ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে ১২টি আসনে নারী প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
২০ এপ্রিল মনোনয়ন ফরম নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। ১২টি আসনের মধ্যে নয়টি আসনে নিজ দলের নেত্রীদের মনোনয়ন দিচ্ছে জামায়াত। বাকি তিনটির মধ্যে একটি আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন জোটের শরিক দল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান। একটি আসন দেয়া হচ্ছে জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মাকে। এছাড়া আরেকটি আসন ‘উপহার’ দেয়া হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুকে। এনসিপি নেত্রী হলেও তাকে আসনটি দেয়া হচ্ছে জামায়াতের পক্ষ থেকে। অর্থাৎ এটি এনসিপিকে দেয়া আসন নয়; দলটি তাদের নির্ধারিত আসনে আলাদাভাবে প্রার্থী দেবে।
সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে বিতর্কে পারদর্শী ও সংসদে নেতৃত্ব দিতে পারবে এমন নেত্রীদের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মনোনীত প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে নারী শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাবেক জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিতরা। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাবেক নেত্রীরা। জামায়াতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংসদে বিরোধী দলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন, সংসদীয় বিষয়, সংবিধান, আইন, অধ্যাদেশ সম্পর্কে ধারণা আছে এবং বিশেষ করে বিতর্কে পারদর্শী নেত্রীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বুধবার ১২ জনের পক্ষে মনোনয়নপত্র নেয়া হয়েছে। সেখানে একটি পদ পাবেন জোটের অন্যতম সঙ্গী জাগপা চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান, এছাড়া একজন জুলাই শহীদের মাকেও মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। একটি আসন পাচ্ছেন এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু। তিনি এনসিপির নেত্রী হলেও তাকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে জামায়াতের পক্ষ থেকে। এটি জামায়াতের আমিরের ওয়াদা ছিল। এবারের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতাকে বিবেচনা করা হয়েছে। দলীয় নীতিমালার বাইরে কাউকে দেয়া হয়নি।’
জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরায় পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া ছয় বছর বয়সী শিশু জাবির ইব্রাহিমের মাকে একটি আসনে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে।
আগামী ১২ মে সংসদের নারী সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে কমিশন। ৫০টি আসনের মধ্যে সরকারি দল বিএনপি জোট ৩৬টি, স্বতন্ত্র একটি এবং বাকি ১৩টি সিট পাবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দলের ১৩টি সিটের মধ্যে জামায়াত ১২টি এবং এনসিপি একটি আসন পাবে। তবে ১১ দলীয় জোট হিসেবে এনসিপি দুটি আসন দাবি করেছিল। সে সময় তাদের অতিরিক্ত আসন ছেড়ে দেয়া হবে না বলে জানান জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একটি আসনের বেশি চাওয়ার সুযোগ নেই। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা নেবে না, নৈতিক সুযোগও নেই। নিয়ম অনুযায়ী একটিই পাবে। আমরা সংসদে দক্ষ ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন সদস্যদের দেখতে চাই।’
শেষ পর্যন্ত এনসিপিকে দুটি সিট না দিলেও বিশেষ বিবেচনায় এনসিপি নেত্রীকে একটি আসন দিচ্ছে জামায়াত। এ বিষয় জামায়াতের এক নেতা বলেন, ‘এটি এনসিপিকে নয়, বরং জামায়াতের আমিরের কথা রাখতেই ডা. মাহমুদা মিতুকে দেয়া হচ্ছে।’
জানা যায়, বিরোধী দল হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী নির্বাচনের তালিকা শুরু করে জামায়াত। পাশাপাশি জোটসঙ্গী এনসিপিকে তাদের সংসদ সদস্য যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়। প্রাথমিকভাবে জামায়াতের মহিলা বিভাগ থেকে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে ১৩ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয়। তালিকা তৈরিতে দলীয় নীতি অনুসরণ করে জামায়াত। নীতি অনুযায়ী দেখা হয়েছে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞতা। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার দক্ষতা ও সংসদে ভূমিকা রাখতে পারবেন এমন নেত্রীদের। যারা সংসদের আইন-কানুন, অধ্যাদেশ, সংবিধান ও সংসদীয় বিষয়ে বিতর্কে দলের পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারবেন তাদেরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে জামায়াত নেতারা বলছেন বিরোধী দল শুধু বিরোধিতার স্বার্থে সংসদে ভূমিকা রাখবে না। যেহেতু সবাই নতুন সদস্য, তাই আইন-কানুন বিষয়ে জানেন এমন নেত্রীদের জায়গা দিতে চায় জামায়াত। এছাড়া একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে সংসদে পাঠানো হবে না এমন নীতি অনুসরণ করেছে দলটি। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া নেত্রীরাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
দলটির শীর্ষ এক নেতা বলেন, ‘আগামী ২০ এপ্রিল মনোনয়নপত্র নেয়া শেষ হওয়ার আগেরদিন আমরা ১২ জনের পক্ষে নির্বাচন কমিশন থেকে ফরম তুলব এবং তারাই সংসদে যাবেন। এরই মধ্যে জামায়াতের আটজনকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস তৈরি করতে বলা হয়েছে। এ আটজনের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতের মহিলা বিভাগের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক সাবিকুন্নাহার মুন্নী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মারদিয়া মমতাজ, সিলেট অঞ্চলের জামায়াত নেত্রী সাবেক অধ্যাপক মাহফুজা সিদ্দিকা, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মেরিনা সুলতানা, বগুড়া অঞ্চলের প্রতিনিধি ও সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদা সামাদ, জামায়াতের মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম ও সদস্য নাজমুন্নিছা নিলু। বাকি একটি আসনে আলোচনা রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য সাঈদা রুম্মান, জান্নাতুল কারীম, নাজমুন নাহার, শামীমা বেগম। প্রার্থী হিসেবে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া এবং আলোচনায় থাকা নেত্রীদের সবাই বিভিন্ন সময়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীসংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া রয়েছেন জামায়াত নেতাদের স্ত্রীরাও। এর মধ্যে সাবিকুন্নাহার মুন্নী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী, জান্নাতুল কারীম কেন্দ্রীয় নেতা ফখরুদ্দিন মানিকের স্ত্রী। এছাড়া দলের নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আখতার চৌধুরীর কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। এমপির স্ত্রীকে মনোনয়ন না দেয়ার নীতি থাকলেও ছাত্রীসংস্থার সাবেক এ নেত্রীকে প্রয়োজনে যুক্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় পরিষদের এক নেত্রী বলেন, ‘অতীতে নারী নেতৃত্ব থাকলেও জামায়াত সেটি প্রকাশ করেনি। এখন যেহেতু সুযোগ এসেছে সেজন্য প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। জামায়াতের নীতি হচ্ছে একই পরিবারের দুজনকে দায়িত্ব না দেয়া। এখানে যাদের নাম এসেছে সবগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছে। জামায়াতের লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞদের সুযোগ দেয়া হবে। এক কথায় নারীদের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ তৈরি করতে চায় জামায়াত। শুধু সংরক্ষিত আসন নয়, জামায়াত ছায়া মন্ত্রিপরিষদেও নারীদের সুযোগ দেয়া হবে।’
সরকার গঠনের পর সংসদে আইন-অধ্যাদেশ, সংবিধান, সংস্কার ও সংসদীয় রুলসে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বিতর্কে পরাস্ত হতে দেখা গেছে জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের। সে জায়গা থেকে শিক্ষক, আইনজীবী পেশায় নিযুক্ত, শিক্ষিত ও দক্ষ নেত্রীদের নিয়ে আসতে চায় জামায়াত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংসদে জামায়াত আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে চায়। সে জায়গা থেকে সংসদীয় বিষয়গুলোতে পারদর্শী, পড়াশোনা জানা, দক্ষদের তালিকায় রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে সংসদে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয় রিকভার করতে পারবে এমন ব্যক্তিদের আমরা নিয়ে আসব। তালিকাও চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যদের মতো এক সিটের বিনিময়ে শত শত ফরম আমরা বিক্রি করব না। চূড়ান্ত করেই ফরম তোলা হবে। দলীয় কৌশলের কারণে এখনই ১২ জনের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।