ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলেও তা চায় না ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। তারা মনে করে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আবারও সংঘাতময় হয়ে ওঠতে পারে রাজনীতি। আর সরকারকে তেমন অরাজক পরিস্থিতিতে ফেলার সুযোগের অপেক্ষায় আছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। তাই বিএনপি সরকার শেখ হাসিনার এই ‘ফাঁদে পা’ দেবে না। তাই শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার ট্রাভেল পাস দেওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর একাধিক সিনিয়র নেতা, কূটনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপ করে বিএনপি সরকারের এই মনোভাব জানতে পেরেছে টাইমস অব বাংলাদেশ।
গত সপ্তাহে টাইমস অব বাংলাদেশে’র কাছে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, শেখ হাসিনা তাদের কাছে আগস্টের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন। দেশে ফিরে আইনগতভাবে মামলা মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার জন্য শিগগিরই দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পাস নেবেন বলেও জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আইন অনুযায়ী তিনি দেশে ফিরে এলে তাকে প্রথমে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে হবে। কারাগার থেকেই তাকে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে হবে। আপিল করার সময় আগেই পেরিয়ে যাওয়ায় আপিল বিভাগ চাইলে শেখ হাসিনার আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিতে পারে, আবার চাইলে আবেদন গ্রহণও করতে পারে।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে ‘ফাঁদ’ হিসেবে দেখছে বিএনপি সরকার। কারণ, শেখ হাসিনা দেশে পা দেওয়া মাত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শতগুণ বেশি চাঙা হয়ে ওঠবে। বিএনপি মনে করে, শেখ হাসিনা কারাবরণ করলে তার মুক্তির দাবিতে দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে আসবে। সুপ্রিম কোর্টে তার আপিল আবেদন খারিজ হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা আরও মারমুখী হয়ে ওঠতে পারে। তখন শান্তিতে সরকার পরিচালনার চেয়ে তখন রাজপথে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতেই ব্যস্ত সময় পার করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘টাইমস’কে বলেন, শেখ হাসিনা ফিরে এলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া তাকে কারারুদ্ধ করার পর নানা রকম বিদেশি চাপও শুরু হতে পারে। তাই বিএনপি এমন ‘উটকো ঝামেলা’ টেনে আনতে চায় না।
অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে সন্দেহ করে বিএনপি। দলের সিনিয়র নেতাদের মতে, শেখ হাসিনা ফিরে এলে এসব দল মামলা দ্রুত উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি করে ফাঁসি কার্যকরের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করতে পারে। জামায়াতে ইসলামী এভাবেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পরিকল্পনা করছে বলে সন্দেহ করে বিএনপি।
শনিবার ময়মনসিংহে এক জনসভায় জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের নিয়ে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জামায়াতের নাম না নিয়ে বলেছেন, ওরা তলে তলে ক্ষমতাচ্যুতদের খাতির করছে। উদাহরণ হিসেবে এ সময় ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের কথাও টেনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে গিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। আর ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুগপৎ’ আন্দোলন করেছে আওয়ামী লীগ-জামায়াত।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালে দেশ থেকে বিতাড়িতরা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে। আর তলে তলে তাদের সঙ্গে খাতির শুরু করেছে আরেক দল। জামায়াত জোটের এনসিপিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই দলের ছোট ছোট লেজও গজিয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনেকটা স্পষ্ট করেই ইঙ্গিত দেন, শেখ হাসিনা ফিরে আসার নামে অরাজকতা করতে চাইছে। আর এতে ইন্ধন দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে জামায়াত ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, তার দল আশা করে সরকার শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করবে।
টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা দেশে এসে যদি সাজা ভোগ করতে চান আমরা তাকে স্বাগত জানাব। কারণ, তিনি যে গণহত্যায় জড়িত সেটি মেনে নিয়ে দেশে আসুক আমরা সেটি চাই। আর যদি তিনি আসতে না চান তাহলে সরকারের উচিত অবশ্যই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা।’
গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার চায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরে মামলা মোকাবিলা করুক। তবে রোববার আরেক অনুষ্ঠানে দেশে ফেরার জন্য শেখ হাসিনাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন তিনি। বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার আশা করে আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে।
দুইজন সাবেক কূটনীতিক টাইমস’কে বলেন, ভারত কখনো প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেটা ভালো করে জানেন বলেই ট্রাভেল পাসের বদলে প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রসঙ্গ টেনেছেন। কারণ, সরকার শেখ হাসিনার ফিরে আসা চায় না। এ কারণে বাংলাদেশ হাইকমিশনও তাকে ট্রাভেল পাস দেবে না।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর তার বিশেষ কূটনৈতিক ‘লাল’ পাসপোর্ট বাতিল হয়ে গেছে। নতুন করে তাকে সাধারণ পাসপোর্টও দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি এখন পাসপোর্টবিহীন অবস্থায় ভারতে আছেন।
আইন অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছে কোনো কারণে পাসপোর্ট না থাকলে বা পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন তাকে দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস দেয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুল হাই ‘টাইমস’কে বলেন, ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদনকারীর বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে দূতাবাসের কনস্যুলেট শাখা সাধারণত ট্রাভেল পাস দিয়ে দেয়। কারণ, প্রত্যেক নাগরিকেরই নিজ দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে।
তবে অনেক সময় বাংলাদেশ মিশন ট্রাভেল পাসের আবেদন ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয় বলে জানান আবদুল হাই। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পেলে আর ট্রাভেল পাস দেওয়া হয় না। এভাবেই সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছায় কোনো ব্যক্তির ট্রাভেল পাস আটকে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন বিএনপি সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার সুযোগ দেবে না। কারণ, এতে সরকারের সামনে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা রকম ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন করবেন। এ সময় সরকারের জন্য তৈরি হবে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। কারণ, সাধারণ আইন অনুসারে শেখ হাসিনার আপিল করার সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু হাইকোর্ট চাইলে তাকে সেই সুযোগ দিতে পারে। এ নিয়ে যদি সরকারের আপত্তি না-ও থাকে, তবু বিষয়টি নিয়ে আদালত অঙ্গন উত্তপ্ত করতে পারে জামায়াতে ইসলামী।
এ ছাড়া দেশে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে নেমে এলে বিএনপি সরকারের তা সামলানোর সামর্থ্য নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে তারা ১৯৯৫-৯৬ এবং ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কথা বিএনপি মাথায় রেখেছে বলে করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল লতিফ মাসুম ‘টাইমস’কে বলেন, দেশের রাজনৈতিক এবং সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। সরকারেরও তাকে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না। কারণ, তিনি দেশে ফিরলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়া সরকারের ঠিক হবে না।
অধ্যাপক মাসুমের ধারণা, সরকার যাই বলুক না কেন, তাকে দেশে আসার সুযোগ করে দেবে বলে মনে হয় না। কারণ, তার প্রতি মানুষের যে ক্ষোভ রয়েছে সেই জায়গা থেকে তাকে নিরাপত্তা দেওয়াও হয়তো সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ হাসিনা ফিরে এলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব রাখে এমন বিদেশি শক্তিগুলোর তৎপরতা বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক আন্দোলন–সবকিছু মিলিয়ে একটি অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
তারা আরও বলেন, বিএনপি-বিরোধীরা সবাই মিলে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু করলে বিএনপি তা সামাল দিতে পারবে না। এসব হিসাব-নিকাশ থেকেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা চায় না বিএনপি।