নয়াদিল্লি আবারও অবৈধভাবে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নাগরিকত্ব যাচাই বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত দিয়ে নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য করছে।
রাজনৈতিক ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এই কৌশলটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মতো, যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন বিএনপি সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য নয়াদিল্লির চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এই ইস্যুর পুনরুত্থান করা হয়েছে।
অতীতের রেকর্ড উল্লেখ করে তারা বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের পুশইন অপারেশন দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওঠানামাকেই প্রতিফলিত করেছে। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক যখন খারাপ হয় তখন এটি বাড়ে, আর দুই সরকারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে এটি কমে যায়।
গত মার্চ মাসে একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা যখন বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে ভারতের পক্ষে এ ধরনের অভিযান চালানো সহজ হয়। তখন এই বিষয়টি ব্যাপক মনোযোগ পায়।
বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘এই ঘটনা আবারও একটি রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি বাংলাদেশে কোন দল ক্ষমতায় আছে তার ওপর ভিত্তি করে ঢাকার প্রতি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে পরিবর্তিত হয় তারই প্রমাণ।’
বিশ্লেষক এবং সাবেক কূটনীতিকরা মনে করিয়ে দেন, গত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের আমলে পুশইন নীতিটি সাধারণ মানুষের মনোযোগের বাইরে ছিল। কারণ, তখন দুই সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু এর আগের বিএনপির শাসনামলে এবং সাম্প্রতিক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হলে এটি উত্তেজনার একটি প্রধান উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বিভিন্ন হিসেবে জানা যায়, শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত প্রায় তিন হাজার মানুষকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়া মানুষের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক, নারী, শিশু ও গর্ভবতী নারীও ছিলেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই সরকারের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরেও পুশইন অব্যাহত রয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে তারা টহল বাড়িয়েছেন। এ সময় তারা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
কর্মকর্তারা আরও জানান, এসব ঘটনা সীমান্তের কিছু অংশে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
সীমান্তে পুশইন চেষ্টার কারণে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই সোমবার নয়াদিল্লিতে শুরু হতে যাচ্ছে দুই সীমান্ত বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক।
কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকরা ভারতের এ ধরণের আচরণকে শনাক্তবিহীন অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। তারা জানান, উভয় দেশেরই নাগরিকত্ব যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন সহজ করার পদ্ধতি চালু রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক উপ-হাইকমিশনার মাশফি বিনতে শামস এই চর্চাকে ‘অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত যদি সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চায়, তবে তাদের এটি বন্ধ করতে হবে।’
নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের আরেক সাবেক উপ-হাইকমিশনার মাহবুব হাসান সালেহ এই পুশইনকে ‘অবৈধ কাজ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সমস্যার সমাধান করার জন্য আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। সেই প্রক্রিয়াগুলো এড়িয়ে যাওয়া আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন।’
ভারতের দাবি
ভারত অবশ্য তাদের পুশইন পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেয় দেয় যে, তারা অভ্যন্তরীণ আইন এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা অনুযায়ী অনথিভুক্ত বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বারবার বলেছেন, নয়াদিল্লি হাজার হাজার সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকত্বের মামলা যাচাইয়ের জন্য ঢাকার কাছে পাঠিয়েছে।
গত মে মাসে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ভারত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ২ হাজার ৬৮০টিরও বেশি মামলা বাংলাদেশের কাছে জমা দিয়ে দ্রুত এই প্রক্রিয়া শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতের অনেক অনুরোধ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
গত ৬ জুন আবারও জয়সওয়াল বাংলাদেশের প্রতি নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানান।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশি রাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী সকল নাগরিকের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পর বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করবে। ভারতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।’
তিনি আরও বলেন, পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ নিয়মিত ভারতে আটক ব্যক্তিদের কনস্যুলার সুবিধা চেয়ে থাকে। তবে এই প্রক্রিয়া প্রায়ই কয়েক মাস সময় নেয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবার খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।’
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক
সীমান্তে পুশইন চেষ্টার কারণে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝেই সোমবার নয়াদিল্লিতে বিজিবি এবং বিএসএফ-এর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে।
বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এ বৈঠক অংশ নেবে।
চার দিনের বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করার অভিযোগ এনেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ রোববার বলেছেন, এ বৈঠকে পুশইন চেষ্টা এবং সীমান্ত হত্যাসহ সীমান্ত সংক্রান্ত প্রধান প্রধান বিষয়গুলো আলোচনায় প্রধান্য পাবে।
তিনি বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সঠিক যাচাইকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তের ওপার থেকে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টাকে বাংলাদেশ শক্তভাবে প্রতিহত করবে।
রাজনৈতিক মাত্রা
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুশইন বিষয়টিকে প্রভাবিত করছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ। মাশফি বিনতে শামস বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এক উদ্বেগজনক রাজনৈতিক প্রবণতা প্রতিফলিত করে।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল তাদের ভোট ব্যাংক সুসংহত করতে মুসলমান এবং কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বক্তব্যকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, পুশইন অব্যাহত থাকলে সীমান্ত এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর পড়বে।
এই চর্চাকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত বেড়ার গেট দিয়ে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার পর অনেককে জিরো লাইনে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়।
মাশফি বিনতে শামস বলেন, বাংলাদেশের উচিত বিদ্যমান সমস্ত দ্বিপাক্ষিক চ্যানেলের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করা এবং এই চর্চা বন্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া।
একই মত পোষণ করে মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার যেকোনো চেষ্টা বেআইনি এবং তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই চর্চা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে শক্তিশালী করতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যকার বিশ্বাস আরও নষ্ট করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে বাংলাদেশ-বিরোধী এবং মুসলিম-বিরোধী বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার হয়ে আসছে। অতীতে নির্বাচনের পর এই ধরনের বক্তব্য কমে যেত। এখন সেসব রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা, যা দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য মোটেও সহায়ক নয়।’
মাহবুব হাসান সালেহ আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভারতের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতির পরিপন্থী।