Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে শুধু রাজধানীতেই ৫টি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গুলিস্তানের কেন্দ্রীয় ও ধানমন্ডিতে সভাপতির কার্যালয়ে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ কার্যালয়েও আক্রমণ করা হয়েছে। একাধিকবার ভাঙচুর হয়েছে জাতীয় পার্টির তোপখানা কার্যালয়ে। এমনকি হামলার শিকার নেতাকর্মীদের উল্টো পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের হামলা আসলে কীসের ইঙ্গিত? এতে ভবিষ্যতে বিরাজনীতিকরণের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না তো? রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সবারই মত প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার অধিকার আছে। কিন্তু কোনও দলের কর্মসূচিতে বাধা বা দলীয় কার্যালয়ে হামলা করা সম্পূর্ণ গণতন্ত্রের পরিপন্থি। এটি ভবিষ্যতে সুস্থধারার রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সে প্রশ্ন সামনে আসছে। তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘মবের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বৈধ প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার অধিকার আছে। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলাকে সমর্থন করা যায় না। এমনটি চলতে থাকলে এটি ভবিষ্যতে সুস্থধারার রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত।’’ তার মতে, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।

দুই বছরে দুই দফায় আক্রান্ত সিপিবি কার্যালয়  

 

গত দুই বছরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির কার্যালয়ে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথমবার পল্টনের মুক্তি ভবনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়।এ ঘটনার জন্য তখন বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনকে দায়ী করা হয়।

সর্বশেষ দ্বিতীয়বার সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে দ্বিতীয় দফা হামলার পর দলটির সহযোগী সংগঠন যুব ইউনিয়নের দুই নেতা ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে গভীর রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সিপিবির অভিযোগ. এ হামলার নেতৃত্ব দেন পল্টন থানার বিএনপির নেতাকর্মীরা। যদিও তা অস্বীকার করে বিএনপি। আর পুলিশের দাবি, ভেতর থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল।

মূলত সুনামগঞ্জে নারী বাউল শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ওইদিন বিকালে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। সে অনুযায়ী ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় জড়ো হন তারা। সেখান থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাত ৯টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনা থেকেই পরিস্থিতির সূত্রপাত।

জাসদ কার্যালয় অবরুদ্ধ করে ২৮৯ জনকে পুলিশে সোপর্দ

চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভা করছিল জাসদ। খবর পেয়ে প্রথমে কতিপয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন। তারা আরও দাবি করেন, ভেতর থেকে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এ সময় কার্যালয়ের কলাপসিবল গেট লাগিয়ে নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।

অবশ্য এ ঘটনার জন্য বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করে জাসদ। এ সময় অফিসের থেকে জাসদের ২৮৯ জন নেতাকে আটক করে পুলিশ। পরে ২৭ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে বাকিদের সেদিন রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আর আইনি প্রক্রিয়ায় সেই ২৭ জনের সবাই জামিনে মুক্তি পান।

একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল জাপা

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজধানীর তোপখানা রোডে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদের প্রতিকৃতিতে ভাঙচুর চালানো হয়। সে সময় বারবার সেখানে হামলার জন্য নুরুল হক নূরের গণঅধিকার পরিষদকে দায়ী করেন জাতীয় পার্টির নেতারা। কয়েক দিন পরপরই সেখানে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। গত ১২ অক্টোবর দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উত্তরার বাসায় হামলার ঘটনাও ঘটে। যদিও এতে কারা জড়িত, তার প্রমাণ মেলেনি।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই কার্যালয়ের কী অবস্থা?

চব্বিশের ৫ আগস্ট বিকাল থেকেই দফায় দফায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয় গুলিস্তানে অবস্থিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। রেহাই পায়নি দলীয় সভাপতির ধানমন্ডি কার্যালয়ও। এই দুই স্থাপনায় একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণ দেওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে  ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে ক্রেন ও খননযন্ত্র দিয়ে বাড়িটির বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়। সম্প্রতি সরেজমিন গুলিস্তানে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির একাংশ ভস্মীভূত। আরেক অংশে ভবঘুরে ও বহিরাগতরা অবস্থান করছে। ভেতরে মলমূত্রের কারণে ঘিঞ্জি পরিবেশ। সামনে ঝুলছে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কয়েকটি সংগঠনের ব্যানার-ফেস্টুন।

রেহাই পায়নি বাংলাদেশ জাসদও

গত ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মুত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তোপখানা রোডে বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। এতে বেশ কিছু তরুণ দলটিকে ফ্যাসিস্টের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করে হামলার চেষ্টা চালায়। যদিও দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান তখন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, তারা ২০১৮ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গ ত্যাগ করেন। তারপরও একটি পক্ষ তাদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করছে। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশ বা ভ্ন্নিমতের দলের কেউ হামলা করা গণতন্ত্রের পরিপন্থি বলে জানান তিনি।

বিরাজনীতিকরণের পাঁয়তারা?

যেকোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নেতাকর্মীদের স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনার একমাত্র আশ্রয়স্থল। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেখানে যখন কেউ হামলা করে, তখন দেশের মত প্রকাশের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার শামিল। এমনটি মনে করেন রাজনীতিকরা। বিষয়টিকে অনেকে বিরাজনীতিকরণের পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন। কারণ এমনটি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে অন্য দলের নেতাকর্মী বা পুলিশের হামলা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ে ভিন্নমতকে দলনের চেষ্টা এক ধরনের দ্বি-চারিতা। এর মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। পরোক্ষভাবে এটি বিরাজনীতিকরণের পাঁয়তারা কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার পাশাপাশি এই সময়ে হকার উচ্ছেদ ও সড়কে রিকশাচালকদের মারধরের বিষয়টিও উদ্বেগজনক।’’

ভিন্ন কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলাকেই সমর্থন করা যায় না।’’

যদিও বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনায় বিরাজনীতিকরণের পাঁয়তারা বলে মনে করি না। এটি ঠিক যেকোনও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হলে ভিন্ন শক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে।’’

লাভবান হতে পারে কারা?

রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে প্রতিপক্ষের হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে দেশে অগণতান্ত্রিক বা উগ্রবাদী শক্তির উত্থান হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। এর সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের, যার সুযোগ নিতে পারে তৃতীয়পক্ষ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের অবস্থান কারও গণতান্ত্রিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন না করার পক্ষে। এখন কে কার কার্যালয়ে হামলা করেছে, সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের।’’ তিনি বলেন, ‘‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়ে আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে আমাদের কার্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন কেউ প্রতিবাদ করেনি। আমরা মনে করি, সেই ধারাবাহিকতায় এখনও হামলা হচ্ছে। আমরা কখনও কারও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাই না। কারণ এমনটি করলে অগণতান্ত্রিক শক্তি লাভবান হতে পারে।’’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা সব সময়ই গণতন্ত্রের পক্ষে। আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণেতন্ত্রের প্রবক্তা। তাই আমাদের পক্ষ থেকে কারও রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার নজির নেই।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে উগ্রবাদের উত্থান হতে পারে।’