ফ্যাসিবাদী শাসনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটিয়ে দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।’
সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নবনির্মিত অ্যাডভোকেটস বার সমিতি ভবনের নামফলক উন্মোচন এবং দেশের ৭টি জেলায় যুগান্তকারী ‘ই-বেইল বন্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ বগুড়ার সংসদ সদস্য এবং বিচার বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন যেন আর কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আর এই লক্ষ্য অর্জনে আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই তিন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে তবেই নাগরিকরা তাদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকারের সুফল ভোগ করতে পারবেন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভাগ্যে সুবিচারের পরিবর্তে কেবল বঞ্চনাই জুটবে।’
অতীতের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিচার বিভাগকে দলীয় আদালতে পরিণত করার অপচেষ্টা আমরা দেখেছি। আইনের দোহাই দিয়ে শাসন চললেও তখন দেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের মুক্তিকামী মানুষ সেই অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এখন জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।’’ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, যখন মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে আদালত কোনো হয়রানির জায়গা নয় বরং ন্যায়বিচারের নিরাপদ স্থল, তখনই সমাজ থেকে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা বিচারবহির্ভূত তৎপরতা সমূলে দূরীভূত হবে।
বক্তব্যের মূল আকর্ষণ ছিল ‘ই-বেইল বন্ড’ বা ইলেকট্রনিক জামিননামা পদ্ধতির উদ্বোধন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের এই পদক্ষেপকে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে আইনজীবী, মুহুরি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও পিয়নসহ প্রায় ১৩টি ধাপ অতিক্রম করতে হতো। এই দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে যেমন বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হতেন, তেমনি জামিন জালিয়াতিরও সুযোগ থাকতো। এখন থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া এই সাতটি জেলায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে জামিন আদেশ সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমে কারা প্রশাসনে পৌঁছে যাবে। এর ফলে জামিন পাওয়ার পর একজন ব্যক্তিকে কারামুক্তির জন্য আর দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
প্রযুক্তির এই উন্নয়নকে কেবল শুরু উল্লেখ করে তারেক রহমান জানান, ভবিষ্যতে এই ই-বেইল বন্ড সিস্টেমকে পুলিশের সিডিএমএস (CDMS), আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ন্যাশনাল আইডি কার্ড ভেরিফিকেশনের সাথে যুক্ত করা হবে। এর ফলে গায়েবি মামলা, ভুয়া ওয়ারেন্ট এবং ওয়ারেন্ট রিকল না হওয়ার অজুহাতে অতীতে ভিন্নমতের মানুষকে হয়রানি করার যে অপসংস্কৃতি ছিল, তা চিরতরে বন্ধ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আইনের চোখে কোনো তফাৎ থাকবে না।’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আইন মন্ত্রণালয় ও আইটি বিশেষজ্ঞদের ধন্যবাদ জানিয়ে আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা এই আধুনিক প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরুল্লেখ করেন যে, ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার। আজকের এই ডিজিটাল উদ্যোগ সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বাংলাদেশকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।