দীর্ঘদিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন গাজী মাওলানা আতাউর রহমান। নেতৃত্বে রদবদল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংখ্যালঘু ইস্যু, ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্য, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে কালবেলার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু তালহা রায়হান—
কালবেলা: নতুন মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার অনুভূতি কী?
গাজী আতাউর রহমান: আলহামদুলিল্লাহ এখানে আমরা তো দীর্ঘদিন যাবত দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক সময়কাল প্রায় ৪০ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আমার ওপরে বেশ কয়েকজন মুরুব্বি ছিলেন, ওনারা সকলেই বড় মানুষ ছিলেন; তাদের তুলনায় আমি অনেক ছোট। আসলে এই ছোট কাঁধে বড় দায়িত্ব এটা অবশ্যই আমার জন্যে অনেক বড় বোঝা। তবে যেহেতু দীর্ঘদিন যাবৎ আমি আন্দোলনের সাথে আছি, ইনশাআল্লাহ আমি আমার দায়িত্ব পালনের জন্য শতভাগ চেষ্টা করব এবং মুরুব্বি ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করব।
কালবেলা: অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদ ২০০৮ সাল থেকে টানা মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। এই মুহূর্তে আপনাকে কেন বেছে নেওয়া হলো?
গাজী আতাউর রহমান: এটা তো যারা আমাকে নির্বাচন করেছেন তারা বলতে পারবেন। আমাদের সংগঠনের নিয়ম হলো, এখানে কেউ ইচ্ছা করলেই দায়িত্ব নিতে পারে না, দায়িত্ব চাওয়ার কোনো ঐতিহ্য এখানে নেই। এ ছাড়া ক্যান্ডিডেট হওয়ারও কোনো সিস্টেম নেই। এখানে আমাদের নিয়ম আছে, আমাদের কয়েকটা নীতি নির্ধারণী পরিষদ আছে, প্রেসিডিয়াম আছে, সুরা আছে— তারাই নির্ধারণ করে যে, কে দায়িত্ব পালন করবেন। অতএব তারা হয়তো আমাকে এই জায়গায় দায়িত্ব পালনের জন্য ভালো মনে করেছেন, এজন্য হয়তো তারা আমাকে সিলেকশন করেছেন।
কালবেলা: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপনাদের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারত— দলের সাম্প্রতিক নেতৃত্বে এমন কোনো দিক লক্ষ করেছেন?
গাজী আতাউর রহমান: আমাদের সাবেক মহাসচিব (অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদ) প্রায় দুই দশক ধরে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা অবশ্যই তার একটা সফলতার সাক্ষর। কিন্তু নির্বাচনপরবর্তী বিভিন্ন পর্যালোচনা হয়েছে আমাদের। এসব পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, অধিকতর কাজের গতি সঞ্চারের জন্য সংগঠনের প্রতিটি স্তর একটু ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। অতএব এটা একটি নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। এখানে কোনো অন্তরায় বা অস্বাভাবিকতা নেই।
কালবেলা: অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদের উত্তরসূরি হিসেবে আপনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি?
গাজী আতাউর রহমান: আমাদের সংগঠনটা হলো সমন্বিত একটা ধারা। এখানে রাজনীতিও আছে আবার আধ্যাত্মিকতাও আছে। দুটো। তো আমাদের সাবেক মহাসচিব ইউনুছ সাহেব তিনি যে চমৎকারভাবে এই দুটা বিষয় সমন্বয় করেছেন, আমার বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা এটাই। এই সমন্বয়টা আমি কীভাবে করব। এ ছাড়া আরেকটা বিষয় হলো যে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থি শক্তির এখন ভরসার জায়গা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই ইসলামপন্থি শক্তির একটা বড় প্রত্যাশা আছে আন্দোলনের কাছে, তাদের এই প্রত্যাশা আমি কীভাবে পূরণ করব— এটাও আমার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
কালবেলা: স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কি এককভাবে অংশ নেবেন, নাকি কোথাও সমঝোতার চিন্তা রয়েছে?
গাজী আতাউর রহমান: স্থানীয় সরকার নির্বাচন তো এবার কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে হবে না। এটা স্বতন্ত্রভাবেই হবে। দলীয় প্রতীকে হবে না। অতএব এখানে কারো সাথে সমঝোতা বা সমন্বয় করার প্রশ্ন আসে না। যখন নির্বাচন আসবে তখন পরিবেশ,পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা ভালো ফলাফল করার জন্যে যেই কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়; সেটা করব। তবে আমরা এখানে কোনো রাজনৈতিক লিয়াজু বা সমন্বয় নয়, বরং প্রত্যেকটা জায়গায় আমাদের প্রতিনিধি দেওয়ার এখনো চিন্তা আছে। প্রস্তুতি আছে। সেক্ষেত্রে আমাদের স্থানীয়ভাবে অনেক স্বতন্ত্র ক্যান্ডিডেটও হবে। আর দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না, তো দেখা যাবে যে অনেক স্বতন্ত্র ক্যান্ডিডেটের সাথে আমাদের লিয়াজু করা লাগতে পারে, সেটা স্থানীয়ভাবে পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা করব।
কালবেলা: বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত। এই বিভক্তির দায় কার বেশি?
গাজী আতাউর রহমান: এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়। প্রত্যেকটা ইসলামি সংগঠনের কিছু নীতি আছে, গঠনতন্ত্র আছে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে, আমার মনে হয় প্রত্যেকটা সংগঠন যদি তাদের ঘোষিত নীতি, আদর্শ বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ওপর অটল থাকতো, তাহলে আসলে এভাবে বিভক্তি হওয়ার কথা না। এখন আপনারা বিশ্লেষণ করে দেখবেন কোন সংগঠনটা তাদের নীতি আদর্শ এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্যের ওপর আছে; যদি আমরা আমাদের নীতি আদর্শের ওপরে অটল থাকি এবং অন্যরা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে সেটার দায়িত্ব তো আমাদের না।
কালবেলা: জামায়াতের সঙ্গে আপনাদের আদর্শগত দূরত্ব বেশি, নাকি রাজনৈতিক দূরত্ব?
গাজী আতাউর রহমান: এখানে জামাতের প্রসঙ্গটা আসাটা ঠিক না। কারণ হলো, জামাত তো নিজেদেরকে নিজেরাই একটা ইসলামি সংগঠন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগঠন— এটা ওইভাবে তারা দাবি করে না। তারা বলে এটা একটা মডারেট ডেমোক্রেটিক পার্টি, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো তারাও একটা রাজনৈতিক দল। অতএব এটার সাথে আমাদের ইসলামী আন্দোলনের তুলনার প্রয়োজন আমি মনে করি না।
কালবেলা: সম্প্রতি গাইবান্ধায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবতা শ্রীরামচন্দ্রের ছবিতে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ উঠেছে। পুরো বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
গাজী আতাউর রহমান: বাংলাদেশ হলো একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এই দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চক্রান্ত করা হয় এবং আমাদের ভিতরে-বাইরে বিভিন্ন রকম উসকানি হয়। আমি আশা করব কেউ উসকানিতে পা দেবে না। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের যে ধারাবাহিক ইতিহাস সেগুলোকে সামনে রেখে আমরা এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখব। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আমরা সহবস্থান করব। হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই থাকবে, সবাই তাদের ধর্মকর্ম করবে।
গাইবান্ধায় যে বিষয় উত্তেজনা হচ্ছে, আমি মনে করি এখানে একটা উসকানিমূলক ঘটনা ঘটছে। গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ আছে। হিন্দুরা তো এদেশে আছে, তারা তাদের পূজা করছে, তাদের মূর্তি আছে, দেব-দেবীও আছে; এগুলো নিয়ে তো কখনো আমাদের এখানে সংকট হয় নাই। এখন নতুন করে হবে কেন? তাহলে বুঝতে হবে নতুন করে হওয়ার পেছনে কারো না কারো উসকানি আছে এবং গভীর ষড়যন্ত্র আছে। এখানে অসংখ্য মন্দির আছে, সেই মন্দিরগুলোতে তারা বড় বড় মূর্তি বানাক, আমাদের তো আপত্তি নাই; কিন্তু মূর্তির জায়গা তো রাস্তাঘাট না। তো এখানে হঠাৎ করে রাস্তাঘাটে এই মূর্তি নিয়ে এসে বিতর্ক যারা তৈরি করল, এদের উদ্দেশ্য তো ভালো না।
কালবেলা: ইসলামী আন্দোলন ছাড়া কওমিপন্থি সব দলের নেতারাই কমবেশি হেফজাতের সঙ্গে জড়িত। আপনাদের যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিলে কী করবেন?
গাজী আতাউর রহমান: হেফাজতে ইসলাম ‘ইসলাম’ হেফাজতের জন্য কাজ করে। তো আমরাও তো ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি। অতএব ওই সংগঠনের কাঠামোর মধ্যে যেতে হবে কেন? তারা যদি ইসলামের পক্ষে কোনো কর্মসূচি দেয়, দেশের জন্য কর্মসূচি দেয়, আমরা সবসময় সমর্থন করে আসছি। তাই ওনাদের ওখানে কাঠামোর ভিতরে গিয়ে তো আসলে সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন নাই। কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হলেই আমি মনে করি বিষয়টা সুন্দর দেখায়।
কালবেলা: দলের আদর্শের মধ্যে থেকে আপনাদের নারী নেত্রীরা মাঠের রাজনীতিতে কীভাবে অংশ নেবে?
গাজী আতাউর রহমান: নারী ইউনিট আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু ছাত্রী সংগঠন আলাদা করি নাই। অতএব এখানে কোনো বাধা নেই। নারীরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে, তাদের কন্ট্রিবিউশন এখনো দরকার। এ দেশের অর্ধেক জনশক্তি নারী। নারীরা দ্বীনি কার্যক্রমে অংশ নিক এটা আমরা অতীতেও চেয়ে আসছি, এখনো চাই এবং আমরা চাই, নারীরা তাদের অবস্থানে থেকে ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করুক। সাহাবায়ে কেরামের যুগে, আল্লাহর রাসুলের যুগে নারীরা যেম ভূমিকা রেখেছিল; এই যুগেও সেটা সম্ভব। অতএব এখানে এটা নিয়ে নতুন প্রশ্ন আমার মনে হয় আসতে পারে না।
কালবেলা: বিএনপি সরকারের কাছে এখন ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কী?
গাজী আতাউর রহমান: আমাদের প্রত্যাশা হলো, তারা যে অঙ্গীকার করে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করুক এবং যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করুক। এখানে একটা জাতীয় সনদ হয়েছে (জুলাই সনদ) এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সেই সনদকে বিপুলভাবে গ্রহণ করেছে— এটা তারা বাস্তবায়ন করবে, আমরা এতটুকুই চাই। পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ভূমিকা নেবে এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ জবাবদিহিতামূলক একটা প্রশাসন গড়ে তুলবে— এটা আমরা প্রত্যাশা করি।
কালবেলা: ইসলামপন্থি দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে আপনারা এখন কী ভাবছেন?
গাজী আতাউর রহমান: আমরা এখন ঐক্য নিয়ে ভাবছি না আমাদের দলের স্পিরিট হলো, আমরা একটা ঐক্যপ্রয়াসী শক্তি; কিন্তু এখন আমরা আমাদের দলের পুনর্গঠন এবং দলকে আরও জনমুখী করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আপাতত এটাই আমাদের বড় চিন্তা