গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বিশেষ সভার আহ্বান করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভাটি আয়োজন করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর জানাজা ও দাফন কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। পাশাপাশি তারেক রহমানের ঢাকার বাইরে সম্ভাব্য সফরসহ সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল সভার কার্যসূচিতে। সভায় আলোচনার এক পর্যায়ে কোর কমিটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিএনপির তিন সদস্যের কমিটিতে বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব (যিনি বর্তমানে তারেক রহমানের একান্ত সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন) এ বি এম আব্দুস সাত্তারের নাম উঠতেই ক্ষেপে যান গোয়েন্দা সংস্থাসমুহের প্রধানরা। আব্দুস সাত্তারকে বিএনপির এই কমিটিতে রাখা হলে গোয়েন্দা প্রধানরা কমিটিতে থাকবেন না বলে জানান। আব্দুস সাত্তারের বিষয়ে গোয়েন্দা প্রধানরা এতটা ক্ষুব্ধ কেন, এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গোয়েন্দা প্রধানরা আব্দুস সাত্তারের ব্যাপারে কেন এতটা নেতিবাচক তা তারা ব্যাখ্যা করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেগম খালেদা জিয়ার পিএস হিসেবে আব্দুস সাত্তারের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থামূহের কাছে চরম নেতিবাচক তথ্য রয়েছে।
জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির নিয়মিত সভা প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি হয়ে থাকে। তবে নির্বাচন উপলক্ষ্যে প্রতি সপ্তাহেই এখন বৈঠক হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ওই দিনই জরুরিভাবে কোর কমিটির বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছিল। নানা কারণে তারেক রহমানের নিরাপত্তার ইস্যুটিও এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশে ফেরার পরে ঢাকার বাইরে সফরেরও পরিকল্পনা নেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে সফরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে অনেক। তাই এই ইস্যুটিও ছিলো কোর কমিটির আলোচনার এজেন্ডায়।
বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স- এসএসএফ। সভার শুরুতে এসএসএফ প্রধান সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেন। সভায় কোর কমিটির সদস্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবরা ছাড়াও তিন বাহিনী (সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী) প্রধানের প্রতিনিধিরা এবং এসএসএফ’র ডিজি, এনএসআই’র ডিজি, ডিজিএফআই’র ডিজি, এসবি প্রধান, ডিবি প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার আলোচনার এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, বিএনপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে। যাতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন সংশ্লিষ্ট কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করা যায়, পাশাপাশি তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা যায়। এই সময় সভায় উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই একজন কর্মকর্তা তিন সদস্যের কমিটিতে আব্দুস সাত্তারের নাম প্রস্তাব করেন এবং বলেন, কমিটির অন্য দু’জন সদস্য বিএনপি থেকে আব্দুস সাত্তারই নির্ধারণ করে নেবেন। আব্দুস সাত্তারের নাম প্রস্তাব করার সঙ্গে সঙ্গেই এসএসএফ, এনএসআই ও ডিজিএফআই প্রধানরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বলে জানা গেছে।
দেশের শীর্ষ এই গোয়েন্দা প্রধানরা বলেন, আব্দুস সাত্তারকে এই কমিটিতে রাখা হলে তারা থাকবেন না। আব্দুস সাত্তার সম্পর্কে তাদের একযোগে এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ঘটনায় উপস্থিত অনেকেই অবাক হন। তবে আব্দুস সাত্তারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। বিশেষ করে ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে এ পর্যন্ত আব্দুস সাত্তার ও তার সহযোগিরা যেসব বেপরোয়া অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন তা সচিবালয় ও সরকারি দপ্তরসমুহের কারোই অজানা নয়। এতে বিএনপির ভাবমুর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। এসব তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছেও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কেউ কেউ মনে করছেন, গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছে আব্দুস সাত্তার সম্পর্কে হয়তো আরও ভয়াবহ রকমের তথ্য রয়েছে। এ কারণেই গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের প্রধানরা তারেক রহমানের নিরাপত্তার কাজগুলোতে আব্দুস সাত্তারকে সম্পৃক্ত করতে চাইছেন না।
উল্লেখ্য, দেশের জাতীয় নির্বাচন সুচারূভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরলসভাবে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও এদের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। দেশের সামরিক বাহিনী নির্বাচন চায়, গণতন্ত্র চায়- এটা অতীতে কখনো বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি বিশ্বের অন্যত্রও কোথাও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের এখনকার সামরিক নেতৃত্ব এই নতুন নজির স্থাপন করতে চাইছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
শীর্ষনিউজ