Image description

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আবাসিক হলগুলোতে সিট বণ্টনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে হল দখল, সিট বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছেন। ক্যাম্পাসের অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, পুরোনো কায়দায় হল দখল করছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদল নতুন করে আবারও হল দখল, শিক্ষার্থীদের কাছে চাঁদাবাজি ও গেস্টরুম কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ছাত্রদলের পদধারী নেতারা অবৈধভাবে হলগুলোতে অবস্থান করছেন এবং এ কাজে সহযোগিতা করছে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অবৈধভাবে হল দখলের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধনও করেছে শাখা ছাত্রশিবির।

এদিকে হল দখলের অভিযোগকে সম্পূর্ণ অস্বীকার ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, তারা কোনো ধরনের হল দখল বা শিক্ষার্থীদের হয়রানির সঙ্গে জড়িত নন। বরং ছাত্রশিবিরই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজারের কাছাকাছি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি আবাসিক হলে আসনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। ফলে প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনই আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান না। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী, মেধাবী, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য মোট আসনের ১০ শতাংশ হল প্রাধ্যক্ষদের বিশেষ কোটায় সংরক্ষিত। তবে গত ১ মার্চ ছাত্রদল নেতা আমির হামজা এবং ৫ এপ্রিল আসিফ উদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থীকে সৈয়দ আমীর আলী হলে এই ১০ শতাংশ বিশেষ কোটায় আবাসিকতা দেওয়া হয়। 

তাদের দুজনই রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রার্থী ছিলেন এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত। এ ছাড়া সম্প্রতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে বৈধ আবাসিকতা ছাড়া তিন শিক্ষার্থীর অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। তিনজনই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে। 

এর মধ্যে লতিফুর রহমান নামের একজন রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এদিকে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রলীগকে হল থেকে তাড়ানোর পর হলগুলো ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা দখলে নিয়েছেন বলে দাবি করে আসছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। 

তাদের দাবি, ৫ আগস্টের পরপরই ছাত্রলীগ-নিয়ন্ত্রিত ব্লকগুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওঠানো হয়েছে এবং বৈষম্যবিরোধী কোটায় ছাত্রশিবির হলগুলো দখলে নিয়েছে। এতে কার্যত প্রশ্ন উঠছে, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা কি আবারও হল দখলের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতারা সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’-এর মুখপাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে স্বপ্ন দেখছিলাম শিক্ষার্থীদের মাঝে বৈধভাবে সিট বণ্টন হবে। কিন্তু দেখলাম, কিছু নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় -এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হলো। আমরা দেখছি, দীর্ঘ সময় হলের অ্যালটমেন্ট আটকে রেখে একসময় দলীয় শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া হচ্ছে। কিছু হলে দেখেছি ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক কক্ষ গড়ে উঠছে।’

তিনি বলেন, যে দল যেখানে শক্তিশালী, সে দল সেখানে ভাগাভাগির মাধ্যমে হল দখল করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে এ ধরনের জালিয়াতি করছে। এর আগের প্রশাসন এবং বর্তমান প্রশাসন—উভয়ই এর জন্য দায়ী।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘অতীতে ছাত্রলীগের সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে আবাসিক সিট বণ্টনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। বর্তমানেও আমরা সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি।’

হলে সিট দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ, দালিলিক উপাত্ত ও ভুক্তভোগীর পরিচয় ব্যতিরেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা। শিবির, রাকসু এবং হল সংসদের কারা নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থান করছেন, শিগগিরই আমরা সেসব তথ্য তুলে ধরব।’

একইভাবে হল দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘এমন একটি ঘটনাও দেখানো যাবে না, যেখানে ছাত্রশিবিরের সুপারিশে কোনো শিক্ষার্থী হলে আবাসিকতা পেয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করছেন, তাঁরা যেন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেন।’

হলে সুষ্ঠুভাবে সিট বণ্টনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, ‘হলের প্রাধ্যক্ষরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক নীতিমালা অনুসারেই সিট বরাদ্দ দিচ্ছেন। তবে যেসব শিক্ষার্থী নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও হল প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে।’