Image description

পায়ে ১০টি সেলাই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল বিশ্রামের। কিন্তু দুই দিন যেতে না যেতেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওষুধের দোকানে ছুটছেন তিনি। সেলাই এখনো কাটা হয়নি, ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে পা—তবুও মুখে এক চিলতে মলিন হাসি ধরে রাখতে হচ্ছে।

কারণ, এই হাসি না থাকলে অর্ডার মেলে না, আর অর্ডার না মিললে পূরণ হয় না মাসের টার্গেট। আর টার্গেট পূরণ না হওয়া মানেই মাস শেষে বেতন কাটা আর সংসারে টানাপোড়েন।

​এটি কেবল কুড়িগ্রামের কোনো একজন মাঠকর্মীর বিচ্ছিন্ন গল্প নয়, বরং দেশের ওষুধ কম্পানিগুলোতে কর্মরত লাখো মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রতিদিনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। পড়াশোনা শেষ করে এই পেশায় এসে এক অন্তহীন চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছেন তারা।

​একজন মাঠকর্মী জানান, সকাল আটটায় যখন তিনি বাসা থেকে বের হন, তখন তার সন্তান ঘুমিয়ে থাকে। সারাদিন হাসপাতাল, ক্লিনিক আর ফার্মেসিতে ঘুরে যখন রাতে ফেরেন, তখনও দেখেন সন্তান গভীর ঘুমে। অনেক সময় দোকানের ভিড় না কমলে দোকানদার অর্ডার দিতে চান না, তাই দোকান বন্ধ হওয়া পর্যন্ত তাদের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে পরিবারের সঙ্গে কাটানোর মতো ন্যূনতম সময়টুকুও পান না তারা।

​অফিশিয়ালি মাসে মাত্র দুই দিন ছুটির কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা পাওয়া ভার। অনেক কম্পানিতে ঈদের সময়ও ছুটি মেলে না। একদিন মাঠে না গেলেই পিছিয়ে পড়তে হয় টার্গেটে। আর সেই ঘাটতি মেটাতে অনেক সময় নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ওষুধ কিনে টার্গেট মেলাতে হয় তাদের, যাতে মাস শেষে মূল বেতনটা অন্তত ঠিক থাকে। ক্যামেরার সামনে অনেকে এসব বলতে ভয় পেলেও আড়ালে এটিই এই খাতের ওপেন সিক্রেট।

​মাস্টার্স পাস করা একজন যুবক যখন একজন স্বল্পশিক্ষিত দোকানদারের ধমক বা অবজ্ঞা মুখ বুজে সহ্য করেন, তখন সেখানে মানবিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এনজিওকর্মী মাহমুদা খাতুন জানান, ওষুধের দোকানদাররা অনেক সময় এসএসসি বা ইন্টার পাস হন, কিন্তু আমাদের রিপ্রেজেন্টেটিভ ভাইয়েরা অনার্স-মাস্টার্স পাস হয়েও তাদের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন সম্মানের আশায়। 

ওষুধের দোকানদার রাকিবুল ইসলামও স্বীকার করেন, টার্গেট পূরণের জন্য এই কর্মীরা অনেক সময় অনেক আকুতি-মিনতি করেন।

​টার্গেটের চাপ, অনিশ্চিত কর্মঘণ্টা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা আর প্রতিদিনের নীরব অপমান—সব মিলিয়ে এক অদেখা সংগ্রামের নাম মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। দেশের লাখো শিক্ষিত যুবকের এই আর্তনাদ কোনো পরিসংখ্যানে ওঠে না। তাদের এই লড়াইকে সম্মান জানানোই হোক আমাদের মানবিকতার প্রথম ধাপ।