Image description
 

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় বেশ কয়েকদিন ধরে সংঘাত সংঘর্ষ চলমান। এমন প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ কয়েকটি শহরে পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে বলে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ মন্তব্য করেন। পাকিস্তান এখন থেকে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থা নামবে বলে তিনি ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ বলেন, রাজধানী কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণের কান্দাহারে আফগান তালেবানদের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এই অভিযানের ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ নাম দিয়েছে পাকিস্তান। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ডন জানিয়েছে, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও খারিজি জঙ্গি নিহত হয়েছেন। প্রায় ৪ শতাধিক আফগান সৈন্য আহত হয়েছেন। এছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় তালেবানদের ৭৩টি চৌকি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৭টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং আর্টিলারি ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে আফগান বাহিনী হত্যা করেছে এবং ২টি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯ট চৌকি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। 
গত বছরের অক্টোবরে এই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মিনি ওয়ার বা নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ বলে অভিহিত করলেও ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাত এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, একে এখন ওপেন ওয়ার বা প্রকাশ্য যুদ্ধ বলা হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের নজর ভিন্ন দিকে ফেরাতে বাইরের রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যেহেতু বর্তমানে পাকিস্তানে একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকট বিদ্যমান। তাই তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। রাশিয়া উভয় পক্ষকে অবিলম্বে আন্তঃসীমান্ত হামলা বন্ধ এবং কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ মেটানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছে। চলমান সংকট নিরসনে রাশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে আলোচনা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ভিত্তিতে মতভেদ দূর করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। এটি মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাকিস্তানের আরেকটি চেষ্টা বলে ভারত উল্লেখ করে। জাতিসংঘের মহাসচিব উভয়পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে টিটিপি এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধি করেছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে তারা হামলা চালায় বেশি। বাস্তববাদতত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই প্রধান অভিনেতা এবং তাদের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। পাকিস্তান তার পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। আফগানিস্তানও সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত স্বীকৃতির প্রশ্নে সংবেদশনশীল আবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। 
আফগানিস্তান ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের বিশ^ খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ খাদ্যঘাটতিতে ভুগছে। তাদের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ ধসে পড়েছে। ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১৭ লাখ আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে অবস্থান করছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান জানিয়েছে, অবৈধভাবে পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান নাগরিকদের বহিষ্কার করা হবে। এর ফলে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান সরকার আফগানিস্তান শরণার্থী বহিষ্কারসহ কিছু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পরিস্থিতি আও জটিল হয়েছে। তুরস্ক ও কাতার উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা চালালেও তা সফল হয়নি। ২০২১ সালে তালেবান সরকার আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পাকিস্তান ভেবেছিল উভয় রাষ্ট্রের পুরাতন সম্পর্ক পুনর্জীবিত হবে। পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে তালেবান সরকার একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে। ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পাকিস্তানের বিপরীতমুখী একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সমর্থন দিয়ে পাকিস্তান দেশ শাসনকারী যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে গোপনে তালেবানের পুনরুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিল পাকিস্তান। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণ করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা পরিচালনা করছে। যদিও আফগানিস্তান তাদের এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমানে প্রায় সময় বিমান হামলা চালায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে আফগানিস্তান স্বীকৃতি দিতে প্রথমে অনীহা দেখিয়েছিল। ব্রিটিশ ভারত ও আফগানিস্তানের আমির আবদুর রহমানের মধ্যে ১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে স্বীকার করেনি আফগানিস্তান সরকার। ব্রিটিশ সরকার ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করতে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রায় ২,৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমানা নির্ধারণ চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। ডুরান্ড লাইনের পশ্চিম প্রান্ত ইরান সীমান্তের সঙ্গে এবং পূর্ব প্রান্ত চীন সীমান্তের সঙ্গে। আফগানিস্তানের ১২টি প্রদেশ এবং পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া, বালুচিস্তান ও গিলগিট-বালতিস্তান এই রেখার দুই পাশে অবস্থান করছে। আফগানিস্তানের যুক্তি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। 
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান পাকিস্তানের সীমান্ত ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। আবার পাকিস্তানও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের নিকট নিষিদ্ধ টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাবি জানিয়েছে। সম্প্রতি দোহায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-আফগানিস্তান বৈঠকে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষমন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব ডুরান্ড লাইনকে কাল্পনিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইনকে মানতে নারাজ এবং এটিকে ব্রিটিশদের চাপের ফল মনে করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সত্তরের দশকে আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের অস্ত্র ও আশ্রয় প্রদান করে পাকিস্তান সহযোগিতা করে। তখন থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফগানিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদে ১৯৯০ এর দশকে তালেবানদের উত্থান হয়েছিল। পাকস্তিানের পরিকল্পনা ছিল, আফগানিস্তানে যদি তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে ওই অঞ্চলে ভূকৌশলগত একটি অবস্থান তৈরি হবে। এতে করে ভারতের বিরুদ্ধে এক ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি হবে। এটাও ঠিক যে, তালেবান সরকার কখনোই পাকিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তালেবান সরকারের পতন ঘটলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির আবির্ভাব ঘটে। তারা আফগান তালেবানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে। তারা পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করতে চায়। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে পাকিস্তানে টিটিপির হামলায় প্রায় আশি হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পাকিস্তান চায়, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করুক। পাকিস্তান মনে করে, আফগানিস্তান এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। 
পাকিস্তানে টিটিপির উদ্ভব হয় ২০০৭ সালে। তারা আফগান তালেবান থেকে আলাদা হলেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য জানিয়েছেন, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ইচ্ছুুক নয়। এই দুটি গোষ্ঠীর পুরানো সখ্যতার পাশাপাশি টিটিপির যোদ্ধারা আফগানিস্তানে তালেবান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সে যোগ দিতে পারে এমন একটি ভয় রয়েছে আফগান তালেবানের। আফগান তালেবান যদি টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাহলে বড় ধরনের সংঘাত অনিবার্য। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আফগানিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের ভুল পদক্ষেপের কারণে ভারতের জন্য আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার পর্যায়ে কোনো সুসম্পর্কই নেই। ফলে টিটিপি ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য কোনো উপযোগী যোগাযোগ মাধ্যম নেই বললেই চলে। ভারত এমন পরিস্থিতিতে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। 
পাকিস্তান ও আফগনিস্তানের মধ্যকার সংঘর্ষে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভারত-আফগানিস্তান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সংঘর্ষ বড় কোনো যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করবে এমন সম্ভাবনা অবশ্য কম। আফগানিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতাও কিন্তু পাকিস্তানের তুলনায় কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আফগানবিষয়ক প্রতিনিধি আসিফ দুররানি এ প্রসঙ্গে বলেন, যতই পরিস্থিতি ভয়াবহ হোক না কেন, কূটনীতিকে সবসময় সুযোগ দিতে হবে। যতদিন আফগান সরকার তাদের মাটিতে টিটিপির উপস্থিতি স্বীকার না করবে, ততদিন পর্যন্ত উভয় রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলতে থাকবে বলে এই বিশ্লেষক মনে করেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের ছায়া থেকে বের হয়ে আফগানিস্তান স্বাধীন নীতিতে চলতে ইচ্ছুক। ১৯৯৬ সালের মতো তালেবান সরকার এখন আর পাকিস্তানের ‘ক্লায়েন্ট রেজিম’ নয়; বরং চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়। চীন খুব সতর্কতার সঙ্গে আফগানিস্তানের খনি ও অবকাঠামো থাতে বিনিয়োগ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে চীন আগ্রহী। চীন আফগানিস্তানের সঙ্গে লেনদেনভিত্তিক ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক রেখেছে। পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দরের সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্য রুট সংযোগের পরিকল্পনা থাকলেও সীমান্তে অস্থিরতা এবং টিটিপির উপস্থিতি এমন সম্ভাবনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের বিরুদ্ধেও কাজ করতে আগ্রহী ভারত। রাশিয়াও সম্প্রতি তালেবানের সঙ্গে নীরব কূটনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিমা প্রভাব ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে একটি সম্ভাব্য বাফার জোন হিসেবে মনে করে রাশিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে প্রক্সি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে গিয়ে পাকিস্তানের শাসকেরা নিজেদেরও বহুমুখী বিপদ ডেকে এনেছেন। অভ্যন্তরীণ ও বাইরে তালেবানদের সঙ্গে সীমান্ত অস্থিতিশীল হওয়ায় ডুরান্ড লাইন মাদক ও অস্ত্র চোরাচালঅনের স্বর্গভূমি হয়ে উঠেছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে এটি পাকিস্তান, চীন, ভারত ও মধ্য এশিয়ার জন্য একটি বড় বিপদ তৈরি করছে। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় একধরনের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আফগানিস্তান যেহেতু দক্ষিণ এশিয়াকে মধ্য এশিয়া এবং অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে; তাই রাষ্ট্রটির ভূকৌশলগত গুরুত্বও বেশি। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকেও ব্রিটিশ ও রাশিয়ার মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতময় পরিস্থির সৃষ্টি হয়েছিল; যাকে ‘গ্রেট গেম’ বলে সে সময় অভিহিত করা হয়েছিল। বর্তমান সময়েও দেখা যাচ্ছে একদিকে পাকিস্তান এবং অন্যদিকে ভারত এবং তার সঙ্গে একদিকে চীন ও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থাকায় দ্বিতীয় ‘গ্রেট গেম’ এর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলা যায়। অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে ও নিজেদের ভূমিতে থাকা আন্তঃসীমান্ত জঙ্গিগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে তারা আফগান জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে। আফগানিস্তান বলছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সম্পর্কে ভ্রান্ত তথ্য চূড়াচ্ছে এবং ইসলামিক স্টেট ঘনিষ্ট সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে। আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ও সার্ভভৌমত্বকে তারা ক্ষুণ্ন করছে। আর পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান বছরের পর বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে দেশটিতে নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 
পাকিস্তানের এই অধিকতর আক্রমণাত্মক ও জোরালো হামলা তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ইসলামাবাদ এখন নতুন এক প্রতিরোধ কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তারা বার্তা দিতে চায় যে, টিটিপি বা অন্য যে কোনো গোষ্ঠীই হোক না কেন, আফগানিস্তান থেকে কোনো হামলা চালানো হলে কাবুলকে তার চরম মূল্য দিতে হবে। তবে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত বড় কোনো যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করার আশঙ্কা কম। তবে এই সীমান্ত উত্তেজনা কিন্তু শীঘ্রই থামছে না। তবে উভয় রাষ্ট্রই যদি সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, বাণিজ্য পুনরায় শুরু করে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে; তাহলেই কেবল পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে। কেবল সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ নিরাপত্তা দিতে পারবে না, যদি তা ধারাবাহিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক সমঝোতার সম্পর্কে সম্মিলিত না হয়।

ড. মো. মোরশেদুল আলম

লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়