জেলায় জেলায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেশের সব সংসদ সদস্যকে এক সুতোয় গাঁথার লক্ষ্যে একটি নির্দেশনা জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে সেই নির্দেশনাকে কেন্দ্র করেই এখন বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।
বেশ কয়েকজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছেন, স্থানীয় জেলা প্রশাসকরা তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে রাখছেন। এর মাধ্যমে সরকারি আদেশ অমান্য করার পাশাপাশি হাজার হাজার ভোটারের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক সংসদ সদস্য জানান, সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হলেও তাদেরকে কোনো বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। এমনকি কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।
টাইমস’র পক্ষ থেকে সাতটি জেলার ১১ জন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাদের অনেকেরই অভিযোগ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের নির্বাচনী এলাকার জনগণ থেকে দূরে রাখতেই পরিকল্পিতভাবে এই বর্জন করা হচ্ছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মাধ্যমে ৩১ সদস্যের ‘জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি’ পুনর্গঠন করা হয়, জেলা প্রশাসককে যার সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সদস্য সচিব করা হয়।
ওই আদেশে স্পষ্ট করে বলা আছে, জেলার সব সংসদ সদস্য এই কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া তারা নিয়মিত সভার কার্যবিবরণী পাবেন এবং আলাদা নোটিশের মাধ্যমে তাদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে এই প্রজ্ঞাপন জারির পর তিন মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও অনেক বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা জানান, তারা এখন পর্যন্ত একটি বৈঠকেও অংশ নিতে পারেননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক শাখা) জিয়াউদ্দিন আহমেদ টাইমস’কে বলেন, কোনো জেলা প্রশাসক এই নির্দেশনা মানছেন না—এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই। এমনটি হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের আচরণকে প্রশাসনিক নিয়মনীতির মারাত্মক লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন।
তিনি টাইমস’কে বলেন, জনস্বার্থের এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবার ঐকমত্য ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তৈরি একটি সরকারি নির্দেশনা সরকারি কর্মচারী হয়েও অমান্য করা এক ক্ষমাহীন আচরণ। এটি স্পষ্টতই আচরণবিধির লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, যদি রাজনৈতিক কারণে এমনটা করা হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড জনপ্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়ে সরকারের যে অঙ্গীকার, তার পরিপন্থী।
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান জানান, তিনি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের কোনো আমন্ত্রণপত্র পাননি।
তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসকরা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন করছেন না। আমাদের কমিটির উপদেষ্টা হওয়ার কথা, অথচ আমাদের কখনোই ডাকা হয়নি।’
সাইফুল আলম খান আরও জানান, ঢাকার জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে তাকে জানানো হয়েছে যে এই নির্দেশনা সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। এটি সরকারের হীনমন্যতারই বহিঃপ্রকাশ।
এই সংসদ সদস্যের অভিযোগ, কিছু জেলা প্রশাসক সরকারি দলের নেতাদের চাপে পড়ে অথবা তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য এমন কাজ করছেন।
একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। এ ছাড়া যশোরে সংসদের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জামায়াতের সংসদ সদস্য রয়েছেন। তবে সেখানেও তাদেরকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
যশোর-১ (শার্শা) আসনের সঙসদ সদস্য আজিজুর রহমান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বাদ দেওয়া মানে ভোটারদের অসম্মান করা। তিনি বলেন, ‘যাঁরা আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতাদের বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের শুধু জেলা কমিটির বৈঠক থেকেই বাদ দেওয়া হচ্ছে না, বরং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি ও সুযোগ-সুবিধা থেকেও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের দূরে রাখা হচ্ছে।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি ঈদুল আজহার সময় ব্লিচিং পাউডার ও বর্জ্য ফেলার ব্যাগ বিতরণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, তখন তারা জানান যে বন্টন প্রক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের যুক্ত করার কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।’
এই বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যসহ দলটির সিনিয়র নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিএনপির ফরিদপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম টাইমস’কে বলেন, ‘আমার জেলায় জামায়াতের কোনো সংসদ সদস্য নেই। তবে বিভাগে জামায়াতের দুইজন সংসদ সদস্য আছেন, তাদেরকে নিয়মিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।’
সেলিম আরও বলেন, ‘যেহেতু সরকারি প্রজ্ঞাপনে সংসদ সদস্যদেরকে কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে, তাই তারা আমন্ত্রণ পাবেন—এটাই স্বাভাবিক। এর বাইরে অন্য কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা হলেন কমিটির উপদেষ্টা। তাদের কোনো পরামর্শ থাকলে তারা কমিটিকে জানাতে পারেন। প্রতিটি বৈঠকে তাদের সশরীরে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক নয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে সংসদ সদস্যদেরকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলা আছে—এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘আমরা সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণ জানাই। প্রায়ই ব্যস্ততার কারণে তারা আসতে পারেন না। তবে উপজেলা পর্যায়ের কমিটির বৈঠকগুলোতে তারা বেশ সক্রিয় থাকেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উত্তরবঙ্গের একজন জেলা প্রশাসক ইঙ্গিত দেন, রাজনৈতিক চাপ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ‘আমার জেলায় জামায়াতের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য আছেন। প্রথমে তাদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর পর সরকারি দলের এমপিরা ক্ষুব্ধ হন। এরপর থেকে তাদেরকে আর আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না।’
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সঙসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ জানান, আমন্ত্রণের বিষয়টি একেবারেই অনিয়মিত। তিনি বলেন, ‘কখনো আমাদের ডাকা হয়, আবার কখনো ডাকা হয় না। প্রশ্ন হলো, কিছু জেলা প্রশাসক কেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের ডাকতে এত দ্বিধাবোধ করছেন?’
তবে সব বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য যে বাদ পড়েছেন, তা নয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সীমিত সংখ্যক বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য, বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন।
তা সত্ত্বেও, বিরোধীদলীয় নেতারা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার এই অসম বাস্তবায়ন স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।