Image description

আমরা চাই না, অতীতের মতো এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলাগুলো আর আটকে থাকুক। বিচার যেন দৃশ্যমান হয়। মানুষের আস্থাহীনতা যেন দূর হয়

আইনজীবী এলিনা খান

প্রধান নির্বাহী; বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)

রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় হয়েছে মাত্র ৬ কার্যদিবসে। এটা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। তবে এর আগে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল খুলনার শিশু রাকিব হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে। ২০১৫ সালে ওই শিশু হত্যার বিচার হয়েছিল মাত্র ১০ কার্যদিবসে। এ ছাড়া একই বছরে ১৭ কার্যদিবসে বিচার হয়েছিল সিলেটের শিশু রাজন হত্যার। ওই বিচারের পর মামলা দুটি হাইকোর্টের গণ্ডি পেরিয়েছে। এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। প্রায় ৯ বছর ধরে মামলা দুটি আটকে আছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। এ ছাড়া গত বছর মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলারও বিচার হয় দ্রুতগতিতে। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে বিচার শেষ হয় বিচারিক আদালতে। মামলাটি প্রায় এক বছর ধরে হাইকোর্টে বিচারাধীন। বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচার হলেও উচ্চ আদালতে এগুলো আটকে থাকছে।

 
 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু রাজন, রাকিব ও আছিয়ার মতো রামিসা হত্যার বিচারও যেন উচ্চ আদালতে আটকে না থাকে। এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলাগুলো যেন দ্রুত বিচার শেষ করা হয়। তবে এবার আশার কথা হচ্ছে, সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। প্রধান বিচারপতি এরই মধ্যে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ বেঞ্চ থেকে দ্রুত বিচার হলে সাজাও দ্রুত কার্যকর হবে। বিচার দৃশ্যমান হবে। সমাজে তার প্রভাব পড়বে। ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।

 

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মনে করেন, আগামী তিন মাসে রামিসা হত্যার বিচার শেষ করা সম্ভব। তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ফাইলটা যদি হাইকোর্টে আসে, আমরা যদি তার পরের সপ্তাহ থেকে এটাকে পেপার বুকে দিয়ে দিতে পারি, পেপার বুকে দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে আমরা শেষ করতে পারি। তারপর যদি বিশেষ বিবেচনায় এটা শুনানি করা হয়। শুনানি যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে করি। তারপর আপিল বিভাগে যাবে। এটা তিন মাসের মধ্যে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। তবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি মামলাই তো আমরা এরকম ফাস্ট ট্র্যাকে (অগ্রাধিকারে) দিতে পারব না। এ কারণে আমরা একটা ওয়ে আউট (পথ) বের করার চেষ্টা করছি। হাউ ফাস্ট উই ক্যান ডু দ্যাট (কত দ্রুত আমরা এটা করতে পারি)।

রামিসা হত্যার রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয়, কিন্তু মানুষ এ রায়ের কার্যকর দেখতে পায় না বিলম্বের কারণে। আমরা যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা সবসময় বলে থাকি, যতক্ষণ না সেই শাস্তি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রায়ের ব্যাপারে মানুষের যে শঙ্কা, তা থেকে যাচ্ছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমি উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে এটি এনেছি। প্রধান বিচারপতি আমার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে শিশু রামিসার মামলাসহ নারী ও শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোর আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা জানিয়েছেন, যেটি আগামী রোববার থেকে কার্যকর হবে।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রধান নির্বাহী মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এলিনা খান কালবেলাকে বলেন, প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মামলা দ্রুত শুনানি করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন। এই দাবি দীর্ঘদিনের। কারণ মামলাগুলো উচ্চ আদালতে এসে আটকে যায়। এজন্য বিশেষ বেঞ্চের প্রয়োজন ছিল। তিনি আরও বলেন, শুধু রামিসা হত্যার বিচার নয়, এ ধরনের অন্য মামলাগুলোও যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়; দ্রুত যেন শাস্তি কার্যকর করা হয়। লোকে যেন বুঝতে পারে, বিচার হয়েছে। অপরাধীর সাজা হয়েছে। তাহলে এটার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে। নারী ও শিশুরা নিরাপদে থাকবে। অ্যাডভোকেট এলিনা খান আরও বলেন, ৬ কার্যদিবসে রামিসা হত্যার বিচার হলো। বিশেষ বেঞ্চ যদি গঠন হয়। পেপারবুক যদি দ্রুত তৈরি করা যায়। অ্যাটার্নি অফিস যদি তৎপর থাকে, তাহলে বিচার দ্রুত তিন মাসের মধ্যে শেষ করা সম্ভব। আমরা চাই না, অতীতের মতো এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলাগুলো আর আটকে থাকুক। বিচার যেন দৃশ্যমান হয়। মানুষের আস্থাহীনতা যেন দূর হয়।’

‘সিলেটের রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যার বিচার ঝুলছে আপিল বিভাগে’,

চুরির অপবাদে ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন শেখপাড়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয় শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে (১৪)। সে ছিল সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামের সবজি বিক্রেতা। তার লাশ গুম করার সময় ধরা পড়ে একজন। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে। ফেসবুকে প্রচারের উদ্দেশ্যে সেই নির্মম নির্যাতনের ভিডিওচিত্রও ধারণ করে নির্যাতনকারীরা। পরে ভিডিও ফাঁস হলে দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। ঘটনার পরপরই পালিয়ে সৌদি আরব চলে যান মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম। ইন্টারপোলের (আন্তর্জাতিক পুলিশ) মাধ্যমে একই বছরের ১৫ অক্টোবর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

একই বছরের ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনার টুটপাড়ায় শরীফ মোটরস নামের গ্যারেজে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ায় ব্যবহৃত কমপ্রেশার মেশিনের নল রাকিবের মলদ্বারে দিয়ে শরীরে বাতাস ঢোকানো হয়। এতে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ওই রাতেই সে মারা যায়। অভিযোগ ওঠে, ওই গ্যারেজের কর্মী রাকিব বিভিন্ন সময় মারধরের শিকার হতো এবং ঠিকমতো মজুরি না পেয়ে অন্য একটি কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হন শরীফ। পরে সুযোগ পেয়ে রাকিবকে ধরে এনে সহযোগীকে নিয়ে ওই নির্যাতন চালান। এ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে শরীফ মোটরসের মালিক শরীফ, তার সহযোগী মিন্টু ছাড়াও শরীফের মা বিউটি বেগমকে জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাকিবের বাবা মো. নুরুল আলম এ তিনজনের বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।

এ দুটি ঘটনা তখন সারা দেশে আলোড়ন তোলে। দ্রুত বিচারের পদক্ষেপ নেয় তখনকার সরকার। একই বছরের ৯ নভেম্বর সিলেট ও খুলনার পৃথক আদালত এ দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণা করেন। সিলেটের রাজন হত্যা মামলার ১৩ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি কামরুল ইসলামসহ চারজনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ফাঁসির সাজা পাওয়া অন্য তিন আসামি হলেন সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার পীরপুর গ্রামের বাসিন্দা, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের চৌকিদার সাদেক আহমদ ওরফে বড় ময়না (৩৫), শেখপাড়া গ্রামের তাজউদ্দিন আহমদ ওরফে বাদল (২৪) ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের জাকির হোসেন ওরফে পাবেল ওরফে রাজু মিয়া (২০)। জাকির হোসেন পলাতক রয়েছেন। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আকবর হোসেন মৃধা এ রায় দেন। এ মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তি হলেন জালালাবাদ থানা এলাকার জাঙ্গাইল গ্রামের বাসিন্দা ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর আহমদ ওরফে নূর মিয়া (২০)। তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয় কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ওরফে আলী ও শামীম আহমদকে। শামীমও পলাতক। এ ছাড়া নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ আলী, আজমত উল্লাহ ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি করে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল রায় দেন। রায়ে সিলেটের অধস্তন আদালতের দেওয়া চার আসামির ফাঁসির আদেশই বহাল রাখা হয়। এ মামলায় অধস্তন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি নূর মিয়ার দণ্ড কমিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রধান আসামি কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহাম্মেদের সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। অন্য আসামি দুলাল আহাম্মেদ ও আয়াজ আলীর এক বছরের সাজাও বহাল রাখা হয়। অন্যদিকে মোটর গ্যারেজের কর্মী রাকিব (১২) হত্যার ঘটনায় প্রধান দুই আসামি মো. শরীফ ও মিন্টু খানের ফাঁসির আদেশ দেয় খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালত। অন্য আসামি বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। ১০ কার্যদিবসে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক দিলরুবা সুলতানা। এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি করে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শিশু রাকিব হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মামলার প্রধান আসামি মো. শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। রাজন-রাকিব হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করার পর মামলা দুটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর ৯ বছর পার হয়েছে। কিন্তু মামলা দুটি আপিল বিভাগে আজও চূড়ান্ত শুনানি হয়নি।

‘মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলা’: গত বছরের মার্চে রমজানের ছুটিতে মাগুরার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যায় আট বছরের শিশু আছিয়া। সেখানে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ মেয়েটিকে শুধু ধর্ষণই করেনি, হত্যারও চেষ্টা চালায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু হয় আট বছরের শিশুটির। এ ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের নামে মামলা করেন। পরে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে জনগণ। হিটু শেখের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারও তৎপর হয়ে ওঠে। বিচার হয় দ্রুতগতিতে। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে এ ঘটনার বিচার শেষ করা হয়। গত বছরের ১৭ মে সেই মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান। একই সঙ্গে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় তাকে। রায়ে বাকি তিন আসামি খালাস পেয়েছেন। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) এবং সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)। এ রায়ের দুদিন পরই মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। মাত্র দুই মাসের মাথায় বিচার শেষ হলেও হাইকোর্টে মামলাটি প্রায় এক বছর পড়ে আছে।