দমন-পীড়ন, মামলা-গ্রেপ্তারের তোপে বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যখন সুনশান নীরবতা থাকতো, তখনো সেখানে দেখা মিলতো একজনের। প্রত্যেকটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ওই কার্যালয়ে এক ধরনের অবরুদ্ধ দশা তৈরি করা হতো।
ফ্যাসিবাদের ভীষণ দুঃসময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে এভাবে আগলে রাখার কারণে তাকে ‘আবাসিক নেতা’ বলেও বিভিন্ন সময়ে উপহাস-কটাক্ষ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী বা দলীয় নেতারা। কিন্তু তিনি সেসব গায়ে না মেখে এগিয়ে গেছেন রাজনৈতিক লড়াইয়ে।
প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দেশে ফিরেছে গণতন্ত্র। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারে এসেছে রিজভী আহমেদের দল বিএনপি। এখন দলের সুসময়। অনেকে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু রিজভী আছেন তার সেই রাজনৈতিক আঙিনায়ই। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে নিজের রাজনৈতিক ও শিল্প মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) পদে দায়িত্ব দিয়েছেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা আছেন, যারা পদ বা ক্ষমতার চেয়েও বেশি পরিচিত হন সংগ্রাম, ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং দুঃসময়ে দলের পাশে থাকার জন্য। রুহুল কবির রিজভী সেই ধারারই একজন—যার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে রাজপথ, নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়, অসংখ্য মামলা আর কারাবরণের অভিজ্ঞতায়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদ উৎখাতের লড়াই
রিজভী আহমেদের পৈত্রিক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলায়। তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্রজীবনে। রাজশাহী অঞ্চলে বেড়ে ওঠা রিজভী রাজশাহী সরকারি কলেজে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করার সময় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হন।
১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন। তখন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধও হন—যা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
ছাত্ররাজনীতি থেকে মূল দলে আসার পর ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠকেন্দ্রিক সক্রিয়তা এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কারণে তিনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে “দৃশ্যমানতা”—তিনি তাত্ত্বিক রাজনীতির চেয়ে মাঠের রাজনীতি এবং সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্য বেশি পরিচিত।
রিজভীর সমর্থকদের মতে, ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। রিজভীর কাছে এই কার্যালয় কেবল একটি প্রশাসনিক স্থান নয়—এটি যেন তার জীবনের আরেক নাম। তার রাজনৈতিক জীবন এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে রাজনীতি পেশা নয়, বরং এক ধরনের অঙ্গীকার; আর সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দলীয় কার্যালয়ের ছোট্ট একটি কক্ষ, একটি পুরোনো খাট এবং কিছু কাগজপত্র।
কার্যালয়ের সেই খাটটি এখন শুধুই একটি আসবাব নয়, বরং এক ধরনের প্রতীক। বহু নির্ঘুম রাত, হঠাৎ ভোরে প্রেস ব্রিফিংয়ের প্রস্তুতি, কিংবা গভীর রাতে দলীয় সংকট নিয়ে আলোচনা—সবকিছুর নীরব সাক্ষী এই খাট।
সমর্থকরা রিজভীর পুরনো সংগ্রামের স্মৃতিচারণে বলছেন, ঠিকমতো ঘুম হলো কি না, সেটি তার কাছে বড় বিষয় ছিল না; গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, যেকোনো মুহূর্তে প্রস্তুত থাকা। কখনো সেখানে বিশ্রাম, আবার কখনো ফোনকল বা বৈঠকের মাঝেই কেটে গেছে পুরো রাত। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হতো তার দিন। কার্যালয়ের সামনে ভিড় জমাতো নেতাকর্মীরা—কারও মামলা, কারও সাংগঠনিক জটিলতা, কারও আবার দিকনির্দেশনার প্রয়োজন। তাদের সবার একটাই ভরসা—রিজভীকে পাওয়া যাবে এখানেই। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবন যেন পেছনে সরে যায়; সংসার, পরিবার, আত্মীয়তা—সবকিছুর জায়গা দখল করে দলীয় দায়িত্ব।
কার্যালয়কেন্দ্রিক অবস্থান হলেও রিজভী সবসময় রাজপথে সরব থেকেছেন। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে যখন ডজন কয়েক নেতা-কর্মী জোটানোও কঠিন হতো, তখনো নয়াপল্টন, বিজয়নগর বা কাকরাইল এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এজন্য তাকে কম ভুগতে হয়নি।
ফ্যাসিবাদের আমলে বিএনপির যেসব নেতা সবচেয়ে বেশি মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের একজন রিজভী। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় দুইশ’। ওই বছরের অক্টোবরের বিএনপির নয়াপল্টনের সমাবেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক সহিংসতা করলে বিএনপির অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন। সেসময় গ্রেপ্তার এড়িয়ে দলের নেতা-কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতে কৌশলগত কারণে নিজেকে আড়াল করেন রিজভী। ওই অবস্থান থেকেই তিনি সরকারের পতনের আন্দোলনের ডাক দিয়ে ভিডিওবার্তা দিতে থাকেন। তার এসব ভিডিওবার্তাকে কটাক্ষ করে তৎকালীন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘রিজভী এখন গুহা থেকে প্রেস কনফারেন্স করেন।’
তারও আগে ২০১৮ সালের মে মাসে একটি অনুষ্ঠানে রিজভীকে ‘আবাসিক নেতা’ বলে কটাক্ষ করেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, “রিজভী সাহেব একজন বিএনপির আবাসিক নেতা, তিনি বিএনপি কার্যালয়ে থাকেন এবং সেখানেই ঘুমান।”
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকার নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড শুরু করলে সরব হন রিজভী। এজন্য অভ্যুত্থানের প্রথম ভাগেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে অবশ্য অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটলে রিজভী কারামুক্ত হন।
‘ঢাল হয়ে নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন’
কেন্দ্রীয় মহিলা দলের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক এলিজা শারমিন মুন্নি বলেন, রুহুল কবির রিজভী ভাই সেই অত্যন্ত দুঃসময়ে দলের ঝান্ডা হয়ে দলের পাশে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর ওনার জীবনের কঠিন সময়গুলোতে পরিবার-পরিজন ছেড়ে পার্টি অফিসে পার করে গেছেন, ঢাল হয়ে নেতাকর্মীদেরকে আগলে রেখেছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, রিজভী ভাই আমাদের সবার রাজনৈতিক জীবনে অনুপ্রেরণা। আমরা ওনাকে আমাদের আইডল মনে করি। উনি আমাদের যে দুঃসময়ে সাহস দিয়েছেন, রাজপথের জন্য সহযোগিতা করেছেন। এটা বিএনপি এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা সারাজীবন মনে রাখবেন। দল তাকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করবে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করবেন—এটা আমরা প্রত্যাশা করি।
বিএনপি সূত্র মতে, দলীয় কাঠামোয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে রিজভীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মহাসচিবের অনুপস্থিতি বা ব্যস্ততার সময় দলীয় অবস্থান তুলে ধরা, রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাস্তবে অনেক সময় তিনি বিএনপির দৈনন্দিন রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণের দায়িত্বও পালন করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যে, দলের ভেতরে তাকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইতিবাচক। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ‘দুঃসময়ের নেতা’—যিনি দল ছাড়েননি, লুকিয়ে থাকেননি এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয় সচল রাখতে ভূমিকা রেখেছেন। সহজপ্রাপ্যতা এবং ধারাবাহিক উপস্থিতি তাকে কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি অতিরিক্ত মিডিয়াকেন্দ্রিক এবং বক্তব্যে কখনো কখনো কৌশলগত ভারসাম্য থাকে না। তবু এসব সমালোচনা তার অবস্থানকে খুব একটা দুর্বল করতে পারেনি।
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে। বিএনপির নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক চাপে যখন দলকে পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়েছে, তখন তিনি ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশে থেকেছেন।
রিজভীর এই জীবনচিত্র একদিকে যেমন ত্যাগের গল্প বলে, তেমনি অন্যদিকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতাও সামনে আনে। যেখানে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দলীয় দায়িত্ব বড় হয়ে ওঠে, আর একটি সাধারণ খাট হয়ে যায় সংগ্রাম, ক্লান্তি এবং অবিচল থাকার প্রতীক।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল বাংলানিউজকে বলেন, দলের দুর্দিনে, দুঃসময়ে যখন সামনের সারিতে কাউকে পাওয়া যেত না, ঠিক সে সময় দলে হাল ধরেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভাই। যখন নেতাকর্মীরা মাঠে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে পারেনি, তখন তিনি একা হলেও রাজপথে নেমেছেন। হরতাল-অবরোধের সময় বিএনপির পল্টন অফিসের সামনে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো চেয়ারে বসে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, কথা বলতেন। আমরা প্রত্যাশা করি, দল তাকে আরও বেশি মূল্যায়ন করবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক কর্মী বলেন, রিজভী ভাই শুধু রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি একজন কর্মী তৈরির কারিগর। তার কাছ থেকে রাজনীতি শেখা যায়। শেখা যায়, কীভাবে পরিবার-পরিজনকে প্রাধান্য না দিয়ে মাসের পর মাস পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলকে আগলে রাখা যায়। যদি বলি, এটাই ছিল তার ফার্স্ট হোম এবং তার পরিবার ছিল তার সেকেন্ড হোম।
কৃষকদলের নেতা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা জানি, যেকোনো সমস্যায় নয়াপল্টনে গেলে ভাইকে পাওয়া যাবে। ওনার দরজা সবসময় আমাদের জন্য খোলা। মামলা-হামলায় কোথাও আশ্রয় না পেলে তার কাছে ছুটে যেতাম। তার জীবনটা দেখে মনে হয়—রাজনীতি শুধু বক্তৃতা নয়, এটা আসলে ত্যাগের ব্যাপার।
রাজপথ, নয়াপল্টন, সংবাদ সম্মেলন, গ্রেপ্তার, কারাগার এবং দলীয় আনুগত্য—এই কয়েকটি শব্দেই সংক্ষেপে ধরা যায় তার রাজনৈতিক জীবন। তিনি হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয় জননেতা নন, কিন্তু বিএনপির কঠিন সময়ের এক নির্ভরযোগ্য, দৃশ্যমান এবং সংগ্রামী মুখ হিসেবে তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, রিজভীর মতো নেতারা দলীয় কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা দৃশ্যমান থাকেন এবং সংকটের সময় সংগঠনকে সচল রাখেন। তাদের সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে উচ্চ পদে বসানো উচিত।