Image description

আমাদের জাতীয় আবেগ অনেকটা বাংলার কালবৈশাখী বা মরুভূমির সাইমম ঝড়ের মতো-হঠাৎই সর্বোচ্চ শক্তিতে রূপ নেয়, দিকনির্দেশহীনভাবে সবকিছু আচ্ছন্ন করে ফেলে। এরপর কয়েক দিনের মধ্যে সেই উত্তাল আবেগ যেন কোথায় চাপা পড়ে যায়, হারিয়ে যায় স্মৃতির গভীরে। এক একটি ঘটনা আমাদের সম্মিলিত মনোজগতে তীব্র আলোড়ন তোলে, রাজপথ ভরে ওঠে স্লোগান আর ক্ষোভে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়ে ওঠে নৈতিকতার দাবিতে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি নতুন ইস্যু এসে আগেরটিকে চাপা দিয়ে দেয়। যে ক্ষত সপ্তাহখানিক আগে অসহনীয় মনে হয়েছিল, এখন তা সামাজিক মাধ্যমে আর উচ্চারিতই হয় না। এমন প্রবণতা বারবার স্পষ্ট করে দেয়, আমরা আবেগে দ্রুত জ্বলে উঠি, কিন্তু চেতনায় একে স্থায়ী হতে দিই না—ফলে বিচার, দায়বদ্ধতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আত্মসমালোচনার জায়গায় পৌঁছানোর আগেই আমাদের আবেগ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আবেগের এই ক্ষণস্থায়িত্বই আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আবেগী বিস্ফোরণ কখনও কখনও সহিংসতায় গড়ায়, কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তনের ফল ঘরে তুলে আনার আগেই তা উধাও হয়ে যায়।

 

প্রেক্ষাপট ডিসেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে ডিসেম্বর মানেই শুধু ক্যালেন্ডারের শেষ মাস নয়। ডিসেম্বর মানে বিজয়ের মাস, স্মৃতি, উৎসব, শোক, ক্ষোভ, ভয়-সব মিলিয়ে এক ধরনের মানসিক দায়বদ্ধতা। এই মাসে জাতীয় আবেগ যেন স্বাভাবিক নিয়মে চলে না; এটি বারবার উদ্বেলিত হয়, আবার খুব দ্রুতই অন্য এক আবেগের চাপে চাপা পড়ে যায়। পেছনে ফেলে আসা গত বছরের ডিসেম্বর সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে দেখিয়েছে।

বিজয়ের মাসটির শুরুতেই একটি ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একটি মা কুকুরের সাতটি ছানাই নিষ্ঠুরভাবে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে এক নারী। ছানাগুলোর নিথর দেহ আর অসহায় মা-কুকুরের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, লজ্জিত হয়, গভীরভাবে কষ্ট পায়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে—‘আমরা কি সত্যিই সহানুভূতিহীন এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষে পরিণত হয়েছি।?’ কয়েকদিন ধরে এই ঘটনাটি আলোচনা, নিন্দা আর আবেগের কেন্দ্রে ছিল। মনে হচ্ছিল, এই নিষ্ঠুরতা আমাদের সম্মিলিত বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই আবেগ অন্য খাতে প্রবাহিত হয়। আমরা বেমালুম ভুলে যাই সেই নারীকে যথাযথভাবে সাজা দেয়া হয়েছিল কী না, এখন সেই মা-কুকুরটি দত্তক পাওয়া নতুন দুটি ছানা নিয়ে কেমন আছে?

১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস ঘিরে শুরু হয় আলাদা আবেগ। শহরজুড়ে লাল-সবুজ, দেশাত্মবোধক গান, শোভাযাত্রা, স্মৃতিচারণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্প, শহিদের আত্মত্যাগ, জাতীয় গর্ব-সব আবার সামনে চলে আসে। কুকুরছানার নির্মম মৃত্যুর ক্ষোভ তখন আর কেন্দ্রীয় আবেগ থাকে না; সেটি বিজয়ের আবেগের নিচে চাপা পড়ে যায়। মানুষ হয়ত পুরোপুরি ভুলে যায় না, কিন্তু পুরোনো ইস্যু ধরেও রাখে না। এই ভুলে যাওয়াই আমাদের জাতিগত একটি বৈশিষ্ট্য।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নভেম্বরের শেষ দিকে নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের স্মৃতি তখনও তাজা। তাই ডিসেম্বরে ছোটখাটো কম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে-‘আরেকটা বড় ভূমিকম্প কি আসছে?’ পুরোনো আতঙ্ক নতুন কম্পনের সঙ্গে মিশে যায়। কিছু সময়ের এ বিরামহীন যাত্রায় জাতির মন আবারও ভয়-অনিশ্চয়তা-আতঙ্কের দিকে মোড় নেয়। কিন্তু সেই ভয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

শ্বাসরুদ্ধকর প্রায় দুই দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযান ও শিশু জিহাদকে ঘিরে দেশবাসী এক অদ্ভুত সম্মিলিত আবেগে স্তব্ধ হয়ে ছিল। গভীর নলকূলের সংকীর্ণ পাইপের ভেতর আটকে থাকা একটি শিশুর নিঃশ্বাসের সঙ্গে যেন পুরো জাতির শ্বাস-প্রশ্বাস আটকে গিয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সদস্যরা নির্ঘুম পরিশ্রম করছিলেন; গ্রাম থেকে শহর—সবখানে মানুষ প্রার্থনায় হাত তুলেছিল। যখন জিহাদকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো, মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, এই দেশ এখনও অলৌকিকতাকে বিশ্বাস করতে জানে। কিন্তু সেই আশা বেশিক্ষণ টিকল না। কিছুক্ষণ পরে চিকিৎসকের কণ্ঠে ‘মৃত’ শব্দটি উচ্চারিত হতেই জাতীয় আবেগে নেমে আসে এক গভীর, ভারী নীরবতা। উল্লাস নয়, তখন আর কোনো চিৎকারও ছিল না-ছিল কেবল স্তব্ধতা, যে স্তব্ধতা বলে দেয়, আমাদের আবেগ গভীর হলেও এর আয়ুষ্কাল কতটা ক্ষণস্থায়ী।

 

ঠিক সেই শোকাচ্ছন্ন স্তব্ধতার মাঝেই, ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরান পল্টনে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করা হয় শরিফ ওসমান বিন হাদিকে। মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় আবেগের দিক পাল্টে যায়। শিশু জিহাদ, তার নির্বাক মা, দুই দিনব্যাপী প্রার্থনা-সবকিছু যেন এক ঝটকায় আড়ালে চলে যায়। নতুন করে আমাদের মনোজগৎ গ্রাস করে নেয় নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক, রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়, প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের শিউরে ওঠা দৃশ্য। 
আমরা খুব দ্রুত এক ট্র্যাজেডি থেকে আরেকটিতে সরে যাই—পেছনে ফেলে আসি সেই শিশুটিকে, যার জন্য কয়েক ঘণ্টা আগেও পুরো দেশের মানুষ নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, আমাদের জাতিগত আবেগ কীভাবে এক শোককে আরেক শোক দিয়ে চাপা দেয়; কীভাবে স্মৃতি হারিয়ে যায়, কারণ নতুন আতঙ্ক পুরোনোটিকে গ্রাস করে ফেলে। 

রাজধানীতে প্রচারণার সময় গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ইনকিলাব মঞ্চের এই শক্তিশালী নেতা এবং জুলাই আন্দোলনের লড়াকু সৈনিকের মৃত্যুর পর সেই রাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে লাখো মানুষ। শোক আর ক্ষোভ এক হয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ, রাস্তায় বিক্ষোভ, আর তারই ধারাবাহিকতায় কিছু বিশৃঙ্খল গোষ্ঠী ডেইলি স্টার, প্রথম আলোর ভবন ও ছায়ানটে আগুন দেয়। শোক মুহূর্তেই সহিংসতার ভাষা পেয়ে যায়।

২০ ডিসেম্বর শনিবার সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত ওসমান হাদির জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। আবেগ আবার চূড়ায় ওঠে। মনে হচ্ছিল-এই ঘটনা দীর্ঘদিন জাতির স্মৃতিতে চিরজাগ্রত হয়ে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে একটি জাতীয় আবেগ আরেকটির জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়। 

এই সময়েই ভারত বিরোধী আওয়াজও নতুন করে আলোচনায় আসে। সীমান্ত, রাজনীতি, কূটনীতি (পাল্টাপাল্টি দূতাবাস বন্ধ)-এসব ইস্যু আবার সামাজিক মাধ্যমে তর্ক-বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতির আবেগ আবারও বিভক্ত হয়; কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ উচ্ছ্বসিত।

২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার, দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দেশে ফেরা আমাদের জাতীয় আবেগের গোটা মানচিত্র বদলে দেয়। রাজধানীসহ সারাদেশে নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ, প্রত্যাশা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে গণসংবর্ধনাস্থল, তারেক রহমানের বাসভবন ঘিরে জনতা, স্লোগান, আনন্দ-সব মিলিয়ে এক নতুন আবেগ আমাদের ছাপিয়ে যায়। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি জাতীয় ইস্যুর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। হাদির হত্যাকে ঘিরে তৈরি হওয়া শোক এবং ক্ষোভ তখন ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়।

এরপর, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে, ৩০ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে গোটা দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম আবার কালো ব্যানারে ভরে যায়। আগের সব আবেগ-উচ্ছ্বাস, ক্ষোভ, আতঙ্ক একটি বিস্তৃত-গভীর শোকের নিচে চাপা পড়ে যায়।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয় আবেগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কয়েকটি শীর্ষ গণমাধ্যম একটি গুরুতর তথ্যগত ভুল করে, যা ফ্যাক্ট-চেকের দৃষ্টিতে স্পষ্টভাবে বেমানান। প্রতিবেদনে ঢালাওভাবে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়া ‘গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন’। বাস্তবে এই বর্ণনা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে আড়াল করে। খালেদা জিয়া ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি ছিলেন। এর আগে তিনি প্রায় তিন বছর সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। আরও আগে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জেড ফোর্সের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী ছিলেন—যে ভূমিকা তাকে যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্র গঠনের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রেখেছিল। ফলে ‘গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আগমন’—এই সরলীকৃত দাবি তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর এবং রাজনৈতিক উত্থানের আগে তার রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক অবস্থানকে অস্বীকার করে। এই ধরনের ভুল উপস্থাপন দেখায়, কীভাবে শোক ও আবেগের তাড়নায় যাচাই ছাড়াই তথ্য প্রচারিত হলে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অজানা রয়ে যায়।

এখানেই বাংলাদেশের আবেগী বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ঘটনা আরেকটিকে মুছে ফেলে না; বরং ঢেকে দেয়। স্মৃতি স্তরে স্তরে জমা হয়, কিন্তু আমরা সবসময় সর্বশেষ আবেগটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

ডিসেম্বরের শেষ দিনে এই প্রবণতা আরও বাজেভাবে প্রকাশ পায়। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলাকালেই মধ্যরাতে দেশজুড়ে আতশবাজি ও পটকার শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে অনেকে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, শোকের কারণে হয়তো থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনে এ বছর মানুষ কিছুটা সংযত হবে। বাস্তবে ততটা হয়নি। শোকের মধ্যেই আনন্দের উন্মাদনা জায়গা করে নেয়। 

আবেগ বনাম তথ্য: মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ডিবির অভিযোগপত্রে স্পষ্ট হয়েছে, শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা করা হয়েছে তার ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র কারণে। তদন্তে দেশীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্পৃক্ততার তথ্য মিললেও এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের সরাসরি কোনো যোগসাজসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ হাদির মৃত্যুর পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে আবেগতাড়িত একদল মানুষ তাকে ‘নয়াদিল্লিপন্থির শিকার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাজধানীতে সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেই আবেগের ঢেউয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন, ছায়ানটসহ কয়েকটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, তার সঙ্গে তদন্তের তথ্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, যে ঘটনায় তদন্ত বলছে এটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল, সেই ঘটনাকে মুহূর্তের আবেগে ভিন্ন বয়ানে রূপ দিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সংস্কৃতিক অঙ্গনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এই বৈপরীত্য দেখায়, কীভাবে তথ্য যাচাইয়ের আগেই জাতীয় আবেগ দ্রুত ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মতো কঠোর অবস্থানে চলে যায়। 

এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘সমষ্টিগত আবেগের বিস্ফোরণ প্রবল হয়, কিন্তু তা ভেঙে পড়তেও সময় লাগে না।’। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা আরও প্রকট। আমরা খুব দ্রুত আবেগে ভাসি, আবার ঠিক তত দ্রুতই অন্য আবেগে স্থানান্তরিত হই।

এই ডিসেম্বর আমাদের দেখিয়েছে-আমরা নিষ্ঠুরতায় কাঁদি, বিজয়ে গর্ব করি, ভূমিকম্পে ভয় পাই, রাজনৈতিক ঘটনায় উচ্ছ্বসিত হই, আবার শোকে ডুবে যাই। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আবেগকে ধারণ করি।

ডিসেম্বর তাই শুধু ঘটনাপ্রবাহের মাস নয়। ডিসেম্বর হলো আমাদের জাতিগত মনস্তত্ত্বের একটি জীবন্ত মানচিত্র।এখানে আবেগ আসে ঢেউয়ের মতো-একটি ঢেউ আরেকটির ওপর আছড়ে পড়ে ঢেকে দেয়। আর আমরা সেই ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে চলি-থেমে দাঁড়িয়ে খানিকটা ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ খুব কমই পাই।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা বাঙালিরা জাতিগতভাবে প্রতিবাদী। প্রবাসীরা জাতীয় ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যেও প্রতিবাদ করেন। আমাদের নাটক, সংগীত উপন্যাসে অনেক আবেগ থাকে। চব্বিশের জুলাইতে সর্বস্তরের মানুষ বন্দুকের বিরুদ্ধে খালি হাতে লড়াই করেছে। শহিদ আবু সাঈদ, মুগ্ধরা যে ইতিহাস রচনা করে গেছেন এটি অনেক জাতি চিন্তাও করতে পারবে না। ভারতে এসব বিপ্লব চিন্তাও করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ অনেক স্বাধীনচেতা। ভারত-চীনসহ অনেক দেশে বাসে বা ট্রেনে সরকারের সমালোচনা করা যায় না। ভারত বহু জাতিগোষ্ঠীর হয়েও বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মের মতো উত্তাল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বৃটিশরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। তবে তারা (ব্রিটিশ) আমাদের মতো এতো সহজে আবেগতাড়িত হয় না।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘কনসপিরেসি থিউরি (ষড়যন্ত্র তত্ত্ব) দিয়ে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ‘স্পর্শকাতর ইস্যুকে দামাচাপা দিতে রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক সময় আরেকটি ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে। ব্যক্তিপর্যায় এবং জাতীয় বা সামষ্ঠিক আবেগ আসলেই ক্ষণস্থায়ী। বিভিন্ন স্পর্শকাতর, মানবিক বিষয়ের প্রতি আমরা দ্রুত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শত শত সংবাদ আসছে এক বেলায়। উনিশ বা বিশ শতকে সপ্তাহিক পত্রিকা বা সাময়িকীতেও এতো সংবাদ থাকতো না। তথ্য এখন বোমার মতো আসছে।’ 

‘মানুষের মস্তিষ্ক কিছু জিনিস রেখে দেয়, অনেক কিছুই বাদ দিয়ে দেয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এখন তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। জাতি হিসেবে আমরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। আবেগ ক্ষণস্থায়ী হলেও এর প্রভাব নেতিবাচক বা ইতিবাচক হতে পারে। এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে ঠিক কী ইস্যুতে এই আবেগ জেগে উঠেছিল।’ 

জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা ইস্যু মানুষ ভুলে গেলেও মূলধারা সংবাদমাধ্যম ফলোআপ সংবাদের মাধ্যমে তা বারবার সামনে নিয়ে আসতে পারে। মেইন স্ট্রিম বা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আগের ইস্যুর প্রতি নজর রাখা এবং এসব খবর ফলোআপে রাখা। এদিকে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত বিভিন্ন বিষয় ভাইরাল হয় যার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ কম। ইনফ্লুয়েন্সারের চেয়ে বড় প্রভাবক আমাদের হাতে নেই। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যাটবট দিয়ে নতুন নতুন ইস্যুকে উসকে দেয় বা সামনে নিয়ে আসে। নেট দুনিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ারও দায়িত্ব এসবের ফলোআপ করা। সাংবাদিকতার ধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু গণমাধ্যমগুলো নিজেদের আয় নিশ্চিতের জন্যে ট্র্যান্ডিং বা বেশি হিট পাওয়া যাবে এমন ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। টকশোর বিষয়ও হয়ে থাকে সেদিনের আলোচিত ইস্যুগুলো।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি ভিডিও দেখে আমরাও হতভম্ব হয়ে যাই। ইমোশনকে ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। এই ভয়াবহতা নিয়ে  জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে সচেতন করা সম্ভব নয়। শিক্ষিতদের পক্ষেও এসব ভিডিও যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।’

এই দ্রুত আবেগের স্থানান্তর আমাদের আরেকটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়-তা হলো নৈতিক দায়বদ্ধতা ভুলে যাওয়া। শিশু জিহাদের মৃত্যুর পর সবাই বুঝেছিলাম, পরিত্যক্ত নলকূপ বা মৃত্যুকূপ শুধু একটি পরিবারের নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক। উত্তরাঞ্চলজুড়ে এমন হাজারো খোলা কূপ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার যে গণ-আওয়াজ উঠেছিল, সেটিও খুব দ্রুত মিলিয়ে যায়। ঠিক যেমন হাদির হত্যাকাণ্ডে আমাদের ভেতরে একসময় বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তরের গণআবেগ জেগে উঠেছিল—ন্যায়, বৈষম্যবিরোধিতা, আপসহীনতার স্পষ্ট বার্তা নিয়ে। কিন্তু তারেক রহমানের দেশে ফেরা, এরপর প্রিয় সন্তান ও স্বজনদের সামনে খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ— আমাদের মনোজগৎকে এমনভাবে আন্দোলিত করেছিল যে হাদির অসমাপ্ত কাজ, তার স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন বার্তা ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে আবেগ থাকে, কিন্তু দায়বদ্ধতা রয়ে যায় অনুচ্চারিত।

এই বিস্মৃতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত হলো- হাদি তার জীবদ্দশায় প্রথম আলো ঘেরাও করা অতি ডানপন্থিদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, আর তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রথম আলো এবং দেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ভবন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। 

সেই বিধ্বংসী কালবৈশাখীর সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে দৃঢ় ও নৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন নিউ এজ সম্পাদক ও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভাপতি নুরুল কবির- যখন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও দ্বিধায় ছিলেন। এই ঘটনায় কয়েকদিন পর বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল 24-এর আলোচিত টকশো ‘মুক্তবাক’-এ (সঞ্চালক আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন) কথা বলতে এসে তিনি সহিংসতার বিরুদ্ধে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটিও আমরা খুব দ্রুত ভুলে যাই। আমরা এগিয়ে যাই পরবর্তী আবেগে—ভুলে যাই তারেক রহমানের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সহাবস্থানের বার্তা, ভুলে যাই খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক মুক্তির প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান ও নির্দেশনা। 

এই দ্রুত আবেগ জাগা ও মিলিয়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তিনির্ভরতার বড় ভূমিকা আছে—যেখানে আবেগই পণ্য, মনোযোগই মুনাফা, আর এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় লুটেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে জাতীয় আবেগ যত দ্রুত বদলাবে, তত দ্রুতই আমরা আমাদের আগের দায় ও দায়িত্ব থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো।

মোশফেকুর রহমান, সহকারী বার্তা সম্পাদক

মোশফেকুর রহমান, সহকারী বার্তা সম্পাদক