Image description

প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে নতুন অবস্থানে দলটির রাজনীতি শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংসদে সরকারের সমালোচনা, রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠন সম্প্রসারণ এবং আদালতে আইনি লড়াই—এই চার ক্ষেত্রকে সামনে রেখে এগোচ্ছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে একদিকে দায়িত্বশীল সংসদীয় বিরোধী দলের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চায় জামায়াত, অন্যদিকে আন্দোলনমুখী সমর্থকদের প্রত্যাশাও ধরে রাখতে চায়।

সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা, একাধিক বিষয়ে আপত্তি এবং চারবার ওয়াকআউট করেছে জামায়াত।

জামায়াতের সংসদ সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বাজেট, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিও সংসদে তুলছেন তাঁরা। দলটির নেতারা বলছেন, তাঁরা তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সমালোচনা এবং বিকল্প মতামত উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কারও কারও মতে, প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় আসায় সংসদীয় রাজনীতিতে দলটির অভিজ্ঞতার ঘাটতি কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে। সে কারণে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য ও শব্দচয়ন নিয়েও বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি; জীবিত বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের ৬৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৬৪ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে গিয়েছেন। তাঁরা সংসদে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। তবে সংসদীয় রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্য ও শব্দচয়নে ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে দলীয়ভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

রাজপথেও সক্রিয়

 সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে
সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরেছবি: প্রথম আলো

সংসদে সক্রিয় থাকলেও রাজপথের রাজনীতি থেকে সরে আসেনি জামায়াত। সংসদ নির্বাচনের পর গত চার মাসে রাজধানীতে অন্তত ৯ দিন বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। ঢাকার বাইরেও মহানগর ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। গত ১৬ মে রাজশাহী বিভাগ থেকে ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ শুরু হয়েছে। আগামী ২৫ জুলাই তা শেষ হওয়ার কথা। এরপর অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি দলটির প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনে দলীয়করণ, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সীমান্ত হত্যা ও ভারতের পুশ ইন ইস্যুও সামনে আনছে দলটি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তাঁরা সংসদ নির্বাচনের আগেই তুলেছিলেন। এ দাবিতে এখনো অটল আছেন তাঁরা। তবে জামায়াত মূলত জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে মাঠে নেমেছে। এর সঙ্গে তারা জনবান্ধব বিষয়গুলো নিয়ে রাজপথে সোচ্চার থাকবে।

দলটির একাধিক সূত্র বলছে, নির্বাচনের পর কর্মীদের একটি অংশ দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রত্যাশা করছিল। তবে নেতৃত্ব মনে করছে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি ও জনমত গঠনের কৌশল সরাসরি সংঘাতের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।

সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে
সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরেছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সংগঠন গোছানো

রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে এই নির্বাচনকে দেখছে দলটি। এ কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলটির নেতারা নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। একই সঙ্গে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব বিকাশে জোর দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে পদ বা মনোনয়নের জন্য আগ্রহ প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। দলটির গঠনতন্ত্রের ধারা ৭২ (২) অনুযায়ী, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো পদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত হওয়া বা ইহার জন্য চেষ্টা করা উক্ত পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত হইবার জন্য অযোগ্যতা বলিয়া বিবেচিত হইবে।’ অর্থাৎ কেউ দলীয় পদ বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁকে অযোগ্য বলে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে।

তবে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যত্যয়ের ঘটনাও রয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু কিছু দলীয় শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও উঠেছে কিছু জায়গায়। কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে দলটি। দুটি জেলা কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।

এদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেছেন, জামায়াতের প্রতি জনসমর্থন বাড়ায় সেই সমর্থনকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে দাওয়াতি কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আগে জামায়াতের প্রতি ৫০ লাখ মানুষের সমর্থন ছিল, এখন সেটি বেড়ে আড়াই কোটি হয়েছে। জনসমর্থন আরও বাড়াতে দাওয়াতি কাজের, অর্থাৎ জামায়াতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি দলের বর্তমান রুকন বা শপথধারী কর্মী, কর্মী ও সমর্থকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

তবে সমর্থন বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু জায়গায় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ব্যত্যয়ও দেখা যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন আবদুল হালিম। তিনি বলেন, যাঁরা দলের নির্দেশনা মানবেন না, তাঁদের বিষয়ে জামায়াত সাংগঠনিক ব্যবস্থা আগেও নিয়েছে, সামনেও নেবে।

দলের নেতা-কর্মীদের জন্য অভ্যন্তরীণ কর্মশালা, সাংগঠনিক সফরসহ বিভিন্ন কর্মসূচি সামনে আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জামায়াত আরও শক্ত অবস্থানে যাবে বলে জানিয়েছেন দলের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছর দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। সে কারণে কিছু কিছু জায়গায় শৃঙ্খলায় ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। এখন নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই জামায়াত শৃঙ্খলাবহির্ভূত কাজ মেনে নেবে না।

আদালতেও নজর

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ছবি: প্রথম আলো

সংসদ ও রাজপথের পাশাপাশি আইনি লড়াইকেও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে জামায়াত। সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি আসনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে আদালতে গেছেন দলটির কয়েকজন প্রার্থী। তবে তাঁদের আবেদনের শুনানি এখনো শুরু হয়নি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাওয়া একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলেই জামায়াতের প্রার্থীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং দলটির সাম্প্রতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জামায়াতের বর্তমান কৌশলের তিনটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভাবমূর্তি তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখা। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা।

রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংসদে সংযত এবং মাঠে সক্রিয়—এই দুই ধারার সমন্বয় কতটা সফল হয়, সেটিই এখন জামায়াতের বড় পরীক্ষা। কারণ, বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে দলটিকে একদিকে সংসদীয় রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে আন্দোলনমুখী সমর্থকদের প্রত্যাশাও ধরে রাখতে হবে। নতুন বাস্তবতায় এই ভারসাম্য কতটা বজায় রাখতে পারে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে দলটির আগামী রাজনৈতিক পথচলা।