Image description
 

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও স্থায়ী সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতার অভাব। এই দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দশকের পর দশক ধরে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একে অপরকে যেকোনো মূল্যে পরাজিত করার শত্রু হিসেবে দেখে এসেছে। এর ফলে রাজনীতি গঠনমূলক বিতর্ক ও সহযোগিতার পরিবর্তে মুখোমুখি সংঘর্ষ, চরিত্রহনন ও দ্বন্দ্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। রাজনৈতিক সৌজন্যের এই অভাব ধীরে ধীরে সহিংসতার সংস্কৃতিকে স্থায়ী করে তুলেছে, যেখানে শব্দ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, আর কর্মকাণ্ড প্রায়ই বিশৃঙ্খলায় রূপ নিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাহত করেছে এবং রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল করেছে।

 

 

 

জুলাই বিপ্লবের পর এক মুহূর্তের জন্য আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় ঐক্যের জরুরি প্রয়োজন নিয়ে একই ভাষায় কথা বলছিলেন। তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, অতীতের তিক্ত বিভাজনকে পেছনে ফেলে ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করবেন। এই প্রাথমিক সুর সাধারণ মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছিল, যারা দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতার রাজনীতি দেখতে চেয়েছিল, মুখোমুখি সংঘর্ষের নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই প্রতিশ্রুতি এখন দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ঐক্যের ভাষণকে প্রতিস্থাপন করেছে বিভাজন সৃষ্টিকারী এবং উসকানিমূলক বক্তব্য, যেখানে আবারও জাতীয় স্বার্থের ওপরে দলীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া হচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সংযমহীনভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা ও ঐক্যের নাজুক আশাকে উপেক্ষা করে। অনেক বক্তৃতায় রয়েছে বেপরোয়া মন্তব্য, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা, যেখানে দেশের স্থিতিশীলতা বা ভাবমূর্তির প্রতি খুব কমই নজর দেওয়া হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, অনেক নেতা এমন ভাষায় কথা বলছেন, যা সরাসরি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী—কখনো অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, কখনো সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে; আবার কখনো এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা বিদেশি বর্ণনার প্রতিধ্বনি, বিশেষ করে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতি নষ্ট করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বিদেশি এজেন্ডাকে এগিয়ে দেয়।

 

জনগণ এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করছে। মানুষ বোঝে, গণতন্ত্রে মতবিরোধ ও বিতর্ক স্বাভাবিক, তবে এটাও বোঝে যে সীমা থাকা উচিত এবং দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার জন্য একটি যৌথ দায়িত্ব থাকা আবশ্যক। রাজনৈতিক নেতারা যখন সীমাহীন বক্তব্য দেন, তখন তারা শুধু স্বাধীন মতপ্রকাশের চর্চা করছেন না—তারা জনমত গঠন করছেন, জাতির দিকনির্দেশ প্রভাবিত করছেন এবং এমন বিভাজন সৃষ্টি করছেন, যা বহিঃশক্তি দ্বারা কাজে লাগানো যেতে পারে। এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও নিরাপত্তা নষ্ট করার চেষ্টা হতে পারে।

 

রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বীকার করতে হবে, তাদের কথার পরিণতি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের অনেক বাইরে গিয়ে প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক বক্তব্যে শৃঙ্খলার অভাব শুধু জনগণের ঐক্যকে দুর্বল করে না, বরং বাইরের বিশ্বকে এই বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ এখনো গভীরভাবে বিভক্ত ও অস্থিতিশীল। এর ফলে এমন সব শক্তি হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়, যারা আমাদের বিভক্তির সুযোগ নিতে চায়। তাই সচেতন প্রচেষ্টা থাকতে হবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চর্চা করা হবে, সমালোচনা হবে গঠনমূলক এবং কোনো বক্তব্য, তা যতই রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হোক না কেন জাতির মৌলিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করবে না।

 

যদি আমাদের রাজনৈতিক নেতারা এই গুরুদায়িত্ব উপেক্ষা করতে থাকেন, তবে তারা নিজেরা বুঝুন আর না-ই বুঝুন, ধীরে ধীরে এমন এক বিদেশি পরিকল্পনার হাতিয়ারে পরিণত হবেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশকে দুর্বল করে ফেলা—অর্থনৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ও কৌশলগতভাবে। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও ক্ষমতার লোভের কারণে বাইরের শক্তির কবলে পড়েছে। যখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দেশ ছিন্নভিন্ন হয়, তখন শত্রুপক্ষ খুব সহজেই সুযোগ নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে পারে এবং সার্বভৌমত্বকে খণ্ডিত করে দিতে পারে।

 

আমাদেরও ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ একটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যার কারণে বিদেশি স্বার্থান্বেষী শক্তি সবসময়ই এখানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খোঁজে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে বিভক্ত থাকে, যদি তারা অযাচিত বক্তব্য ও কর্মের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে, তবে তারা কার্যত সেই সব বাহ্যিক শক্তির পরিকল্পনাকে সহজ করে দেবে। এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক অপরাধ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমা করবে না।

 

ইতিহাসের শিক্ষা একেবারে স্পষ্ট—যে জাতি সংকটময় মুহূর্তে দলীয় স্বার্থ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, সে জাতিকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতি যে অটুট ঐক্য দেখিয়েছিল, সেটিই ছিল আমাদের বিজয়ের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু আজ যদি সেই ঐক্যের বিপরীতে আমরা বিভাজন, অবিশ্বাস ও সংঘাতকে জায়গা দিই, তবে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা ও মর্যাদা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে।

 

তাই এখনই সময় সব রাজনৈতিক দলের জন্য অন্তত একটি ন্যূনতম আচরণবিধিতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর, যেখানে জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দলীয় অবস্থান সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্যও নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও টিকে থাকার মৌলিক শর্ত। যদি আমরা তা না করি, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস আমাদের নাম উচ্চারণ করবে সতর্কবার্তা হিসেবে, সাফল্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে নয়।

 

যদি জুলাই বিপ্লবের কোনো স্থায়ী অর্থ ও মর্যাদা থাকে, তবে তা শুধু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই বিপ্লবের আসল সাফল্য হবে তখনই যখন তা রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণের গভীরে একটি ইতিবাচক ও টেকসই পরিবর্তন আনবে। আমাদের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন করলেই দেশের ভাগ্য বদলায় না, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের মানসিকতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের আমূল রূপান্তর। যদি এই পরিবর্তন না আসে, তবে জুলাই বিপ্লবও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আরেকটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনায় পরিণত হবে, যা মানুষ মনে রাখবে না ঐক্যের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে, বরং সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও নতুন বিভাজনের জন্ম দেওয়ার কারণে।

 

বাংলাদেশের জনগণ গত কয়েক দশকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে—দুর্নীতি, অবিচার, বিদেশি প্রভাব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তাই তারা এ মুহূর্তে শুধু শাসক বদলের দৃশ্য নয়, একটি নৈতিক ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রতিফলন দেখতে চায়। তারা এমন নেতা চায়, যারা ক্ষমতার লোভে অন্ধ হবে না, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের কাছে জাতীয় স্বার্থকে বলি দেবে না এবং যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে সর্বাগ্রে রাখবে।

 

দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা কোনো সৌজন্য নয়, এটি একটি জাতীয় কর্তব্য। নেতাদের প্রতিটি বক্তব্য শুধু তাৎক্ষণিকভাবে শ্রোতাদের মন জেতার জন্য নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, জনগণের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সুরক্ষিত রাখার জন্য হতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী মন্তব্য শুধু প্রতিপক্ষকে আঘাত করে না, বরং গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যা আমাদের শত্রুপক্ষের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করে।

 

আজকের পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এতটাই বড় যে এর চেয়ে কম কিছু মেনে নেওয়া মানে হবে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করা। যদি আমরা সত্যিই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই নিজেদের ভেতরে আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং এমন এক আচরণবিধি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে দেশের স্বার্থই হবে সর্বোচ্চ নীতি। অন্যথায় এই বিপ্লবের স্মৃতি থাকবে শুধুই হারানো সুযোগ, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ও জাতীয় বিভাজনের নতুন অধ্যায় হিসেবে।

 

 

ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক