Image description

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। নেতৃত্বে আসতে আগ্রহীদের অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় লবিং (তদবির) শুরু করেছেন। বিএনপির হাইকমান্ডও রাজপথের পরীক্ষিত ও মেধাবী নেতৃত্বের সন্ধানে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ঈদের আগেই যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। সম্ভাব্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কয়েকজনের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। সংগঠনের ত্যাগী ও দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় নেতাদেরই নতুন কমিটিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা নেতৃত্বে আসছেন, তা নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

 

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রদলের চিত্রও একই। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে যে সাত সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মেয়াদও ইতোমধ্যে এক বছর অতিক্রম করেছে। ফলে কেন্দ্র থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্রই এখন বইছে নতুন নেতৃত্ব পরিবর্তনের হাওয়া।

 

নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জোর গুঞ্জন

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাবি শাখায় নতুন কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কমিটি ভেঙে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ের পর পদপ্রত্যাশী নেতাদের তৎপরতা আরও বেড়েছে। সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদরাও পরামর্শ দিয়েছেন।

 

বিএনপির কয়েকটি সূত্র জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উপদেষ্টারা দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই বিএনপির অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের মতো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং অন্যতম প্রধান ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নতুন নেতৃত্ব আসার গুঞ্জন নেতাকর্মীদের মাঝে জোরালো হয়েছে।

 

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, গত ১ মার্চ আমাদের দুই বছরের মেয়াদি কমিটির সময়সীমা শেষ হয়েছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যখন চাইবেন তখনই নতুন কমিটি হবে। তবে এখনই কমিটি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বর্তমানে অমর একুশে বইমেলায় আমাদের স্টল ও অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদপ্রত্যাশীরা তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরছেন, যা আমাদের নজরে এসেছে। তবে কমিটি পরিবর্তনের চূড়ান্ত সময়টি এখনই বলা যাচ্ছে না।

 

সভাপতি পদে যারা আলোচনায়

 

সিনিয়র কমিটি হলে ০৭-০৮ সেশন থেকে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম এবং সহসভাপতি জহির রায়হান আহমেদ।

 

০৮-০৯ সেশন থেকে সভাপতি পদে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এজাজুল কবির রুয়েল, রিয়াদ রহমান, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, এইচ এম আবু জাফর, খোরশেদ আলম সোহেল এবং সাফি ইসলাম।

 

২০০৯-১০ সেশন থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই সেশন থেকে সভাপতি পদে সর্বত্র আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, মাসুদুর রহমান, মো. বায়েজিদ হোসাইন, ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম।

 

সাধারণ সম্পাদক আলোচনায় যারা

 

১০-১১ সেশন থেকে সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং মাসুম বিল্লাহ।

 

১১-১২ সেশন থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, তারিকুল ইসলাম তারিক, তারেক হাসান মামুন।

 

তবে দলীয় সূত্র বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক উভয় পদেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। তিনি এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

গত ৮ মার্চ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দ্রুতই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

 

ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী নেতারা বলেন, অতীতে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও সন্তুষ্ট হবেন। সংগঠন ও সাংগঠনিক অভিভাবক চাইলে যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব।

 

তারা আরও বলেন, দুই বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নতুন কমিটি হবে। সংগঠনের গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এটি প্রয়োজন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান। তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটিই সবাই মেনে নেবে।

 

ঢাবি ছাত্রদলে আলোচনায় আবিদ-হামিম

 

২০২৪ সালের ১ মার্চ গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে শাখা ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে তিন মাস আগে গত ১৪ নভেম্বর ২৪২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

 

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির মেয়াদ এক বছর হওয়ায় বর্তমান কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নতুন কমিটি নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। একাধিক নেতার নামও সম্ভাব্য তালিকায় উঠে এসেছে।

 

২০১৩-১৪ সেশন থেকে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন ঢাবি শাখা ছাত্রদলের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক। অন্যদিকে ২০১৪-১৫ সেশন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বিএম কাউসার এবং সাইফ খান সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন।

 

২০১৫-১৬ সেশনের কয়েকজন নেতার নামও সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের তালিকায় বেশি আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে আছেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের আলোচিত ভিপি প্রার্থী ইসলাম খান এবং ঢাবি ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী।

 

অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত নবীন সেশন থেকেও কয়েকজন নেতা আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৬-১৭ সেশন থেকে আলোচনায় আছেন ঢাবি ছাত্রদলের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আবু হায়াত মোহাম্মদ জুলফিকার জিসান এবং প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান।

 

২০১৭-১৮ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ আলোচনায় রয়েছেন।

 

২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী ও ডাকসু নির্বাচনে আলোচিত জিএস প্রার্থী, সদ্য ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ কর্তৃক শোকজ করা শেখ তানভীর বারী হামিমও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

 

ছাত্রদলের নতুন কমিটির বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা হয় বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে নতুন কমিটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা প্রকৃত ছাত্র এবং যাদের ছাত্রত্ব আছে, তাদের দিয়েই নতুন কমিটি গঠিত হবে। তবে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান দুদু এশিয়া পোস্টকে বলেন, নতুন কমিটি গঠন দলের ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে ছাত্রদলের কমিটি বা সাংগঠনিক বিষয়ে তিনি নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।