বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উপলক্ষে সারা দেশেই উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গায়ই একই দৃশ্য। প্রায় প্রতিটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনটিকে বিশেষভাবে বরণ করা হচ্ছে। নতুন বছর নিয়ে দেশের রাজনীতিবিদরা নানা পরিকল্পনা করেছেন— বিশেষ করে আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান। এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেন, একটি অহিংস বাংলাদেশ দেখতে চান। বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্য কামনা করেন তারা। এছাড়া সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বৈষমহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা নেতাদের।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নতুন বছর আসে, পুরোনো চলে যায়। তবে এতেই দিনের গুরুত্ব কমে যায় না। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কারণ গেল বছরের শেষটা আমাদের ভালো যায়নি। সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন থেকেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। অধ্যাদেশগুলো পাস হচ্ছে না। চব্বিশের জুলাইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্যটা আর নেই। তাই নতুন বছরে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বদলে ইতিবাচক ধারাকে উৎসাহিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে হবে।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ- সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে দিনটি নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে নানা আয়োজন থাকে। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নতুন বছরে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে চাই। আমাদের গণতন্ত্র বহুদিন ধরেই নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তখন পহেলা বৈশাখে তো এ নিয়ে বড় প্রত্যাশা থাকবেই। আশা করি, নতুন বছরে আমাদের গণতন্ত্র আরও সুসংহত হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, প্রথমে সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই। যেকোনও নতুন বিষয়ে মানুষের আগ্রহ থাকে বেশি। নতুন বছরে আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত বাংলাদেশের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদের অনেক কিছুই বাতিল করেছে— যা মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারের এখনও গণরায়কে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ আছে। নতুন বছরে সরকার সবাইকে নিয়ে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে সেই প্রত্যাশা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নতুন বছরে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, একটি ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরেছে। তবে সেই রক্ত সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় যাওয়া সরকার গণভোটের রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে— যা শহীদদের প্রতি অবজ্ঞার শামিল। নতুন বছরে জুলাইয়ের চেতনাকে বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে ওঠবে, সে প্রত্যাশা করছি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আমার প্রত্যাশা নতুন কিছু না, শুধু একটু পরিবর্তন চাই। বৈশাখের প্রথম দিন থেকে আজকের দিনটা যেন একটু ভালো হয়। কাল যা পারিনি, আজ যেন তা পারি। ভুল শুধরে নিয়ে যেন শুদ্ধতার পথে চলতে পারি। আগামী দিনের বাংলাদেশটা এমন হোক— যাতে এই দেশে জন্মেছি বলে আমাদের মনে কোনো আক্ষেপ না থাকে। এমন একটা দেশ যেখানে সব নাগরিকের মাঝে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় যেন ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সারা বিশ্ব আজ গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছে। তীব্র জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে। শিল্প-কৃষি, বাণিজ্যসহ খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে। এই যুদ্ধের রেশ চলবে গোট বছরজুড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে বাংলা নববর্ষ। সারা দেশের মানুষ ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে এই নববর্ষ উদযাপন করবে।
কিন্তু এরই মধ্যে উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চাপে, নববর্ষের শোভাযাত্রাকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বানিয়েছিল। এবারে নির্বাচিত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রথমে বর্ষবরণে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ অনুষ্ঠানের কথা বললেও শেষে আবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করার ঘোষণা দিয়েছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীর দাবি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাকি হিন্দুয়ানী শব্দ, ফলে এটা পরিবর্তন করতে হবে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ‘মোটিফ’ তৈরিতেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন ‘মঙ্গল’ যদি হিন্দুয়ানী হয় তাহলে ‘মঙ্গলবার’, ‘মঙ্গল গ্রহ’ এগুলোও কি পরিবর্তন করতে হবে?
এছাড়া নববর্ষের প্রাক্কালে চিহ্নিত ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় পীরের দরবারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে পীরকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। ১০ এপ্রিল খোদ রাজধানীতে শাহবাগ থানার সামনে ট্রান্স জেন্ডারদের ওপরও একই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হামলা করেছে। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পর সারা দেশে শতাধিক পীরের মাজার, বাউল আখড়া, ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের ওপর হামলা করেছে। মাজার, দরগা, আখড়া ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করেছে। ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই মুসলিম ধর্মাবলম্বী ভিন্ন মতের ওপরও অপর অংশ হামলা, হত্যা করেছে। এতে ভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দেশে এক মবের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।
নববর্ষে আমরা ওইসব মব সন্ত্রাস, ভিন্ন ধর্ম, জাতি ও মতের মানুষের মধ্যে আবহমানকাল চলে আসা সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে উঠুক এই প্রত্যাশা করি।
রাষ্ট্র, সরকার সকল মত-পথ, ধর্ম-বর্ণ, জাতির মানুষ তথা সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এটাই কাম্য।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বাংলা নববর্ষে সারা দেশের সব মানুষেরই ছোট্ট একটি প্রত্যাশা থাকে— সবার মঙ্গল হোক। সব ধরনের গ্লানি দূর করে সবার মধ্যে সহনশীলতা তৈরি হবে। নতুন বছরে আমারও সেই প্রত্যাশা।
বিএনপির নেতা ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, দীর্ঘ দিন পর আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন বছরে প্রত্যাশা, গণতন্ত্র চর্চা যেন আরও সুসংহত হয়। এছাড়া সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ যেন গড়তে পারি। আর বৈশ্বিক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সফলভাবে সবকিছু মোকাবিলার প্রত্যাশা থাকবে।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বলেন, বাংলা নববর্ষের দেশের সব মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা দেয়। আমরা মনে করি, নতুন বছরে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা তৈরি হয়। তবে আমাদের সংস্কৃতি চর্চা যেন সুস্থ ধারার হয়। তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের পথরেখায় চলছি। তবে সরকার গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন না করতে নানা রকম অপচেষ্টা করছি। ভিন্নমত থাকলেও আমরা যেন সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি। নতুন বছরে সেটাই প্রত্যাশা।