পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাওজানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফরিদা পারভীনের বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সম্প্রতি এসএসসি (দাখিল) পাস মো. বাবুল আক্তারকে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনীত করেছেন। অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ‘এলাকায় কি স্নাতক বা সমমান ডিগ্রিধারী কোনো ব্যক্তি নেই?’
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা ও ক্লাস্টার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে কিছুক্ষণ পর দিলপাশার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সজিব হোসেন সাংবাদিককে ফোন করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা বা সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না।’
কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে অভিভাবক সদস্য এইচএসসি পাস আতিয়া খাতুন ২ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়ে বিদ্যোৎসাহী সদস্য পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। পরে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান এবং বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মোছা. ফরিদা খাতুনের আহ্বানে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভাগুলোতে আতিয়া খাতুনকে বিদ্যোৎসাহী নারী সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয় এবং এ বিষয়ে রেজুলেশনও হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়।
তবে হঠাৎ করে গত ১৭ জুন ২০২৬ জরুরি সভা আহ্বান করা হলে সেখানে উপস্থিত হয়ে আতিয়া খাতুন জানতে পারেন, তাকে বিদ্যোৎসাহী সদস্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে মোছা. রিনা খাতুন ও মো. বাবুল আক্তারকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য ঘোষণা করা হয়েছে। একই সভায় মো. সজিব হোসেন, মোছা. রিতা খাতুন ও আতিয়া খাতুনকে অভিভাবক সদস্য ঘোষণা করা হয়। এরপর সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে মো. বাবুল আক্তারকে সভাপতি, মো. সজিব হোসেনকে সহ-সভাপতি এবং অন্য সদস্যদের নাম ঘোষণা করে কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন না হওয়ায় জামানতের টাকা ফেরতের বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি নির্ধারিত থাকলেও দাখিল পাস একজন ব্যক্তিকে সভাপতি করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নীতিমালা অনুযায়ী স্নাতক বা সমমান ডিগ্রিধারী ব্যক্তিকে সভাপতি মনোনয়ন দিয়ে কমিটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে ঘোষিত মো. বাবুল আক্তার ২০০০ সালে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনের ২.১ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, সভাপতি হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী হতে হবে। তবে নির্ধারিত যোগ্যতার কোনো প্রার্থী না পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সভাপতি মনোনয়ন দিতে পারবে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় একাধিক স্নাতক বা সমমান ডিগ্রিধারী ব্যক্তি রয়েছেন।
এ বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. বাবুল আক্তার বলেন, ‘আমি ২০০০ সালে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। এরপর আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিনি।’
দিলপাশার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সজিব হোসেন বলেন, ‘নীতিমালা আমার মুখস্থ। সভাপতি যিনি হয়েছেন, তিনি এসএসসি পাস। এতে কোনো সমস্যা নেই। আপনাদের এতে কী? এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ফোন করা বা লেখালেখি করা যাবে না।’
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা ফরিদা পারভীন বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না। প্রয়োজন হলে অফিসে যোগাযোগ করুন।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে ক্লাস্টার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান প্রথমে কমিটি গঠনের বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে বলেন, কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে তিনি জানান, কমিটি-সংক্রান্ত কোনো নথি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার কার্যালয়ে পৌঁছেনি।