বুয়েট শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি হত্যার ২৪ বছর পূর্ণ হলো। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০২ সালের ৮ জুন বুয়েটে ছাত্রদলের দুই পক্ষে সংঘর্ষে প্রাণ হারান এই তরুণী। দুই কোটি টাকার দরপত্র করায়ত্ত করা নিয়ে ঘটেছিল এই সংঘর্ষ। এই হত্যা মামলায় আদালতের চূড়ান্ত রায়ে মোট ছয়জন দণ্ডিত হয়েছিলেন। তাঁদের দুজন এখনো ধরা পড়েননি। বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসে শিক্ষার্থীদের বলি হওয়ার বড় নজির হয়ে আছেন সনি।
সময়টা ২০০২ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ। ক্ষমতায় তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দুই কোটি টাকার একটি টেন্ডার (দরপত্র) আহ্বানের পর ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা চলছিল বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে। মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিন ৮ জুন দুপুরে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওই দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। সেই গুলি কেড়ে নেয় ২৩ বছর বয়সী বুয়েট শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনির জীবন, তাঁর পরিবারের স্বপ্ন। সেই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে।
আজ সোমবার সনি হত্যার ২৪ বছর পূর্ণ হলো। সনি হত্যা মামলায় আদালতের চূড়ান্ত রায়ে মোট ছয়জন দণ্ডিত হন। তাঁদের মধ্যে দুজন এখনো পলাতক। মেয়ের হত্যাকারীদের সবার দণ্ড কার্যকর না দেখার আক্ষেপ নিয়ে ২০২৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন সনির বাবা হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া।
সনি হত্যার পরদিন ‘বুয়েটে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গুলি বিনিময়ে ছাত্রী নিহত’ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল বুয়েট ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বুয়েট ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি মোকাম্মেল হায়াত খান (মুকি) গ্রুপ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তৎকালীন নেতা মুশফিক উদ্দিন (টগর) গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ এবং তা ঘিরে উত্তেজনার বিষয়।
২০০২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ক্যাম্পাসের ডরমিটরি নির্মাণের দরপত্র (২ কোটি টাকার কাজ) আহ্বান করার পর থেকে দুই পক্ষের উত্তেজনা বেড়ে যায়। জুনের প্রথম সপ্তাহে বুয়েট ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়া এলাকাটি ছিল টগর গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। ৮ জুন বেলা পৌনে একটার দিকে মুকি গ্রুপ ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় গোলাগুলি।
সেই গোলাগুলির সময় বুয়েটের পুরোনো ছাত্রী হলের ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে এক সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলছিলেন কেমিকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি সনির কোমরের ডান পাশে এসে বিদ্ধ হয়। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সনি হত্যার ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল, ঝড় উঠেছিল প্রতিবাদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি আন্দোলনে নেমেছিলেন শিক্ষার্থী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ।

২০০২ সালের ৯ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোলাগুলির ঘটনায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাও যুক্ত ছিল। তাদের অনেকেই লুঙ্গি পরা ছিল। ঘটনার পর পুলিশের অভিযোগ ছিল, এক সপ্তাহ ধরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা চললেও বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের কিছু জানায়নি।
এ বিষয়ে বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য নুরউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসী বলেকয়ে আসে না।’ বুয়েট কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, গোলাগুলি চলাকালে থানায় ফোন করা হলেও পুলিশ ক্যাম্পাসে আসে ঘটনার অনেক পরে।
হত্যার পরই গ্রেপ্তার–অভিযান
ছাত্রদলের যে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে সনি হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল, তাদের মধ্যে মুকি গ্রুপের নেতা মুকি ছিলেন বুয়েটের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। বিএসসি পাস করার পর ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখতে খণ্ডকালীন স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। থাকতেন বুয়েটের এম এ রশীদ হলে।
তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের স্থগিত হওয়া কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মুকি। ঢাকার লালবাগ এলাকার একদল চিহ্নিত সন্ত্রাসী নিয়ে তিনি প্রায়ই বুয়েট ক্যাম্পাসে মহড়া দিতেন এবং দরপত্রের সময় এলে বাধা দিতেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল তখন সংবাদপত্রে।
অন্যদিকে টগর ছিলেন বুয়েটসংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (এসএম হল) শাখা ছাত্রদলের নেতা।
সনি হত্যার পর বেলা সোয়া দুইটার দিকে বুয়েটের রশীদ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। তবে এর আগেই খবর পেয়ে মুকিসহ তাঁর অনুসারীরা পালিয়ে যায়।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এসএম হলের সিঁড়ির এক পাশে ইটের আড়ালে লুকিয়ে রাখা ১০টি রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
লালবাগের গণকটুলী সুইপার কলোনি থেকেও ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইস্কাটনের একটি ক্লিনিক থেকে গ্রেপ্তার করা হয় টগরের দেহরক্ষী সন্ত্রাসী মকবুল হোসেন মুকুল ওরফে স্বপনকে।
সেদিন মধ্যরাতে বুয়েটের রশীদ হলে আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় মুকি গ্রুপের সদস্য শরিফ ইনামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আবাসিক হলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে হত্যাকাণ্ডের দিনই মোট ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে সনি হত্যার পরদিন বুয়েট ৩ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়, সেদিনই শিক্ষার্থীরা হল ছাড়েন। একই দিন উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে সনির মরদেহ দাফন করা হয়।

আসামিদের বয়ানে ঘটনার বর্ণনা
সনি হত্যার দিনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া টগর গ্রুপের সদস্য মকবুল হোসেন মুকুল ২০০২ সালের ১৮ জুন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, মূলত ২ কোটি টাকার দরপত্রকে কেন্দ্র করে টগর গ্রুপ ও মুকি গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছিল। ৮ জুন সকাল থেকেই ১০ থেকে ১২ জন সহযোগীসহ তিনি বুয়েট ক্যাফেটরিয়ার সামনে অবস্থান নেন। তাঁর কাছে ছিল একটি কাটা রাইফেল। সহযোগীদের কাছে ছিল একাধিক কাটা রাইফেল, বন্দুক ও হাতবোমা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কোনোভাবেই যাতে মুকি গ্রুপের লোকেরা বুয়েটের মূল ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারে।
মুকুলের ভাষ্যে, ঘটনার দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় তাঁরা খবর পান, মুকি গ্রুপ বুয়েটের ছাত্রী হলের দিক থেকে সশস্ত্র অবস্থায় শহীদ মিনারের দিকে আসছে। খবর পাওয়ামাত্র তাঁরা সেদিক লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকেন, বিপরীত দিক থেকে মুকি গ্রুপও পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। একপর্যায়ে মুকি গ্রুপের সামনে টিকতে না পেরে তাঁরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে এবং বোমা মারতে মারতে ক্রমে পিছু হটতে থাকেন। এ সময় তাঁর হাতে গুলি লাগলে তিনি দ্রুত এলাকা ছাড়েন। এরপর কী হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।
পরে সনি হত্যায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত টগরও গ্রেপ্তার হন। তিনিও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে তিনি বলেন, ৮ জুনের ঘটনার কয়েক দিন আগে বুয়েটে একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রের কাজ মুকি তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে বাগিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন। কিন্তু ওই টাকা তিনি তাঁর সহযোগীদের না দিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং দল থেকে কয়েকজন বের হয়ে আসেন।
টগর বলেন, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টায় নিজের সহযোগীদের নিয়ে বুয়েটের ক্যানটিনে অবস্থান নেন তিনি। এ সময় তাঁর গ্রুপের সদস্যদের হাতে ছিল একটি রিভলবার, একটি পিস্তল, একটি কাটা রাইফেলসহ আরও কয়েকটি অস্ত্র। বেলা ১১টার দিকে তিনি (টগর) মুঠোফোনে মুকির সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁকে বুয়েট ক্যাম্পাসে না যাওয়ার জন্য হুমকি দেন। তা সত্ত্বেও মুকি দলবল নিয়ে বুয়েটের তিতুমীর হলের সামনে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণ পর মুকি গ্রুপ তাদের গ্রুপের ওপর গুলি চালালে তারাও (টগর গ্রুপ) পাল্টা গুলি চালায়। এ সময়েই সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
বিচার, রায়, অতঃপর...
ঢাকার বিচারিক আদালতে সাবেকুন নাহার সনি হত্যা মামলার রায় হয় ২০০৩ সালের ২৯ জুন। রায়ে ছাত্রদল নেতা টগর ও মুকির পাশাপাশি পেশাদার সন্ত্রাসী নুরুল ইসলাম সাগর ওরফে শুটার নূরুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাঁচজনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
পরে ২০০৬ সালের ১০ মার্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত; পাশাপাশি যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামির মধ্যে দুজনকে খালাসও দেওয়া হয়। এই হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত মোট ছয় আসামির মধ্যে চারজন কারাগারে ছিলেন। মুকি ও নুরুল এখনো পলাতক।
এদিকে সাজা ভোগের পর ২০২২ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান টগর। সর্বশেষ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার আজিমপুর এলাকা থেকে আবারও গ্রেপ্তার হন ৫০ বছর বয়সী টগর। তাঁকে গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে র্যাব জানায়, সনি হত্যায় সাজাভোগের পর টগর অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বেচাকেনায় জড়িত হন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে ১টি রিভলবার, ১৫৬টি গুলি, ১টি গুলির খোসা, ২টি মুখোশ ও ২টি মুঠোফোন জব্দ করা হয়।

বুয়েটের যে ছাত্রী হলের সামনে সনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর সেই হলের নাম ‘সাবেকুন নাহার সনি হল’ করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। তবে মেয়ের হত্যাকারীদের সবার দণ্ড কার্যকর না হওয়ার আক্ষেপ নিয়ে ২০২৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মারা যান সনির বাবা হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি ব্লাড ক্যানসারে ভুগছিলেন। সনির মা দিলারা বেগম এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
সনি হত্যার পরও বুয়েট ক্যাম্পাসে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০১৩ সালে বুয়েট ক্যাম্পাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ছাত্রলীগ নেতা আরিফ রায়হান দ্বীপ। সর্বশেষ ২০১৯ সালে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছিল। আবরার হত্যার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে।