হামের সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ধরনের গরমিল সামনে এসেছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ। অথচ একই বয়সের শিশুদের জন্য গত রোববার (২৮ জুন) শুরু হওয়া ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। এই হিসাব অনুযায়ী, হামের টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে অন্তত ৬০ লাখ শিশু।
দেশব্যাপী হামের উচ্চ প্রকোপ দেখা দিলে প্রায় তিন মাস আগে শুরু হয় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি। এত দিনেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ হিসেবে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে গুরুত্ব দেওয়া হলেও প্রাণঘাতী হাম ঠেকাতে টিকাদান কর্মসূচিতে একই মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা ঘাটতির কারণে হাম থেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ নিশ্চিত করা যায়নি।
হামের ‘উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ’ ৩০ উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এক সপ্তাহ পর ১২ এপ্রিল চার সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী সর্বাত্মক টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় পর্যায় মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৮ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। মঙ্গলবার (৩০ জুন) পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯২ শিশুকে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে গত ২৮ জুন অনুষ্ঠিত ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই দুই লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান থেকে স্পষ্ট হয়, হামের টিকাদানে ৬০ লাখের বেশি শিশু বাদ পড়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী টিকাদানের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার কথা। কিন্তু টিকাদানের তিন মাস পরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি, উল্টো আগের মতোই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হচ্ছে।
তথ্য সংগ্রহ না করেই টিকাদান
বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতিহীনভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়নকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞরা। টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। দীর্ঘদিন এই বিভাগের রোগ নজরদারি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী। বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।
এই টিকা বিশেষজ্ঞ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আগে টিকাদান কর্মসূচির শুরুতে মাঠপর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রতিটি বাড়ি ও স্কুল থেকে তথ্য নেওয়া হতো। সেই তথ্য সিভিল সার্জন হয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঢাকায় ইপিআইয়ের কাছে পৌঁছাত। সে অনুযায়ী ভ্যাকসিন সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হতো। কিন্তু এবারের ক্যাম্পেইনে তার কোনোটিই করা হয়নি। ফলে ঠিক কী পরিমাণ শিশুকে টিকা দিতে হবে তার সঠিক তথ্য না নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করায় তিন মাসেও সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না। এখনও শত শত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।’
লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা করা হলো ছয় থেকে পাঁচ বছর বয়সি দুই কোটি ৪০ থেকে দুই কোটি ৫০ লাখ, সেখানে প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় দেওয়া ভ্যাকসিনের লক্ষ্যমাত্রা এত কম কেন? বাকি শিশুরা তাহলে এমনিতেই ভ্যাকসিনের বাইরে থাকছে। সে অনুযায়ী টিকা কাভারেজের হার ৭০ শতাংশের মতো। অথচ ৯৫ শতাংশের নিচে হলে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বীকারোক্তি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একটু তাড়াতাড়ি করেই হামের টিকাদান শুরু হয়েছিল। প্রশাসনিকভাবে যে ডেটা (তথ্য উপাত্ত) ছিল, সেটা ধরেই ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ওই সময় পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। আমাদের হাতে সময় ছিল না যে মাঠপর্যায়ে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করব। তবে কোনো শিশু যাতে বাদ না যায় সেভাবেই করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি ধরলে বলতে হয় সংখ্যাটা আসলেই বেশি। কীভাবে এমন পার্থক্য হলো খতিয়ে দেখে জানাতে পারব।’
তাগিদ দিয়েও কাজ হয়নি
প্রস্তুতি নিয়ে টিকাদান শুরুর তাগিদ দেওয়া হলেও তা কানে তোলেনি কর্তৃপক্ষ। এমন অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদের।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলে তখনই আমরা বলেছিলাম, তাড়াহুড়া না করে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দেওয়া হলে কার্যকর হবে। কিন্তু তা কানে তোলা হয়নি। প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় এখনও প্রতিদিন হাজারের বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, অনেক শিশু মারা যাচ্ছে।’
ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘কত শিশুকে টিকা দিতে হবে ইপিআই থেকে সে তথ্য নেয় ইউনিসেফ। ফলে এখানে পুরো দায়টা সরকারের। আমাদের কর্মসূচির অযোগ্যতা ও অদক্ষতার ফলে টিকা দেওয়া হলেও সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না। এখনও প্রতিদিন বহু শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, আরও হবে। যেহেতু সময়মতো আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারিনি, তাই সংক্রমণ নিজ থেকে না থামা পর্যন্ত কিছু করার নেই।’
হামের সর্বশেষ পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবারের (৩০ জুন) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৮৬৬ জন। শনাক্ত হয়েছে ১১৪ জনের। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ৯৩ ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা এক লাখ এক হাজার ৭৭। এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৫ জনের।