জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতিমধ্যে রাজপথের কর্মসূচি শুরু করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি অন্যান্য সমসাময়িক ইস্যুগুলোও রয়েছে তাদের দাবির মধ্যে। বলা হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে জোরদার করা হবে আন্দোলনের কর্মসূচি। সরকারের এখনো শিশু বয়স অর্থাৎ হানিমুন পিরিয়ড। এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আরও নতুন নতুন ইস্যুতে সোচ্চার হবে বিরোধীদলগুলো। ইস্যু তৈরির জন্য সরকারের ভেতরেই এদের লোকজন নিয়োজিত রয়েছে। বিরোধীদলের আসল টার্গেট হলো, চলতি বছরের শেষের দিকের স্থানীয় নির্বাচন। সেই সময় পর্যন্ত বিএনপি সরকারকে ক্রমান্বয়ে আনপপুলার করা হবে। স্থানীয় নির্বাচন বিএনপির জন্য কঠিন করে তোলা হবে। তখন পর্যন্ত বিএনপির দলীয় কোন্দলও চূড়ান্ত রূপ নেবে। বিএনপির বিদ্রোহীদের নিজেদের দলে ভেড়ানো হবে। বিএনপির প্রার্থীরা জোর করে জিততে গিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে। এগুলোকে ইস্যু করেই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে তারা, এমন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সরকারকে অজনপ্রিয় করার মিশন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এর ফলও দেখা যাচ্ছে। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পা দিচ্ছে সরকার। এর সর্বশেষ সংযোজন হলো ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের কর্মসূচি। টাঙ্গাইলে এ দিনের কর্মসূচির দুটো ঘটনা (ধানের শীর্ষ প্রতীক এবং কৃষক কার্ড বিতরণের) ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। সরকারের ভাবমুর্তি অনেকখানি ম্লান করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বলা যায় নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। এরমধ্যে একটি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে ডিসির তদন্ত প্রতিবেদনের কথা বলে। অন্যটির ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কোনোই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এসব ঘটনার জন্য কারা দায়ী এবং তাদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা, এ তথ্য পাওয়া যায়নি। নিশ্চয়ই সরকার প্রধানকে নয়-ছয় ‘বুঝ’ দেওয়া হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এভাবেই রসাতলে গেছে একের পর এক সরকার।
৬০ পদক্ষেপের প্রশংসা নেই কেন?
বিএনপি সরকারের দুই মাস অর্থাৎ ৬০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে শনিবার ১৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারের তরফ থেকে নেওয়া ৬০ পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরা হয়। কিন্তু সরকারের এইসব পদক্ষেপ নিয়ে কারো তেমন কোনো ইতিবাচক মন্তব্য লক্ষ্য করা গেলো না। যদিও এরমধ্যে কোনো কোনো পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু সরকারের যে দু’একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে, যথাযথভাবে তুলে ধরার অভাবে তাও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। ৬০টি পদক্ষেপের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, খাল খনন প্রভৃতির কথা ক্রমিকের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আমার দৃষ্টিতে এরমধ্যে সবচে’ বড় সাফল্য হলো ২০ নং ক্রমিকের শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি। দীর্ঘকাল পরে এবারই প্রথম দেখলাম, ঈদের আগ মুহূর্তে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে কোনো হইচই হয়নি। জানামতে, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিব ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এ বিষয়টিতে বেশ তৎপর ছিলেন। নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সাফল্যটা পেয়েছে সরকার। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে সাফল্য আসে, এটা তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। কিন্তু এতো বড় একটা সাফল্য প্রচার পায়নি বা তুলে ধরা হয়নি সরকারের তরফ থেকে, এটাই অবাক লেগেছে। ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, কৃষক কার্ড প্রতিটিই অনেক বড় এবং ব্যয় সাপেক্ষ কর্মসূচি। এখনকার প্রেক্ষাপটে খাল খনন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে মানুষের মধ্যে। তাছাড়া এ বিষয়ে সমীক্ষাও এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। সমীক্ষা বা সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এ খাতে একটি টাকাও খরচ করা উচিত হবে না। চার কোটি ফ্যামিলি কার্ড এবং পৌনে তিন কোটি কৃষক কার্ড যথাযথভাবে বিতরণ চাট্টিখানি কথা নয়। কর্মসূচি যথাযথভাবে সম্পন্ন করা না গেলে এ থেকে ইতিবাচকের পরিবর্তে নেতিবাচক ফলাফল আসার আশংকাই বেশি।
দুই দশক পরে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। এই দুই দশক বিরোধীদলে থেকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক কিছু শিখেছে, এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। সরকারের পারফরমেন্স যতটা ভালো আশা করা হয়েছিল এর ধারেকাছেও নেই। সাধারণ মানুষের চেয়ে বিএনপির নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্খীরাই এখন বেশি পরিমাণে হতাশ, অসন্তুষ্ট। সমালোচনা মুখর তারাই বেশি। যদিও তাদের সমালোচনা বাইরে আসছে না। তবে তারা বিরোধীদের সমালোচনায়ও এখন তেমন একটা কাউন্টার দিচ্ছেন না। এটাই বিএনপির জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনে। বিএনপির প্রতি এদেশের বেশিরভাগ মানুষের ভালোবাসা আছে এবং সে কারণেই দেশি-বিদেশি এতো চক্রান্তের পরও ‘মাইনাস’ করা সম্ভব হয়নি দলটিকে। মানুষ চায়, বিএনপি সরকার ভালোভাবে চলুক, প্রত্যাশা পূরণ করুক। ভালোবাসা থেকে কিন্তু অভিমান-ঘৃণা-প্রতিহিংসারও জন্ম নেয়। আমার মনে হয়, এখন অভিমানের পর্ব চলছে। তা নাহলে সরকারের এতোগুলো ভালো কাজ নিয়ে প্রশংসাসূচক মাতামাতি লক্ষ্য করা গেলো না কেন, কর্মী-সমর্থকের মধ্যেও?
গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ৬০ দিনের পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দুই মাসের কার্যক্রমে বিএনপি সরকারের ওপর জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকারের দাবি আর বাস্তবতার মধ্যে মিল থাকে না অনেক ক্ষেত্রেই। আমি একান্তভাবেই চাই, বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক। সরকারের দাবি সত্য হোক।
পেশাগত ছাড়াও অভ্যাসগত কারণে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মিশি এই বয়সেও। সরকারি অফিসের পিওন থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করি। সরাসরি বা ঘনিষ্ঠভাবে না মিশলে মানুষের মনের কথা জানা সম্ভব হয় না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া যায় তাতে। এটা জানা কথা, ফ্যামিলি কার্ড-এর আদলে দেশে ইতিপূর্বে ভিজিএফ কার্ডের প্রচলন ছিল। কিন্তু তাতে অতীতের সরকারগুলোর এ বাবদ একটি ভোটও বেড়েছে কি? সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করে থাকেন- শুধুমাত্র ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড প্রভৃতির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যাবে, তাহলে এটা ভুল। সরকারকে ভুল পথেই নিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। এসবের মাধ্যমে বর্তমান জনপ্রিয়তাও ধরে রাখা যাবে না। মানুষ চায়- সুশাসন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক সরকার। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটা বোঝেন বলে মনে হয় না। তা নাহলে এভাবে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পা দিতো না।
সরকার গঠনের শুরু থেকেই একের পর এক যেসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
নতুন বিএনপি সরকারের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে হতবাক হয়েছে মানুষ একেবারে শুরু থেকেই। আসা যাক, সরকার গঠনের প্রথম দিনের ঘটনাবলীতে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি। কিন্তু দেখা গেলো, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় একেবারে খোলা আকাশের নিচে শপথ অনুষ্ঠানের আসন পাতা হয়েছে। প্রখর রোদের মধ্যে দুপুর থেকে লোকজন বসে থেকে ঘেমে উঠছিল। পানির তৃষ্ণা মেটাতে হাতের কাছে পানি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি মেহমান, বিশেষ করে নারী এবং বয়স্কদের ওপর অনেক ধকল গেছে এদিন। এই শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর বিএনপি মাইনাস এবং জামায়াতকে ক্ষমতায় আসার মিশনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বিতর্ক এবং হতাশা তৈরি হয়েছে বলা যায় সরকার গঠনের আগের দিন থেকেই, যখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে নাসিমুল গণিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও নিয়োগটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাত দিয়েই হয়েছে কিন্তু এতে বিএনপির সায় আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। কারণ, তখন পর্যন্ত শপথ না নিলেও বিএনপি-ই ক্ষমতায় এটা সবাই বুঝেন। বিএনপি সরকারের নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে ড. নাসিমুল গণিকে কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না। বাংলাদেশ সচিবালয়সহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়োগ ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়, নাসিমুল গণির এ নিয়োগ সাময়িক সময়ের জন্য। সরকার গঠনের পর নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ হবে। সরকার গঠন এবং মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন নিয়েও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। দেখা যায়, ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় ৪১ জনই নতুন মুখ। এবং এদের অধিকাংশকে সাধারণ মানুষ এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীরাও অনেকে চেনেন না। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের পাশে পেয়েছেন, একসঙ্গে জেল-জুলুম খেটেছেন এদের অধিকাংশই বাদ পড়েছেন মন্ত্রিসভা থেকে। এরপরে মন্ত্রিদের পোর্টফোলিও নির্ধারণে দেখা গেলো আরেক তুঘলকী কাণ্ড। মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী অনেককেই একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যার ফল এখন পর্যন্ত ভূগতে হচ্ছে। অধিকাংশ মন্ত্রণালয়েই কাজকর্মে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞমহল বলছেন, ক্ষণস্থায়ী অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতিত এভাবে পোর্টফোলিও নির্ধারণের নজির অতীতে নেই।
সরকার গঠনের দিন অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ঘটলো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে আরেক লঙ্কাকাণ্ড। যুগ্মসচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘মাইনাস বিএনপি’ সিন্ডিকেটে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন, তাকে দেখা গেলো এ দিন শপথ অনুষ্ঠানের পরে জাতীয় সংসদ ভবনস্থ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে অবস্থান নিতে। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্যরা খোঁজ-খবর নিতে শুরু করলেন। কারণ, বিতর্কিত এই ফরিদীকে প্রধানমন্ত্রীর পিএস পদে নিয়োগের জোর তদবির চলছে। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে ফরিদী সম্পর্কে ‘গুপ্ত’ এবং অতীত কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক তথ্য বেরিয়ে এলো। সেই অনুযায়ী প্রতিবেদনও দেওয়া হলো। কিন্তু তারপরও ফরিদী পিএস পদে নিয়োগ পেলেন সবাইকে অবাক করে দিয়ে। শুধু গোয়েন্দা তথ্যই নয়, অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য এই ফরিদী প্রশাসনে ইতিমধ্যে ‘কুখ্যাত’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অথচ সেই ফরিদীই এখন এই বিএনপি সরকারের সর্বেসর্বা। শুধু তিনি নিজেই নন, ওই রাতেই নিজের আরও কয়েকজন অনুসারীকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়নের ব্যবস্থা করেছেন। আর ওই দিনই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব হিসেবে নিয়োগ পেলেন অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে ‘চাঁদাবাজ’ ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বহুল আলোচিত সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। সরকারের প্রথম দিনের এই নিয়োগগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত ব্যাপক অস্বস্তি রয়েছে। এখনকার সরকার ও প্রশাসনের বিশৃঙ্খলার মূল কারণ এরাই। অবশ্য, এরসঙ্গে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারমধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীও আছেন। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের ইস্যুতে এই চক্রটির অপকর্ম হাতেনাতে ধরাও পড়েছে ইতিমধ্যে। তারপরও তাদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বা নেয়া যায়নি।
এই চক্রটির সর্বশেষ অপকর্ম হলো, সচিব জাকারিয়াকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদ থেকে নৌপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ। জাকারিয়া সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে কী ধরনের মন্তব্য আছে, আমার জানা নেই। তবে তিনি এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তো দূরের কথা, আদৌ সচিব হওয়ার যোগ্য কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ তার সহকর্মীদেরই। জাকারিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে গত ২৭ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে “প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করা সেই জাকারিয়া পেলেন পদোন্নতি” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শুধু এই প্রতিবেদনই নয়; জাকারিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড ভালোভাবে খোঁজা হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ইতিপূর্বে সিলেটে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক পদে থাকাকালের তথ্য খুঁজে দেখা যেতে পারে। তিনি কী রকমের বঙ্গবন্ধু প্রেমিক ছিলেন, এর প্রমাণ রয়েছে তাতে।
জাকারিয়া কীভাবে সচিব পদে নিয়োগ পেলেন এবং কয়েক দিনের মাথায় এখন কেন আবার তাকে পরিকল্পনা কমিশন থেকে নৌপরিবহনে আনা হলো, এ সম্পর্কে খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো, ভয়াবহ রকমের তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই পদ নাকি বিশাল অংকের টাকায় কিনে নিয়েছে একটি মাফিয়া গোষ্ঠী। জাকারিয়াকে এই পদায়নে তারা অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তাকে কেনা হয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জন্য। সেখানে পদায়নও হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী গ্রহণ না করায় তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে রাখা হয়। মাফিয়া গোষ্ঠীর চাহিদামতো এখন তাকে নৌপরিবহনে দেওয়া হলো।
স্বাভাবিক রীতিতে এ সরকারের আমলে জাকারিয়া অন্ততঃ সচিব হতে পারতেন না। সচিব হতে পেরেছেন এতেই তিনি খুশি। জাকারিয়ার নিজের জন্য এখন আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। মাফিয়ারা যেভাবে চাইবে সেভাবেই সবকিছু করবেন। নৌপরিবহন একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত। আওয়ামী লীগ আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে এ খাত থেকে। একই লুটেরা গোষ্ঠী বিএনপি সরকারের আলোচিত এই সিন্ডিকেটের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। এতে একদিকে আওয়ামী লীগের লুটপাটের খতিয়ান ধামাচাপা পড়ে যাওয়া এবং পাশাপাশি নতুন লুটপাটেরও আশংকা তৈরি হয়েছে।
জাকারিয়াকে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল গত ২৫ মার্চ। ওই দিন মোট ১২টি সচিব পদে পরিবর্তন হয়। তারমধ্যে ৯ জনকে নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ৯ সচিবের ২ জন বাদে অন্য সবার ব্যাপারেই বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্য থেকে এস এম এবাদুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ইতিমধ্যেই বিতর্কের কারণে বাতিল করা হয়েছে। নতুন বিমান সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া, ইকোনমিক ক্যাডারের সদস্য ফাহমিদা আখতারকে নিতে চাইছিলেন না বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পিএস ফরিদীর ইচ্ছায় ফাহমিদার যোগদানপত্র গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন। বিমান মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু সচিব নয়, ডিসিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো এভাবে নিয়োগ হচ্ছে। এমনকি মন্ত্রীত্ব পদ যারা পেয়েছেন এদেরও অধিকাংশেরই ভাগ্য নির্ভর করছেন এই সিন্ডিকেটের মর্জির ওপর। শীর্ষকাগজের বিগত সংখ্যার প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই দুই মাসের বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডে আরও যেসব বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাবেক গভর্নরের পদত্যাগ এবং নতুন গভর্নর নিয়োগ। সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মব তৈরির মাধ্যমে কেন? তিনি অপরাধ করে থাকলে নিয়মের মধ্যে হাজারটা ব্যবস্থা নেয়া যেতো তার বিরুদ্ধে। সেই পথে না গিয়ে মব তৈরি করা হলো। নতুন গভর্নর হিসেবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হলো তাকে নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হলো। একজন ঋণ খেলাপী ব্যবসায়ীকে কেন গভর্নর পদে নিয়োগ দিতে হবে? বিএনপির হাতে কী আর কোনো যোগ্য লোক নেই? মব তৈরির জন্য নেপথ্যে থেকে প্রধানতঃ দায়ী যিনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী এই সচিবেরই দায়িত্ব ছিল গভর্নর পদে পরিবর্তনের কাজটি সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সরকারকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু তিনি তা করেননি। অবাক ব্যাপার হলো, গত সপ্তায় এই নাজমা মোবারকের বদলি স্থগিত করে তাকে পুনরায় একই পদে রেখে দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি ফ্যাসিস্টের দোসর, কুখ্যাত গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকাদারের বান্ধবী এবং ব্যাংকিং খাতের মাফিয়া চক্রের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত।
ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে আরেকটি বড় ঘটনা হলো, গত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ পাস। এই আইন আর্থিক খাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরো শক্তিশালী করবে এবং এর ফল আদৌ ভালো হবে না, বলছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা। বলা হচ্ছে, এস আলমদের মতো ব্যাংক লুটেরাদের নতুন করে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এভাবে আইনটি পাস করা হয়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শুধু শেখ হাসিনা একা নয়, তার দোসরদের লাগামহীন অপকর্মও মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। এদের পতন দেখতে চেয়েছে মানুষ। জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমেছে। আর সেই চিহ্নিত দোসররাই যদি পুনর্বাসনের সুযোগ পায় এখন, তাতে মানুষ ক্ষুব্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক। যারা এসব করাচ্ছেন সরকারকে দিয়ে এরা সরকারের ভাবমুর্তি বা জনমতের কথা মোটেই বিবেচনা করছেন বলে মনে হচ্ছে না।
গত ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে এর নজির অতীতে দেখা যায়নি। এতে কোনোই শৃঙ্খলা ছিল না। দাওয়াত কার্ড হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ক্ষুব্ধ-হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অনেক মেহমান। সাধারণতঃ প্রতি বছরই সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু কখনো সামান্যতমও বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। বিএনপি সরকারের এক মাসের মাথায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কেন এতো বিশৃঙ্খলা হলো, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে কী? জানা গেছে, এ ব্যাপারে অনভিজ্ঞতার যুক্তি দেখানো হয়েছে। আদতে কী তাই? প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের যোগ্যতাই যাদের নেই তাদের কাছ থেকে কী আর আশা করা যাবে, এ কথা বলছেন অনেকেই।
সরকারের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র!
আদতে সরকারের ভেতর থেকেই গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ‘গুপ্ত’রা ঢুকে পড়েছে শুরুর দিন থেকেই। এরাই এখন গোটা সরকারকে চালাচ্ছে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এ কারণেই সরকার একের পর এক ভুল কাজ করছে এবং ভুল পথে চলছে।
স্যাবোটাজই সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র, এটা কারো অজানা নয়। এই গোটা উপমহাদেশও কীভাবে একটি সাধারণ ব্যবসায়িক কোম্পানির হাতে চলে গিয়েছিল, এ ইতিহাস কারো অজানা নয়। অসম যুদ্ধে দুর্বল প্রতিপক্ষও জয়ী হতে পারে একমাত্র প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। ‘মাইনাস বিএনপি’ এর ষড়যন্ত্র চলে আসছে সেই ওয়ান ইলেভেন বা তারও আগে থেকেই। কিন্তু সফল হয়নি। ষড়যন্ত্রকারীরা বারে বারে ব্যর্থ হয়েছে শহীদ জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা, বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং মানুষের ভালোবাসার কারণে। তাই এবার ভেতর থেকেই কঠিন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। নানাবিধ আলামতেই এর হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র থেকে বিএনপি বের হয়ে আসতে পারবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। কারণ ইতিহাস বলে, কোনো সরকার একবার কোনো সিন্ডিকেটের মধ্যে ঢুকে পড়লে তা থেকে সহজে আর বের হয়ে আসতে পারে না, যতক্ষণ না সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলা হয়। সিন্ডিকেটের মধ্যেই গুপ্ত’রা ঢুকে পড়েছে। তারাই একের পর এক স্যাবোটাজ করছে। তাই অবিলম্বে সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলা ছাড়া এ সরকারের সামনে আর কোনো উপায় দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
(সম্পাদক, শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ)