Image description

বিএনপি সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১ জুন) ডেইলি ক্যাম্পাসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা এবং দায়িত্ব পালনে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। এ কারণে পদত্যাগপত্র গ্রহণের অনুরোধ জানান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে রাঙামাটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দীপেন দেওয়ান। ওই আসনে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হলো।

দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় দীর্ঘদিনের। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, যার পদমর্যাদা ছিল মন্ত্রীর সমান। তিনি রাঙামাটি জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং পরে জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনুসরণ করে ২০০৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তার ইচ্ছা ছিল সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার। তবে পরিবারের চাপে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সপ্তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে জুডিসিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন।

২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান দলত্যাগ করলে বিএনপিতে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ২০ বছরের জুডিসিয়াল সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। তবে রাজনীতিতে প্রবেশের পরপরই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন স্থগিত হয়ে গেলে তার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাও থমকে যায়। নতুন নির্বাচনী বিধানের কারণে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান তিনি। পরে ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাঙামাটিতে বিএনপির অন্যতম অভিভাবকসুলভ নেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন দীপেন দেওয়ান। অবরোধ, মিছিল, সমাবেশসহ দলীয় সব কর্মসূচিতে তার সরব উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দুঃসময়ের পর তিনি জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। পরে একই দিন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

দীর্ঘ এক যুগ পর রাঙামাটি থেকে মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন রাঙামাটির সাবেক সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার। এরপর ১২ বছর পর আবার রাঙামাটি থেকে একজন সংসদ সদস্য পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী এবং মীর হেলাল প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করেন দীপেন দেওয়ান। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী ছিলেন রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য মনিস্বপন দেওয়ান।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে রাঙামাটিতে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হন দীপেন দেওয়ান। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পান ৩১ হাজার ২২২ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২। পাঁচ লাখের বেশি ভোটারের এই আসনে রেকর্ড ব্যবধানে জয় পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন সাবেক এই জুডিসিয়াল কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।