মাত্র ১৫ মাস ছিলেন দায়িত্বে, এটুকু সময়ের মধ্যে কয়েক কোটি টাকার ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারি বিল প্রদান, টিআর, কাবিখা, কাবিটার বরাদ্দ আর পৌর প্রশাসক হিসাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও কাল্পনিক প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি করার অভিযোগও রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তার ঘুস ও কমিশন বাণিজ্যের কথা বাকেরগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি রুমানা আফরোজ। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছোটখাটো ভুলত্রুটি হলেও কোনো রকম অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন তিনি।
গত বছরের শুরুর দিকে বাকেরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা পদে যোগ দেন রুমানা। একই সঙ্গে বাকেরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বও পান তিনি। গুরুত্বপূর্ণ দুটি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে উঠতে শুরু করে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ। বিশেষ করে সরকারি বরাদ্দের বণ্টন, উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজের বিল প্রদান এবং টিআর-কাবিখাসহ লেনদেনের প্রায় সব খাতে শুরু হয় পার্সেন্টেজ আদায়। টাকা তুলতেন তারই দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা।
উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২৪-২৫ ও ২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মোট ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় বাকেরগঞ্জ। এসব প্রকল্পের কাজ শেষে বিল তুলতে গিয়ে ১২ পার্সেন্ট হারে ঘুস দিতে হয় ইউএনও রুমানা আফরোজের নামে। উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের মাধ্যমে আদায় হয় এই টাকা। ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের আওতায় বিভিন্ন এলাকায় ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রেও একইভাবে শতকরা ৫ ভাগ টাকা নেওয়া হয় তার নামে। ইউএনও’র হয়ে এই টাকা তুলত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা পিআইও অফিস। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ আসা ৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে শতকরা ২ ভাগ এবং এলজিইডির আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণের আওতায় আরও ২ পার্সেন্ট টাকা আদায় হতো রুমানা আফরোজের নামে।
এভাবে বাঁধা রেটে পার্সেন্টেজ আদায়ের বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করেছেন ঠিকাদারসহ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিরা। কবাই ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের স্বামী যুগান্তরকে বলেন, প্রথম ধাপের কাবিখা প্রকল্পের এক লাখ ২৫ হাজার টাকা তুলতে ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা ঘুস দিতে হয়েছে। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রেও একই হারে টাকা নিত ইউএনও অফিস। রঙ্গশ্রী, চরাদী ও কলসকাঠিসহ আরও কয়েকটি ইউনিয়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে থাকা কয়েকজন ইউপি মেম্বার বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট সব উন্নয়ন প্রকল্পেই বিলের ১২ শতাংশ হারে টাকা ঘুস দিতে হয়েছে আমাদের। ইউএনওর নামে এই টাকা নেয়া হতো।’ উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার জাকির হোসেন তালুকদার বলেন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে বিলের ৫ পার্সেন্ট এবং বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পে ২ পার্সেন্ট হারে ঘুস দিতে হয়েছে। এমনকি ঠিকাদারি কাজের বিপরীতে থাকা জামানতের টাকা ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘুস নিয়েছে ইউএনও অফিস।
আরও নানাভাবে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ইউএনও রুমানার বিরুদ্ধে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫টি এতিমখানার নামে ১৫ টন জিআর চাল বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। অথচ এসব এতিমখানার বেশির ভাগের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, যোগসাজশের মাধ্যমে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ওই চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে আসা বরাদ্দ থেকে ১০ লাখ টাকা তিনি ব্যয় দেখিয়েছেন সড়ক সংস্কার, ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত ও ড্রেন পরিষ্কারের নামে। অথচ এসব কাজ সম্পন্ন হওয়ার কোনো নজির নেই পৌর এলাকায়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী কেবল ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের বরাদ্দ থেকেই এক বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার ঘুসবাণিজ্য হয়েছে। উপজেলা শহরের ইউএনওর বাসভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় প্রায় দুই বছর আগে। অথচ পরিত্যক্ত এই ভবনে যাওয়ার রাস্তা মেরামতের নামে ছয় লাখ টাকা খরচ দেখান রুমানা। এখানেই শেষ নয়, ভবনটিতে নিজে থাকলেও দায়িত্ব পালনকালে ১৫ মাসে কোনো ভাড়া দেননি তিনি। প্রতি মাসে ১৪ হাজার টাকা হিসাবে এভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে দুই লক্ষাধিক টাকা। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে উপজেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সরকারিভাবে যেহেতু ভবনটি পরিত্যক্ত তাই এখানে থাকলেও ভাড়া দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। সেই সুযোগই নিয়েছেন তিনি।
পৌরসভার প্রশাসক হিসাবেও অনিয়ম দুর্নীতি আর ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে সাবেক ইউএনওর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানান, শতকরা ৫ ভাগ হারে ঘুস না দিলে বিল পাওয়া যেত না। জামানতের টাকা তুলতেও ৫ শতাংশ ঘুস দিতে হয়েছে। পৌর এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ যেমন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থাকা সরকারি কলেজ সড়ক সংস্কার, বাজার এলাকায় কাঁচাবাজার সড়ক নির্মাণ এবং সৌন্দর্য বর্ধনের নামে পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক এক প্রকৌশলী বলেন, পৌরসভার যেকোনো ঠিকাদারি কাজে ২ শতাংশ হারে ঘুস দিতে হতো এবং বাসাবাড়ির নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করা হতো নির্ধারিত হারে পার্সেন্টেজ আদায়ে। পৌরসভার প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, এক বছর তিন মাসে পৌরসভায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের প্রকল্প গ্রহণ ও কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বিল পরিশোধে ঘুস বাবদ আদায় করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বদলি হওয়ার আগে তড়িঘড়ি করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ছয়টি প্যাকেজে এক কোটি ১০ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেন রুমানা আফরোজ। এর মধ্যে পৌর ভবনকেন্দি ক তিনটি প্রকল্পে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অবাস্তব। পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, ‘এসব কাজ অপ্রয়োজনীয় এবং অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে এটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।’
পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের নামে উপজেলার বিভিন্ন ইট ভাটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে রুমানা আফরোজের বিরুদ্ধে। উপজেলায় থাকা একাধিক ইট ভাটার মালিক বলেন, জাতীয় দিবস এলেই ব্রিক ফিল্ড প্রতি ৫/৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হতো ইউএনওকে। না দিলেই চলত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে নানা অজুহাতে লাখ লাখ টাকার জরিমানা আদায়। অথচ জাতীয় দিবস পালনের নামে এভাবে চাঁদা আদায়ের কোনো বিধান নেই। কেবল ইট ভাটা নয়, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও এভাবে চাঁদা তোলা হয়েছে।
ইউএনও হিসাবে বাকেরগঞ্জে যোগদানের পর ২ মাস এসি ল্যান্ডের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন রুমানা আফরোজ। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে প্রায় এক হাজার নামজারির অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। অভিযোগ, প্রতি নামজারিতে তিনি এক হাজার টাকা তার নামে অতিরিক্ত আদায় করিয়েছেন এসি ল্যান্ড অফিস দিয়ে। এভাবেও প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এসব অভিযোগের কোনোটিই অবশ্য স্বীকার করেননি বর্তমানে ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় ইউএনও পদে বদলি হওয়া রুমানা আফরোজ। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার আশায় অনেকেই এসেছেন। তাদের অন্যায় আবদার রাখিনি বলে আমার নামে এসব অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। বাকেরগঞ্জে একই সঙ্গে ইউএনও আর পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছি। অতিরিক্ত কাজের চাপে কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। কিন্তু ঘুস দুর্নীতি আর অনিয়মের যেসব কথা বলা হচ্ছে তা সত্য নয়।