রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গায় কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাটের চলতি বছর সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছর এই হাটের মূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ফলে এবার প্রায় এক কোটি টাকা কমে দর নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাতা-কলমে এ হাটের সীমানা দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশ থেকে শুরু করে সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এবার এটি মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা নিয়ে নির্ধারণ করে গত ৩০ এপ্রিল হাটের ইজারার দর উন্মুক্ত করা হয়।
তবে সরকারি মূল্য কমলেও হাটটির প্রতিযোগিতা হয়েছে সর্বোচ্চ। চারটি দরপত্রের মধ্যে তিনটিতে চার কোটি টাকার বেশি দর এসেছে, আরেকটির দর না এলেও সর্বোচ্চ পে-অর্ডার জমা দিয়েছেন। শুধু এ হাটেরই এমন চিত্র নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের একই চিত্র দেখা গেছে।
বিগত ১৭ বছর রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের হাতে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর ডিএসসিসির অস্থায়ী পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ মূলত বিএনপি নেতাদের হাতে থাকলেও এবার দৃশ্যপট বদলেছে।
হাটের নাম পরিবর্তন করে খাতা-কলমে জায়গা কমিয়ে সরকারি মূল্য কমালেও এ বছর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতারা অংশ নেওয়ায় হাটের দরে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এসব হাটের মধ্যে শুধু দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই পড়েনি, আরেকটি হাটে গত বছরের ধারাবাহিকতায় সরকারি মূল্যের চেয়েও কম দর পড়েছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে ও সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা নামে হাটটি স্থানীয় বিএনপির নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক ইজারা নেন। তবে এ কার্যক্রমের পেছনে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক নেতা নবীউল্লাহ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক কাউন্সিলর জুম্মন। এ বছরও তারেক দরপত্রের জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনো দর উল্লেখ করেননি।
অন্যদিকে এবার স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান কে বি ট্রেড সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়েছে। সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ দর উন্মুক্ত করার সময় এ হাটটি চূড়ান্ত না করে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে সম্পত্তি বিভাগ সর্বোচ্চ পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে দর জানাতে চিঠি দেবে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগে যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এবং শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন জায়গা নামে হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে আসেন শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ দলের নেতাকর্মীরা।
এ সময় শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিমেল, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ডিএসসিসির সব আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দরপত্র বিক্রি নিশ্চিত করে সংস্থাটি। এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়।
ডিএসসিসির হাটের ইজারায় অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াত নেতা শামীম খানকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা ভালো বলতে পারবেন। কেন্দ্রের নির্দেশনায় এ বছর হাটের ইজারায় অংশ নিয়েছি।’
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানান, এ বছর ঢাকার দুটি নির্বাচনি এলাকার পশুর হাটসহ বিভিন্ন পশুর হাটে নেতাকর্মীরা ইজারায় অংশ নেন। আওয়ামী লীগের সময় তারা কোনো ধরনের সরকারি দরপত্রের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর তারা অংশ না নিলেও এ বছর ডিএসসিসির হাটে অংশ নিয়েছেন।
ডিএসসিসি সূত্র আরও জানায়, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের নদীর পাড়ের খালি জায়গার পশুর হাটটির এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কাজী মাহবুব মওলা হিমেল হাটটি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সমর্থনে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাটটিতে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর দেন।
রাজধানীর হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ বছর এটির জায়গা কলেজের সামনে থেকে শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এতেই হাটটির ৭৪ লাখ টাকা কমিয়ে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
গণঅভ্যুত্থানের আগের বছর হাটটি হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত ৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। গত বছর মেসার্স সাব্বির এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নাফিজ কবির ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় হাটটির ইজারা নেন। এ বছরও তিনি সরকারি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা নিয়েছেন।
গত বছর উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। চলতি বছর সরকারি মূল্য কমিয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা করা হয়। গত বছর সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সিকদার কনস্ট্রাকশনের আনিসুর রহমান টিপু ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নিলেও একই হাট এবার তিনি ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ইজারা নেন।
আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এ বছর তা কমিয়ে ৫৩ লাখ টাকা করা হয়। গত বছর হাটটি ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন ৫৫ লাখ টাকায় নেন। এ বছর হাটটি তিনি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। এই হাটের দরপত্রেও জামায়াতের নেতারা প্রতিযোগিতা করেছেন।
গত বছর আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) হাটের ইজারা বিজ্ঞপ্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। এ বছর হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তি না দিলেও খালের দক্ষিণ পাড়ের মোয়াজ্জেম মোড়সংলগ্ন গ্রিন বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি জায়গায় ৭০ লাখ টাকার সরকারি মূল্যে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনজন দরদাতার মধ্যে মোহাম্মদ গোলাম হোসেন ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে হাটের ইজারা নিয়েছেন। বাকি দুজনের দরের ব্যবধান ছিল ৫ ও ১০ হাজার টাকা।
গত বছর কমলাপুরে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রতিবছর এই হাট ব্রাদার্স ক্লাব থেকে সাদেক হোসেন কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এবার হাটটির ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার নাম উল্লেখ করা হয়।
শুধু আয়তন কম দেখিয়ে এবার মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা আড়াই গুণ কম। তবে হাটটিতে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি দরপত্র জমা পড়েছে। এ বছর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন নামে স্থানীয় এক নেতা ৩ কোটি ১ লাখ টাকা সর্বোচ্চ মূল্যে হাটের ইজারা পেয়েছেন। আরও দুজনের দর ২ কোটি টাকার বেশি ছিল।
*গোলাপবাগ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।* ছয়টি দরপত্রের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় আহসানউল্লাহ নামে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাটটির ইজারা নিয়েছেন। এই হাটে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা পৃথক ইজারা দর দিয়েছিলেন।
সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের আশপাশের খালি জায়গাসংলগ্ন হাটটির গত বছরের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৬৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮০ টাকা। এ বছর ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে শুধু মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা উল্লেখ করে সরকারি মূল্য করা হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। গত বছর হাটটির প্রথম পর্যায়ে ২ কোটি টাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান ইজারা দর দেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে এনসিপির এক নেতা সরকারি মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্য দিলেও শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের কারণে হাটের ইজারা নিতে পারেননি।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা ধোলাইখাল ট্রাক স্ট্যান্ডের সড়কে হাট না বসানোর জন্য প্রশাসককে একাধিক চিঠি দেন সে সময়। পরে সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কমে হাটটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়। এ বছরও স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান একমাত্র দরদাতা হিসাবে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন। এই হাটটির সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি এবং ওয়ারী থানা বিএনপির নেতারা জড়িত আছেন।
তুষার আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাটের সঙ্গে সবাই জড়িত আছে। একা তো হাটের ইজারা নেওয়া যায় না।’
শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডসংলগ্ন খালি জায়গার এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি।
লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গার পশুর হাটের গত বছর সরকারি মূল্য ছিল ৬৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৭। সে সময় চকবাজার বিএনপি নেতা টিপু সুলতান ৭৪ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন। এ বছর হাটটির সরকারি মূল্য কমে ৬২ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। তবে এখন পর্যন্ত হাটটির কোনো দরপত্র জমা হয়নি।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সংস্থাটির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল হাটের দর কমানোর। তাই হাটের জায়গার নাম বদলে আয়তন কমিয়ে সরকারি মূল্য কমানো হয়েছিল। দরপত্র বিক্রি ও জমাদানেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ হাটে দরদাতারা একাধিক রাজনৈতিক দলের হওয়ায় দরপত্রে প্রতিযোগিতা হয়েছে। ডিএসসিসিরি পশুর হাটে দুই দশক পর এ রকম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।’