Image description

উগ্রবাদে জড়িত সন্দেহে ঢাকায় ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) আদলে বাংলাদেশেও একই ধরনের সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টার তথ্য মিলেছে।

এই চেষ্টায় জড়িতরা শরিয়াভিত্তিক মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে কর্মী সংগ্রহ করছে বলেও জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সংগঠনটির নাম ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম বা এফসিএস। খুলনা ও যশোর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সক্রিয় সংগঠনটির নেতারা রাজধানীতেও মার্শাল আর্ট শেখানোর উদ্যোগ নিতে এসে আটক হয়েছেন।

গত রোববার রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া বালুর মাঠ এলাকা থেকে এফসিএসের ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে সেদিনই তাদেরকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

এরই মধ্যে এফসিএসের অনুসারীরা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাচ্ছেন, ভারতের চক্রান্তে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানো হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এসসিএফ সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের আন্তর্জাতিক যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে।

যাদেরকে ধরা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন এফসিএস-এর প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সা‌বির।  অন্যরা হলেন হোসাইন তানিম, জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, আবিদুর রহমান ও বায়েজিত।

 

পুলিশের তথ্য বলছে, এই ছয়জনকে গ্রেপ্তারের আগেও টিটিপির মতাদর্শী অন্তত ৯ জন সদস্য ও তাদের সহায়তাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে এফসিএস-এর যোগাযোগ ছিল না কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে।

চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসে ঢাকা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে ড্রোন, অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ করা হয়।

টিটিপির হয়ে কাজ করতে বাংলাদেশি যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাভার ও নারায়ণগঞ্জে গ্রেপ্তার হয় দুইজন।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘এসসিএফ সংগঠনটি নতুন। ছয়জনকে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) হেফাজতে তাদের দেশি-বিদেশি যোগাযোগ, অর্থের উৎস্য ও পরিকল্পনা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার পদবীর একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, সামাজিক মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ ও সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আন্তর্জাতিক কানেকশনের ব্যাপারে এড়িয়ে যাচ্ছে।

 

যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক এবি সিদ্দিক বলেন, ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হলেও উগ্রবাদী কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন ও ধারায় মামলা করা হবে।

একই থানার একজন এসআই বলেন, এফসিএসের নেটওয়ার্ক বেশ বিস্তৃত। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ করতে তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। আফগানিস্তান ফেরত উগ্রপন্থীদের সঙ্গে তারা সম্মিলিতভাবে ঢাকার বসিলায় বিদেশি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থে আবাসন প্রকল্পের আড়ালে টিটিপির সদস্য সংগ্রহ করছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারে বন্দি সাজাপ্রাপ্ত এবং বিভিন্ন মামলার আসামি সন্দেহভাজন জঙ্গিরা বের হয়ে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেকে জামিনও পেয়ে যান।

তখন থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কর্মীরা অনেকটাই প্রকাশ্যে তৎপরতা শুরু করে। নিষিদ্ধ সংগঠন হলেও হিযবুত তাহরীর ঢাকায় সভা-সমাবেশ করে, তারা সচিবালয়ে গিয়ে স্মারকলিপিও দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অবশ্য তখন ‘দেশে কোনো জঙ্গি নেই’ বলে বক্তব্য দিয়েছেন। নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে সরকারের তরফেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে।

কার্যক্রম বেশি খুলনা-যশোরে

পুলিশের সূত্র জানায়, এফসিএস খুলনা শহর, যশোর, চাঁদপুর জেলা এবং খুলনার সুতারখালী, যশোরের অভয়নগরে মার্শাল আর্ট সেন্টার পরিচালনা করছে। যশোর সদর, সিদ্ধিপাশা ও নওয়াপাড়ায়ও তাদের ২-৩ মাসের কারাতে কোর্সে রয়েছে।

স্থানীয় স্টেডিয়ামগুলোতে আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষনের কাজ করলেও গোপনে প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে টেলিগ্রাম গ্রুপে টিটিপি, আল-কায়েদার বিভিন্ন উগ্রবাদী বয়ান শেয়ার করে।

পরে বিভিন্ন ধরনের মতামত তুলে ধরে প্রশিক্ষণার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। এরপর বাছাইকৃত যুবকদের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

সাবিরের অন‍্যতম সহযোগী মাহফুজুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাস্তানের জঙ্গি’ নামের ফেসবুক পেজ চালান। মাহফুজ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এফসিএস-এর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) টিএম রোকোনুজ্জামান জানান, ফারাজি পাড়া লেনে ২০২০-২০২২ সালের দিকে ‘সাবির মাস্টার’ নামে একজন স্কুল পরিচালনা করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেটি আর নেই। সম্প্রতি সাবির কালেমা পতাকা লাগানোর দাওয়াত দিয়ে সাহায্য চান।

খুলনার এসপি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা পেয়ে তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ চলছে। সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভয়নগর থাকার ওসি এসএম নূরুজ্জামান জানান, ‘এফসিএস এর কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

যাত্রাবাড়ীতে প্রশিক্ষণের আগে ঢাকার রমনা পার্কে প্রশিক্ষণের আয়োজনের চেষ্টার খবর এফসিএসের ফেসবুক পেজেই আছে। পেজে লেখা আছে, পুলিশের বাধায় এখানে করতে না পারার পর যাত্রাবাড়ীতে যান সাবির। পরে সেখানেই গ্রেপ্তার হন তিনি।