Image description

আগামী অক্টোবর মাসকে টার্গেট করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে একই সময়কে মাথায় রেখে। এবার কমিশন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে রাজনৈতিক দলের প্রতীক মুক্ত। আগে রাজনৈতিক দলের প্রতীকে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকলেও এবার সেই সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপির একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে। দলগুলো পছন্দের প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক না দিতে পারলেও সমর্থন দিতে পারবে। দলের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে অনেকে স্ব-উদ্যোগে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারে। ফলে একদিকে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে, অন্যদিকে বিএনপিকে ভোটের মাঠে একক প্রার্থী রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে কৌশলী ভূমিকায় থাকতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে গত ২৮ জুন একটি দীর্ঘ সভা করে নির্বাচন কমিশন। ওই দিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে আগামী অক্টোবর মাস লক্ষ্য ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সভার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, এই নির্বাচন আয়োজনে ব্যালট বাক্স, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার প্রস্তুত আছে। তবে নির্বাচন আয়োজনে বাজেট কিছুটা কমানো যায় কি না, ভাবা হচ্ছে। তিনি জানান, যদি আমাদের ৪ হাজার ৫০০ নির্বাচন আয়োজন করতে হয়, কোনটা আগে করব, কোনটা পরে করব তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও কীভাবে করব, আমাদের জিনিসপত্র প্রস্তুত আছে কি না, তা অবহিত করা হয়েছে।’ প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যদি অক্টোবর থেকে হয়, বা নভেম্বর-ডিসেম্বর যখন হোক, আমরা অক্টোবর ধরে কাজ আগাচ্ছি। অক্টোবরে হলে এর ৪৫ দিন আগে শিডিউল ঘোষণা করা হবে। আমরা মূলত অক্টোবর ধরেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’ ইসির ভাষ্য অনুযায়ী অক্টোবর মাসকে ধরে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজন করতে হলে আগামী মাসেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনে একসঙ্গে তফসিল নাও হতে পারে। নির্বাচন কমিশন কয়েক ধাপে এই তফসিল ঘোষণা করতে পারে, ইসির সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। অতীতেও ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের নজির রয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘একক প্রার্থী’ মাঠে রাখা। ক্ষমতাসীন দল ও বড় দল হওয়ায় প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও সিটিতে বিএনপির একাধিক যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে। এই যোগ্যদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করা এবং অন্যদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে রাখাই ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে পারলে সহজেই জয় ঘরে তোলা যাবে। সেক্ষেত্রে মূল করণীয় হচ্ছে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। দল যাকে সমর্থন দিবে অন্যরা সবাই তার হয়ে মাঠে কাজ করতে হবে। যদি কেউ দলীয় শৃঙ্খলা অমান্য করে প্রার্থী হয়ে মাঠে নামেন- দল তার বিরুদ্ধে যদি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বিদ্রোহী প্রার্থী কমানো যাবে। অতীতে জাতীয় নির্বাচনের সময় জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে ছিল, কিন্তু দল সেই বিদ্রোহীকে প্রশ্রয় দেয়নি দল, ফলে তারা ভোটের মাঠে থাকলেও সুবিধা করতে পারেনি। এবারও ইউনিয়ন, উপজেলাসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করবে বিএনপি।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার ভোটের মাঠে দ্বিমুখী লড়াই হবে। একদিকে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর একক প্রার্থী থাকবে। অন্যদিকে, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্র বাকী ১০ দলেরও একক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়াও কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকছে। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে দলীয় পরিচয় লাগছে না, সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যেসব লোক নির্বাচনে অংশ নিতে আইনগত বিধি-নিধেষ নেই, সেই সব লোকেরাও এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে এর আগে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচন নয়, সেক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে যারা বিধি অনুযায়ী নির্বাচনের যোগ্য তারাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। ফলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, বিরোধী দল ও জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও এবারের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলটি হালকাভাবে নিচ্ছে না। কারণ, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংশ্লিষ্ট এলাকার শাসন করে থাকেন। সেকারণে এবারের নির্বাচনকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বিএনপি। প্রার্থী সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও দলটি বেশি কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে সৎ যোগ্য এবং দুর্নীতি বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই এমন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিবে বিএনপি। সাধারণ মানুষের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা রযেছে কিনা সেটি দলটির পক্ষ থেকে যাচাই করে দেখা হবে। এরসঙ্গে যুক্ত হবে বিগত ১৭ বছর দলে অবদান কি ছিল? আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন কিনা? হামলা-মামলায় পড়েছেন, নাকি সমকালীন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মিলেমিশে আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করেছেন তা পর্যালোচনায় রাখবে দলটি। প্রার্থী সমর্থনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় মাথায় রাখলে দল ভালো ফল তুলে আনতে পারবে বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

ইসির টার্গেট অনুযায়ী অক্টোবরে ভোট করতে চাইলে প্রার্থীদের হাতেও বেশি সময় নেই। ইতোমধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। গ্রামে-গঞ্জে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে ব্যানার-পোস্টার আর ফেস্টুন। দেশের ৩৩০টি পৌরসভা ৪৯৫টি উপজেলা ও ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেউ বসে নেই। তারা একদিকে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, অন্যদিকে দলের সমর্থন আদায়ে চালাচ্ছে লবিং-তদবির।
শীর্ষনিউজ