ছাত্রদল কর্তৃক ভুয়া স্ক্রিনশট ঘিরে ছাত্রশিবির নেতাকে হেনস্তা ও শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতাদের মারধরের ঘটনায় আবেগী পোস্ট দিয়েছেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, যেদিন গণরুম-গেস্টরুম ফিরবে, সেদিন বুঝবেন কেন জুবায়ের-মোসাদ্দিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই পোস্ট দেন জুবায়ের। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাতে শাহবাগ থানায় ভুয়া স্ক্রিনশটের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে শিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে অবরুদ্ধ করে রাখে ছাত্রদল। পরে তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে বেদম মারধরের শিকার হন এবি জুবায়ের ও ডাকসুর সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ।
‘প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ সম্বোধন করে ফেসবুক পোস্টে এবি জুবায়ের লিখেছেন, শাহবাগ থানায় আমরা কোনো ঝামেলা করতে যাইনি। গিয়েছি আমাদেরই ক্যাম্পাসের এক শিক্ষার্থীর জন্য। যে কিনা একটা মিথ্যা ফটোকার্ডের ভিক্টিম হয়ে হত্যার হুমকি পেয়ে থানায় গিয়েছিল জিডি করতে। সেখানে তাকেসহ তার সাথের কিছু শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ঝামেলা করে ছাত্রদল। সূর্যসেন হল সংসদের সদস্য ছোটভাই আলভিকে বেধড়ক মারধর করে।
তিনি লিখেছেন, আমরা ডাকসুর প্রতিনিধি। শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধায় আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্বের জায়গা থেকেই আরো কয়েকজন ডাকসুর সম্পাদকসহ আমরা থানায় যাই প্রশাসনের সাথে কথা বলে সমস্যা সমাধান করার জন্য। ওই ছেলে আসলেই অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর না হলে ছেড়ে দেওয়া হোক। এই সমাধানের চিন্তা নিয়ে থানায় গিয়েছি। না গেলে হয়তো আপনারাই বলতেন ডাকসু কী করে! বাকিটা দেখলেনই। থানায় ঢুকতেই কোনোধরনের কথাবার্তা, উস্কানি ছাড়াই হামলে পড়ে আমাদের ওপরে। বৃষ্টির মত কিল, ঘুসি, লাত্থি... যে যেভাবে পেরেছে! অথচ আমি জানিই না কেন আমাকে মারা হচ্ছে!!
এবি জুবায়ের লিখেছেন, যাইহোক, এই ঘটনা নিয়ে গ্রুপে লেখালেখি হলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু শিক্ষার্থী দেখলাম মারধরকে এপ্রিশিয়েট করছে! মকারি করছে আমাদের নিয়ে। আমার চশমা কুকুরকে পরিয়ে মজা নিচ্ছে। কমেন্ট সেকশনে বাহবা দিচ্ছে আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা!
প্রিয় ভাইবোনেরা, যারা আমাদেরকে মারধর করাটা সমর্থন করছেন, আপনারা যদি দলান্ধ হোন তাহলে কিছু বলতে চাই না— লিখেছেন তিনি। যোগ করেন— কিন্তু যদি বিবেকবান দাবি করেন তাহলে শুনে রাখেন, জুবায়ের-মুসাদ্দিকে তাদের নিজেদের কোনো স্বার্থে সেখানে যায়নি। চাইলে ওই শিক্ষার্থীর বিপদে চোখ বন্ধ করে স্কিপ করে যেতে পারত। কিন্তু করে নাই, জীবনের ঝুকি নিয়েও ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রদল সন্ত্রাসীদের মধ্যে গিয়েছে তার ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের সাথে হওয়া অন্যায়ের সুরাহা করতে। জুবায়ের-মুসাদ্দিকের এই লড়াইটা আজকের না। হাসিনার আমল থেকেই গেস্টরুম, গণরুম, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভোকাল ছিল তারা।
এবি জুবায়ের আরও লিখেছেন, ছাত্রদল সেদিন যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের রাজনীতি প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে তার বিরুদ্ধে জুবায়ের-মুসাদ্দিকের লড়াইটা তাদের নিজেদের স্বার্থে না। তাদের অনার্স শেষের পথে। চুপ করে অন্যায়টা সহ্য করে ভালোয় ভালোয় ক্যাম্পাস ত্যাগ তারাও করতে পারতো। কিন্তু সেই পথ তারা বেছে নেয়নি। কেন নেয়নি জানেন?
তিনি লিখেছেন, গতকাল আমাকে যখন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে মারধর করা হচ্ছে, আমি ভীড়ের মধ্যে আমার কিছু কাছের ছোটভাইয়ের মুখ দেখতে পেয়েছি। এমন ছোটভাইরাও ছিল যাদেরকে সেফ করতে গিয়ে একসময় ছাত্রলীগের হাতেও লাঞ্চিত হয়েছিলাম। আমার এমন ছোটভাইরা যাদেরকে নানা সময়ে নানাভাবে সাহায্য করেছি আমি। নিঃস্বার্থ ভাবেই ভালোবাসতাম ছোটভাইগুলোকে। আর সেই ছোটভাইয়েরা গতকাল আমাকে আঘাত করেছে। মার খেয়ে আমি কাঁদি নাই। কিন্তু হামলাকারীদের মধ্যে আমার ছোটভাইগুলোকে দেখে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই।
আমাদের লড়াইটা এই রাজনীতির বিরুদ্ধেই। যেই রাজনীতি এভাবে সিনিয়র জুনিয়রের মধুর সম্পর্কটাকে শত্রুতায় রূপ দেয়। আমাদের লড়াইটা একটা সুন্দর ক্যাম্পাস গঠনের। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নাই।
‘বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ’ উল্লেখ করে ডাকসু নেতা লিখেছেন, সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমার লড়াই আমি চালিয়েই যাব। কিন্তু, আল্লাহ না করুক, যদি আমাদের ক্যাম্পাসটা আবারো কোনোদিন গণরুম, গেস্টরুমের কালচারে ফিরে আসবে সেদিন বুঝবেন কেন এই এবি জুবায়ের-মুসাদ্দিকরা জীবনের ঝুকি নিয়েও কথা বলে গিয়েছে, লড়াই করে গিয়েছে। আল্লাহ সেই দিন না আনুক। বাট আনলে আপনারা এইটা অনুভব করবেন আমি লিখে দিয়ে গেলাম। ভাল থাকুন।