Image description

নারীর ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সংরক্ষিত এই নারী সংসদ-সদস্যদের ক্ষমতায়ন কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে; পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ভূমিকা কতখানি কার্যকর তা নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় না বলেই দল যাকে মনোনয়ন দেয়, তিনিই সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। পদ্ধতিগত এই সুযোগ নিয়ে শুধু দলীয় নেতাদের পছন্দ বা পারিবারিক সম্পর্ক বিবেচনায় অনেক সময়ই অযোগ্যদের নির্বাচিত করা হয়। এতে ওই সংসদ-সদস্যরা আইন প্রণয়নসহ রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এমনকি নারী সমাজের স্বার্থবিরোধী কোনো আলোচনায়ও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে তারা কোনো কথা বলেন না। বিশ্লেষকরা আরও বলেন, বিগত কয়েকটি সংসদে এমন কয়েকজন নারী সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, যারা লিখিত বক্তব্য দেখেও পড়তে পারেননি। এতে তাদের পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হলেও সাধারণ মানুষের উপকারে আসেনি। তাই জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি মহিলা আসনে যোগ্য নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ আরও কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পদ্ধতিতে সংস্কার এনে সরাসরি ভোট আয়োজনের দাবি জানান তারা।

সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনীতিতে তাদের অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যেই মূলত জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন। কিন্তু ওই উদ্দেশ্যে নারীদের মনোনয়ন না দিয়ে দলীয় নেতাদের পছন্দ বা পরিবারের সদস্যদের নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের অনেকেরই সংসদ-সদস্য হিসাবে যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেই যোগ্যতা ছিল না। অনেকেই সংসদে দাঁড়িয়ে লিখিত বক্তব্যও পড়তে পারেননি। আবার কারও কারও গান গেয়ে, কবিতা-ছড়া আবৃত্তি করা ছাড়া দৃশ্যমান তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। তাদের এ কার্যক্রমে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হলেও সাধারণ মানুষের কাজে আসেনি। তিনি বলেন, মেধাবী, যোগ্য এবং রাজনীতিতে অবদান রাখা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন, এমন নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হলে তারা দেশের জন্য অবদান রাখতে পারবেন। দলগুলোকে সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, একটা সময়ে নারীদের এগিয়ে আনার জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, সংসদে তারা নারীদের পক্ষ নিয়ে আলোচনা করেননি। নারীর ওপর সহিংসতার সময়েও তারা চুপ ছিলেন। অপরদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যেসব নারী ভোটে জিতেছেন, তারা বেশি সোচ্চার। জনসাধারণের কাছে তাদের জবাবদিহিতাও বেশি। এই পার্থক্যের কারণ হচ্ছে, নারীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী নির্বাচন ও প্রার্থী বাছাই পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা দরকার।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শনিবার পর্যন্ত ৩৯৬ জন মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের, একজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এবং বাকি ৩৮২ জন বিএনপির নেতাকর্মী। এর মধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ-সদস্যও রয়েছেন। রয়েছেন শিল্পী, মডেল, অভিনেত্রী এমনকি কয়েকজন ব্যবসায়ীও। যদিও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত জোট তাদের চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন আইন ২০০৪ অনুসারে, একটি রাজনৈতিক দলে ছয়জন যদি নির্বাচিত সংসদ-সদস্য হন তবে ওই দল থেকে একজন প্রার্থী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য হবেন। সে হিসাবে বিএনপি ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি ও স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যরা ১টি সংরক্ষিত মহিলা আসন পাবেন। এসব দল ও জোট যদি আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থী মনোনীত করেন এবং তাদের মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ ঘোষিত হলে তারা সংসদ-সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হবেন। তখন আর ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

মূলত নারীদের ক্ষমতায়ন ও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৫টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এই সংখ্যা বাড়ানো হয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় এবং ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে এই আসন সংখ্যা ছিল ৩০টি। অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ এবং নবম সংসদে নারী আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আসন বাড়িয়ে ১০০টিতে উন্নীত করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি ভোটের প্রস্তাব করে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। এমনকি জুলাই সনদেও সংরক্ষিত আসন ১০০টিতে উন্নীত করার বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল।

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের পদ্ধতি চালু করা হলে তুলনামূলক যোগ্যরা সংসদ-সদস্য হতে পারবেন বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী। তিনি বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দেশের আসন সংখ্যা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৪০০টিতে উন্নীত করা এবং ১০০ আসনে নারীদের মধ্যে সরাসরি ভোটের পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ প্রস্তাবের কারণ ছিল, যখন সরাসরি নির্বাচন হবে, তখন দলগুলো যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী দেবে যাতে তারা ভোট পেয়ে জিতে আসতে পারেন। একটা পর্যায়ে তারা পুরুষের সঙ্গেও সরাসরি নির্বাচন করার মতো যোগ্যতা অর্জন করবেন। সাবেক এ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিদ্যমান পদ্ধতিতে ভোটের বিধান না থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে মনোনীত করেন। এক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতি করা অনেকেই বঞ্চিত হন।