Image description

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত প্রথম সেতু এটি। বলছি, বহুল আলোচিত কালুরঘাট রেলসেতুর কথা। ৯৬ বছর আগে ব্রিটিশদের তৈরি করা এ সেতুটি এখন বয়সের ভারে জরাজীর্ণ। ৪০ বছর ধরেই চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ট্রেনের পাশাপাশি এই সেতু দিয়ে চলে সড়কযানও। কক্সবাজার রুটের ভারী ট্রেনের বোঝাও বইতে হচ্ছে সেতুটিকে।

অন্তত দুই দশক আগে বিশেষজ্ঞরা সেতুটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে মত দিয়েছিলেন। যেকোনো সময় মানবিক বিপর্যয়  ঘটতে পারে— এমন আশঙ্কাও তাদের। আর সেই বাস্তবতায় শুরু হয় নতুন সেতু নির্মাণের আলোচনা।

১৯৯১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩৬ বছরে আটটি সংসদ নির্বাচনের প্রতিটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে উঠে এসেছে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের কথা। প্রার্থীরা তো বটেই, সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া এবং ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী শেখ হাসিনাও নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বারবার এ আশ্বাস দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে বোয়ালখালীতে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ সেতু নিয়ে প্রথম আশার কথা শুনিয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যেসব আশ্বাস এখন পর্যন্ত হয়নি বাস্তবায়ন।

বোয়ালখালী, পটিয়াসহ দক্ষিণের একাংশকে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে কালুরঘাট সেতু। উত্তরের রাঙ্গুনিয়া ও পার্বত্য জেলা বান্দরবানেও যাতায়াত সহজ হয় এ সেতু নির্মাণ হলে। এরপরও কালুরঘাটে সেতু নির্মাণে সরকারের অনাগ্রহ দেখে ২০১৪ সালে আন্দোলনে নামেন স্থানীয়রা। গঠন করা হয় ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’। আলোচনা আবার জোরদার হলে সরকার কালুরঘাটে একটি সড়কসহ রেলসেতু নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ‘পিঁপড়ার গতি’তে চলা সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন শুধু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পর্যন্ত পৌঁছেছে। এরপর আবার স্থবিরতা। তাই দশকের পর দশক ধরে ভোগান্তি বয়ে চলা মানুষের জিজ্ঞাসা— সবই কি ‘ছেলেভোলানো গল্প’? অবুঝ শিশু কোনো কিছুর বায়না ধরে কান্নাকাটি শুরু করলে বা জেদ করলে বাবা-মা, দাদা-দাদিরা যেমন তাকে এর চেয়েও লোভনীয় বস্তু এনে দেবেন বলে গল্প শোনান। আর সেই গল্পে মজে শিশু ভুলে যায় বায়নার কথা। প্রশ্ন উঠেছে, কালুরঘাট সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও কি সেটাই হচ্ছে?

বিশ্বের পুরনো তিন সেতুর অন্যতম টেমস নদীর ওপর ‘লন্ডন ব্রিজ’। বয়স প্রায় ৭০০ বছর। ৫৩ বছর আগে মধ্যযুগীয় অবকাঠামো ফেলে এই সেতু নতুন করে সংস্কার করা হয়। কলকাতার হুগলি নদীর ওপর ১৫৬ বছর বয়সী ‘হাওড়া ব্রিজ’। ৮৩ বছর আগে পন্টুন ব্রিজটি সংস্কার করে ক্যানটিলিভার ব্রিজ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। ৯৫ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি হারবার ব্রিজ’ দেশটির পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো সেতুগুলোর একটি কালুরঘাট রেলসেতু। ১৯৩০ সালে ২৩৯ মিটার দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণ। ১৯৫৮ সাল থেকে সেতু দিয়ে ট্রেনের পাশাপাশি সব ধরনের যানবাহন চলাচল শুরু। ভারত-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাদের আইকনিক ব্রিজগুলো যুগোপযোগী রেখেছে। আর বাংলাদেশে জোড়াতালি দিতে দিতে কালুরঘাট সেতুর অবস্থা এখন শোচনীয়।

অনেক আগেই সেতুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করলেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ড. জিএম সাদিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘কক্সবাজার রুটের ট্রেন চালুর আগে বুয়েটের একটি টিমের তত্ত্বাবধানে কিছু সংস্কার করা হয়েছিল। এরপরও ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে সেতুর ওপর ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজন ছিল নতুন সেতু নির্মাণ করে ট্রেন চালানো। জাপানে দেখেছি, একটি ছোট্ট নদীর ওপর ১০টি ব্রিজ। প্রতি দুই কিলোমিটার পরপর। কর্ণফুলী নদীতেও মাল্টিপল ব্রিজ করা সম্ভব।’

কালুরঘাট সেতু প্রকল্প একনেকে পাস হওয়ায় আশান্বিত হয়েছিলেন জানিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘কিন্তু এরপর কোনো অগ্রগতি না হওয়া দুঃখজনক।’

নিত্য জনভোগান্তির কথা তুলে ধরলেন সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন। তিনি বলছিলেন, ‘সেতুটি একমুখী। একপ্রান্ত থেকে সেতুতে গাড়ি উঠলে বন্ধ থাকে আরেক প্রান্ত। এতে সেতুর যেকোনো একপাশে যানজট লেগে থাকে। আবার ট্রেন চলাচলের সময় উভয় পাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেতুর ওপর কোনো গাড়ি বিকল হলে তো আরও বিপত্তি। শহরের সবচেয়ে কাছের উপজেলা বোয়ালখালী। যেখানে ২০ মিনিটে পৌঁছানোর কথা, কিন্তু সেতুর কারণে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।’

সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের চার বছর পর ২০১৮ সালে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ১১৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করা হয়। ছয় বছর পর ২০২৪ সালে চূড়ান্ত অনুমোদন হয় ডিপিপি। এতে দুই লেন করে চার লেনের সেতু তৈরির কথা বলা হয়। একপাশে ট্রেন, অন্যপাশে বাস-ট্রাকসহ সাধারণ যানবাহন চলবে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৭০০ মিটার। পানি থেকে সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার।

সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ২৭ জুন তৎকালীন সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি ঋণচুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া সহজ শর্তে ৮১ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ হাজার ৫৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৭ টাকা হিসেবে) ঋণ দেবে। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার কথা।

এরই মধ্যে ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্প’ একেনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৪ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু এক বছর পার হলেও দৃশ্যমান আর কোনো অগ্রগতি নেই। এখনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশলী আবুল কালাম চৌধুরী অবশ্য পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষপর্যায়ে বলে জানালেন। তিনি বললেন, ‘বিদেশি অর্থায়নে যেহেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সব প্রক্রিয়া বিদেশি সাহায্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই করতে হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্পগুলোয় সব প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে।’

কালুরঘাট সেতুর পূর্ব-পশ্চিম উভয় প্রান্ত পড়েছে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) সংসদীয় আসনের আওতায়। ভোট ও স্থানীয়দের সেন্টিমেন্টের কারণে এ আসনের সংসদ সদস্যরা সবসময়ই সেতুর জন্য সোচ্চার থাকেন। সেতুর দাবিতে উচ্চকণ্ঠ দুই সংসদ সদস্য মঈনউদ্দিন খান বাদল ও মোছলেম উদ্দিন আহমদ এর মধ্যে পরপারে চলে গেছেন।
বর্তমান সংসদ সদস্য চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহও শুরু থেকেই সেতুর জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন।

তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি রেলমন্ত্রী এবং প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে লেগে আছি। কনসালট্যান্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষের পথে। ২৫টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। পাঁচটি গ্রহণ করে শর্টলিস্ট করা হয়েছে। এখন কনসালট্যান্ট নিয়োগ হলে তারা পুরো প্রক্রিয়া আবার ভেরিফাই করবে। এরপর টেন্ডার।’

বর্তমান সরকার অবশ্য সেতুটি তৈরির ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল— জানালেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের সব উন্নয়ন চাহিদার ব্যাপারে অবগত। তিনি এসব দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। আমি অবশ্যই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনব। তিনি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস।’