দেশের সব কারাগারে বন্দিরা ঈদের নামাজ আদায়ের পরপরই ঈদুল ফিতরের আনন্দ উৎসবে অংশ নেবেন। নতুন পোশাক গায়ে দিয়ে তারা চার দেয়ালের ভেতরে কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনীতেই ঈদ উদযাপন করবেন। এ উপলক্ষে কারাগারগুলোতে থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা এবং ঈদের বিশেষ খাবারের আয়োজন, যা সব বন্দির জন্য সমানভাবে পরিবেশন করা হবে।
কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে বন্দি সাবেক মন্ত্রী-এমপি, আমলাসহ অন্যান্য বন্দিরা পরিবারের পক্ষ থেকে ঈদের নতুন পোশাক পেয়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলায় আটক আওয়ামী লীগ সরকারের এসব সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও সচিবসহ প্রায় সবাই এবার প্রথমবারের মতো ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিশেষ কারাগারে ঈদ উদযাপন করবেন। যদিও গত বছর তাদের অনেকেই কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারেই ঈদ উদযাপন করেছিলেন।
সাবেক আইজিপি ও রাজসাক্ষী আব্দুল্লাহ আল মামুন একই কারাগারে অবস্থান করলেও অন্যান্য বন্দিদের চোখের আড়ালে একটি পৃথক কক্ষে একাকী থাকেন।
শনিবার (২১ মার্চ) ঈদুল ফিতরের আনন্দে মেতে উঠবে গোটা দেশ। সেই আনন্দে অংশ নেবেন কারাবন্দিরাও।
বৃহস্পতিবার কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, বন্দিদের ঈদ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কারাগারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুটবল খেলা ও অন্যান্য বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিনসহ তিন দিনের মধ্যে একদিন বন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে তিন মিনিট মোবাইলে বিনামূল্যে কথা বলার সুযোগ পাবেন। একই সময়ের মধ্যে একদিন স্বজনরা কারাগারে গিয়ে বাসা থেকে রান্না করা খাবার বন্দিদের দিতে পারবেন।
ঈদ উপলক্ষে দেশের সব কারাগারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং কারা গোয়েন্দাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কারা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় বন্দি সাবেক আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানসহ মন্ত্রী, এমপি, সচিব ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ১২৩ জন বন্দিকে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। এর আগে তারা কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে ঈদুল ফিতর উদযাপন করলেও এবার প্রথমবারের মতো বিশেষ কারাগারে ঈদ পালন করবেন।
বিশেষ কারাগারে থাকা বন্দিদের জন্য তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ঈদের নতুন পোশাক পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী সেগুলো বন্দিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এসব বন্দির অধিকাংশই বয়সে প্রবীণ; তাদের জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষ কারাগারে ঈদের একটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং এতে এসব বন্দি অংশগ্রহণ করবেন।
ঈদ উপলক্ষে উন্নত মানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা থাকলেও বিশেষ কারাগারে বিনোদনের আয়োজন সীমিত। তবে বিশেষ কারাগারে কর্মরত সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের অংশগ্রহণে একটি ফুটবল খেলার আয়োজন হতে পারে। খেলা অনুষ্ঠিত হলে সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ অন্যান্য বন্দিরা তা উপভোগ করবেন।
কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে একই বাউন্ডারির মধ্যে পৃথক ওয়ার্ডে রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে রাখা হয়েছে। তিনি ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে জামাতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে অন্যান্য বন্দিদের দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, দেশের সব কারাগারে দুস্থ বন্দিদের তালিকা করে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ও কারা অধিদপ্তরের মাধ্যমে নতুন পোশাক বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, সব কারাগারেই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং বন্দিদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন করা হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে থাকা সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য বিনোদনের আয়োজন তুলনামূলক সীমিত হলেও সেখানে অবস্থানরত কয়েদিদের অংশগ্রহণে একটি ফুটবল খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। ঈদের দিন সেখানে একটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সবাই একসঙ্গে নামাজ আদায় করবেন।
আইজি প্রিজনস আরও জানান, ঈদের দিন সকালে তিনি নিজেই কারাগার পরিদর্শনে যাবেন, বন্দিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গেও কুশলাদি বিনিময় করবেন।
এই বিশেষ কারাগারে আটক আওয়ামী লীগ সরকারের আলোচিত রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী-এমপি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যারা রয়েছেন, তারা হলেন—সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।
এ ছাড়া সাবেক মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, সাবেক দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, সাবেক এমপি জাহিদ হাসান শামীম, সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ, সাবেক এমপি মো. শহিদুজ্জামান সরকার, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ডিবির সাবেক কর্মকর্তা জাবেদ ইকবাল এবং সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তবে কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারে ঈদ উপলক্ষে বন্দি সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ অন্যান্যরা একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করবেন। কারাগারের বাস্তবতায় তাদের এভাবে একসঙ্গে হওয়া একেবারেই বিরল। শুধুমাত্র ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের জন্যই এই একত্রিত হওয়া। এসব বন্দি একই কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে অবস্থান করলেও নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের বাইরে অন্য ওয়ার্ডের বন্দিদের সঙ্গে সাধারণত সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান না।
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাজসাক্ষী হওয়ায় তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে ৫ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।