Image description

শহীদ জিয়ার স্মৃতি ফিরে এলো ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে তিনি এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি খালের পাড়ে একটি গাছ লাগান।

প্রধানমন্ত্রীর সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ‘নদীনালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদীনালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৩টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাধার সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রধানমন্ত্রী তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ কর্মসূচি শুরু করেছেন। জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান উদ্যোগকে সে কর্মসূচির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চিরবিদায়ের ৪৫ বছর পরও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এখনো বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরূক।

শ্রদ্ধার আসনে আসীন।

জিয়াউর রহমানের শাসনামল, বাংলাদেশে সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন, ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন এবং কৃষি, শিল্প ও পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করেন। ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শাসনক্ষমতায় ছিলেন। তার এই স্বল্প সময়ের শাসনকালে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, নিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ দেশের মানুষ এখনো শহীদ জিয়াকে স্মরণ করে তার সততার জন্য। একজন রাষ্ট্রপ্রধান কতটা সৎ জীবনযাপন করতে পারেন তার উদাহরণ হলেন জিয়াউর রহমান। একজন রাষ্ট্রপতি যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন, কোনোভাবেই যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেন, তাহলেই যে একটি সরকার দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে শহীদ জিয়ার শাসনকাল তার প্রমাণ। শহীদ জিয়া নিজে সততার চর্চা করেছেন জীবনভর। যেখানেই দুর্নীতি দেখেছেন সেখানেই তিনি কঠোরভাবে তা দমন করেছেন। জিয়াউর রহমানের সততা নিয়ে এখনো আলোচনা হয় জনগণের মাঝে। তিনি একজন সৎ মানুষের প্রতিকৃতি।

রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তিনি কখনো নিজের জন্য বিলাসিতা, আত্মীয়স্বজনের প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তার কর্মজীবনে দেখা যায় নিজের পরিবারের কেউ সরকারি সুবিধা বা বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করেনি। রাষ্ট্রপতি ভবনের বিলাসবহুলতা হ্রাস করে সাধারণ জীবনযাপন বজায় রেখেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেছেন আমরণ। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, প্রেসিডেন্ট থাকার সময় জিয়া নিয়মিত অফিস সময়ের আগেই কাজে যোগ দিতেন, ব্যক্তিগত ব্যয় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিতেন না এবং তার পরিবারকেও সেই শিক্ষা দিতেন। জাতীয় উন্নয়নে নিষ্ঠা ও পরিকল্পিত কর্মতৎপরতা ছিল তার স্বভাবসুলভ। শহীদ জিয়া দেশ গড়ার মহান ব্রত নিয়ে এক নতুন উন্নয়ন চিন্তার সূচনা করেন। তার শাসনামলে যে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়, তা ছিল প্রান্তিক জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর। তার সততা নিষ্ঠা নিয়ে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ‘দেয়াল’ উপন্যাসে লিখেছেন-‘বাংলাদেশের মানুষ মনে করতে শুরু করল অনেক দিন পর তারা এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে যিনি সৎ। নিজের জন্যে কিংবা নিজের আত্মীয়স্বজনের জন্যে টাকাপয়সা লুটপাটের চিন্তা তার মাথায় নেই। বরং তার মাথায় আছে দেশের জন্যে চিন্তা। তিনি খাল কেটে দেশ বদলাতে চান। জিয়া মানুষটা সৎ ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। লোক দেখানো সৎ না, আসলেই সৎ। তার মৃত্যুর পর দেখা গেল জিয়া পরিবারের কোনো সঞ্চয় নেই।’

জিয়াউর রহমানের শহীদ হবার ৪৫ বছর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই শহীদ জিয়ার আদর্শ ফিরিয়ে এনেছেন দেশ পরিচালনায়। তারেক রহমানের সাদামাটা পোশাক, সময়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা, প্রটোকল ছাড়া যানজটে আটকে থাকা-এসবই শহীদ জিয়ার আদর্শকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

শহীদ জিয়ার আদর্শের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ছিল সততা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান। জিয়াউর রহমানের তিরোধানের পর দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রনায়কের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। তারেক রহমানের ভিতরে জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখে সাধারণ জনগণ আশান্বিত। সাধারণ মানুষ চায় একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। যেখানে পদে পদে ঘুষ বাণিজ্য হবে না। যে দেশে নাগরিকদের চাঁদাবাজদের ভয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না। সরকারি কাজের জন্য হয়রানির শিকার হতে হবে না।

শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর, গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এখন রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। এখানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পিয়ন চাপরাশি পর্যন্ত উপরি চায়। থানার ওসি থেকে শুরু করে সরকারের বড় কর্তা প্রায় সবাই ঘুষে কাঙাল। এখানে চাকরি পেতে ঘুষ লাগে। পদোন্নতির জন্য ঘুষ দিতে হয়। ভালো পোস্টিংয়ের রীতিমতো নিলাম হয়। সাব-রেজিস্ট্রারদের ভালো জায়গায় পদায়নের জন্য ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ভালো থানার ওসি পদে নিয়োগ পেতে ঘুষের অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। গণপূর্ত বিভাগ, স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ, পিডিবির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো জায়গায় প্রকৌশলীদের পদায়নের জন্য নির্ধারিত অঙ্কের টাকা নজরানা দিতে হয়। আগে থেকেই এসব পদের বিপরীতে ঘুষ লেনদেন ছিল ওপেন সিক্রেট। কিন্তু অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে এই পদায়ন বাণিজ্য মহামারির আকার ধারণ করেছে। ঘুষের রেট দ্বিগুণ হয়েছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের এক ছাত্র উপদেষ্টা ঘুষ বাণিজ্যের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। প্রধান প্রকৌশলী, ওয়াসার এমডি, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিতেও নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকার উৎকোচ। সচিব পদে নিয়োগ থেকে জেলা প্রশাসকের পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে গণমাধ্যমে। দুর্নীতি ক্যানসারের মতো বিস্তার লাভ করেছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। গণমাধ্যমে এখন প্রতিদিন অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে শত শত অভিযোগ আসছে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালের এক-এগারোর সরকার যেমন দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল ১০ বছর, ঠিক তেমনি সুশীল সমাজের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্র্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে লুটপাটের এক স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছিল। পিআইবি কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বোচ্চ পদে দুর্নীতিবাজদের বসিয়ে যথেচ্ছ লুটপাটের লাইসেন্স দিয়েছিল বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকার।

একজন ব্যক্তি যখন ঘুষ দিয়ে কোন চেয়ারে বসে, তখন প্রধান লক্ষ্য হয় দুর্নীতি করে টাকা আত্মসাৎ। প্রথমে সে ঘুষের টাকা ওঠায়, তারপর তিনি নিজের পকেট ভারী করেন। অনেকেই মনে করেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি এবং ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। দেশে এক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল গত দেড় বছর। সেখান থেকে রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের প্রথম কাজ হলো, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির কঠোর প্রয়োগ।

বাংলাদেশে যদি শুধু দুর্নীতি বন্ধ হয় তাহলেই দেশের ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলেই দেশের অবিশ্বাস্য উন্নয়ন সম্ভব। সরকারের বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পদায়নে যদি অবৈধ লেনদেন বন্ধ করা যায়, তাহলেই জনগণের হয়রানি দূর করা সম্ভব। আর এটা করতে হলে শহীদ জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করতে হবে সরকারের কর্মকাণ্ডে। জিয়া নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর সরকার দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম কাজ হবে দুর্নীতিকে না বলা। নিয়োগ বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে পারলেই দুর্নীতি দমন করা যাবে। যেটি শহীদ জিয়া তাঁর শাসনকালে করে দেখিয়েছেন।

১৬ মার্চ খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদ জিয়া যেন আবার ফিরে এসেছেন এই বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর আদর্শবান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেন, তাহলেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। এ দেশের জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক রহমানের মধ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রকাশ দেখতে চায়। খাল কাটার মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ জিয়াই হোক তারেক রহমানের পথপ্রদর্শক।