছেন। দেশ থেকে পাচার করা অর্থে তারকাদের মতো জীবন তার।’
কলকাতার নিউটাউনে পলাতক থাকা বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের এক নেতার দাবি, ‘বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে হাসানাত আব্দুল্লাহর জীবনযাপন অনেক বিলাসবহুল। এখন যে জায়গায় থাকছেন তিনি, সেখানে এক রুমের একটি ফ্ল্যাট কিনতেই ২ কোটি রুপি প্রয়োজন। বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খান, সালমান খান, আমির খান, রণবীর কাপুরসহ বড় তারকাদের বাড়ি যে বান্দ্রায়, সেখানে প্রায় ৭০ কোটি রুপিতে মেয়ে কান্তা আব্দুল্লাহকে কিনে দেওয়া ফ্ল্যাটে রয়েছেন হাসানাত আব্দুল্লাহ।
‘আমাদের ওপর দিয়ে আয় করা টাকায় তিনি নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করছেন, আর আমরা এখন অন্য দেশে বসে দিনমজুরি করছি পেটের দায়ে। ভারতে কম করে হলেও হাসানাত আব্দুল্লাহর ১২টি ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। ভারতে পালিয়ে আসার পর এসব টের পেয়েছি।’
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম খান বলছিলেন, ভোলা ও ঝালকাঠি জেলা বাদে বরিশাল বিভাগের এমন কোনো ইউনিয়ন নেই, যেখানে চেয়ারম্যান পদে বাণিজ্য করেননি তিনি। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকায় বিক্রি করতেন অযোগ্যদের কাছে। বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন-বাণিজ্য করে হাজার কোটি টাকা আয় করেছেন। অযোগ্যদের মনোনয়ন দিয়ে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় ডুবিয়েছেন আওয়ামী লীগকে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার যুবলীগ নেতা ফারুক আজাদের ভাষ্য, ‘ভারতে হাসানাত ভাই পালালেও আল্লাহ ওনাকে মাফ করবেন না। টাকা ছাড়া কোনো কাজ করতেন না তিনি। আর সেই টাকা দিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ধুঁকে ধুঁকে মরছে, মামলা চালানোর মতো টাকা নেই। পদপদবি ছিল না, তারপরও জেল খাটতে হয়েছে।’
বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন মন্তব্য করেছেন, ‘বরিশালকে ধ্বংস করেছেন হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার পরিবার। স্বশিক্ষিত আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে হলফনামা দাখিল করেছিলেন, সেখানে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। দেশে লোন দেখিয়ে বিদেশে বানিয়েছেন অঢেল সম্পদ। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে ২০০২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০টি মামলা ছিল। এর মধ্যে অস্ত্র মামলা দুটি, দুর্নীতির মামলা পাঁচটি এবং আয়কর অধ্যাদেশে একটি মামলা ছিল।
‘আওয়ামী লীগের শাসনামলেও দুদকের মামলার আসামি ছিলেন তিনি। পরে প্রধানমন্ত্রীর ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে বরিশাল-১ আসনে বিনাভোটের সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত সব মামলা থেকে খালাসপ্রাপ্ত হন। আমাদের দাবি থাকবে, যে মামলাগুলো থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সেই মামলাগুলো ফের চালু করা এবং তিনিসহ পলাতক সবাইকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বললেন, ‘বিদেশে বরিশালের মামলার আসামি যেসব আওয়ামী লীগ নেতা পলাতক রয়েছেন, তাদের বিষয়ে আমরা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে কথা বলব। কীভাবে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা যায়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রয়েছে।’