ঝিনাইদহে হামলার ঘটনার তিন দিন পর সেই পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি দাবি করেন, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার পর তার ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
এ সময় তাকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ, ঘুষি, ধাক্কা, ইট-পাটকেল ও হকিস্টিক দিয়ে হামলা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি কখনো মারা যাই, আমাদের খুনের বিচারটা যেন করা হয়, এইটুকুই অনুরোধ।’
আজ সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে ‘ফিরে আসা মৃত্যুর মুখ থেকে’ শিরোনামে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ অনুরোধ জানান।
পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, ‘ঝিনাইদহে প্রয়াত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের কবর জিয়ারত এবং আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। যানজট ও সড়কের দুরবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে ঝিনাইদহে পৌঁছে কোর্ট জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।
তিনি জানান, নামাজ শেষে মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও ছবি তোলার পর হোটেলের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক তাকে হুমকি দিতে শুরু করেন। তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তিনি লেখেন,‘এরপর হঠাৎ করে চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করি। পাশ থেকে জানানো হয় আমার চোখে ডিম মারা হয়েছে। এরপর পাশ থেকে একজন জোরে ধাক্কা দেয়, একজন ঘুষি মারে, আমার মাথা ভো ভো করতে থাকে। আমাদের সহযোদ্ধারা ব্যারিকেড তৈরি করে আমাকে রক্ষা করে। এর মাঝে কয়েকজনের মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে।’
‘হঠাৎ দেখি বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুড়ছে আমাদের দিকে। এরপর শুরু হয় হকিস্টিক দিয়ে আঘাত।আমি উঠে দাঁড়াই এবং প্রতিরোধের ডাক দেই। কয়েকজনকে ধরে তাদের কাছ থেকে হকিস্টিক ও স্টিক উদ্ধার করতে সক্ষম হই, যা পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুলভাবে প্রচার করা হয়’, যোগ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি দাবি করেন, হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত কিছু পুলিশ সদস্যও হামলাকারীদের পক্ষ নিয়েছেন বলে তাদের মনে হয়েছে। ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপির কর্মী এবং পুলিশের উপস্থিতিকে তিনি একটি ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসে তাদের সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান তিনি।
হামলার পর বিকেলে এনসিপির নির্ধারিত একটি যোগদান কর্মসূচির নিরাপত্তা এবং হামলার বিচার দাবিতে থানায় যান বলেও জানান পাটোয়ারী। তার অভিযোগ, ‘থানায় পৌঁছানোর পর পুলিশ জানায় বিকালের অনুষ্ঠান করা যাবে না এবং কমিউনিটি সেন্টার সিলগালা করে দেয়। আমরা আমাদের নিরাপত্তা দাবি করি। তারা অপারগতা জানায় এবং বলে ঝিনাইদহ ছেড়ে চলে যেতে।’
তিনি আরও দাবি করেন, থানায় অভিযোগপত্র প্রস্তুত করার পর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও সার্ভার সমস্যার কথা বলে মামলা গ্রহণে গড়িমসি করা হয়। প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে মামলা গ্রহণ করা হয়। এ সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, ‘এর মধ্যে আমি ফেসবুকে পোস্ট দেই। তখন ওসি ও এএসপি থানা থেকে সরে যায়। আমি ঘোষণা দেই থানার সামনে অবস্থান করবো। পরে জানানো হয় মামলা নেওয়া হবে, তবে কিছু নাম বাদ দিতে হবে। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ায়, যাকে মূল পরিকল্পনাকারী বলা হচ্ছিল, তখনই তারা মামলা নিতে রাজি হয়। ঢাকা থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের ফোন আসে, তারা বলে মামলা হবে, আপনারা চলে আসেন। কিন্তু আমার মনে হয় মামলা হবে না, তাই আমি অবস্থান জোরালো করি।’
হঠাৎ ওসি ও এএসপি উপস্থিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা উপর থেকে নির্দেশ পায় মামলা নিতে। ৮ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে এবং তারা মামলা নেয়। মামলা নেওয়ার পর আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।’
তিনি দাবি করেন, হামলার পর ঝিনাইদহে এনসিপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের অভিযোগও তোলেন তিনি।
পোস্টের শেষে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছেন, ‘আমরা যদি কখনো মারা যাই, আমাদের খুনের বিচারটা যেন করা হয়, এইটুকুই অনুরোধ। হাদী ভাইয়ের বিচার হয়নি। তাই আশা কম, কিন্তু আল্লাহ আছেন।কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ যেন সব অন্যায়কারীর বিচার করেন-এই দোয়া ছাড়া এই মজলুমের আর কিছু বলার নেই।’
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (২২ মে) ঝিনাইদহ পৌর কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর তার ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া এক পোস্টে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনা হয়।