কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন রোধে ‘সুরক্ষা কমিটি’ গঠনের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও তা মূলত ‘মৌখিকভাবে বলা’তেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। স্বীকৃতি বাতিলের হুঁশিয়ারির পরও কোনো প্রতিষ্ঠানে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি নিশ্চিত করা যায়নি।
সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীর একটি ঘটনা ঘিরে মাদ্রাসায় শিশুকে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বারবার আলোচনা-সমালোচনা হলেও পরে তা থেমে যায়। তবে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে, যার মধ্যে অল্পই ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করেছে স্ট্রিম। এতে দেখা গেছে, চলতি বছর কওমি মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অন্তত ৪০টি অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে একাধিক শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সব কটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ১৯ অক্টোবর ওই মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে এ ঘটনা ঘটে বলে পরিবারকে জানায় প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রী। পরে ২১ অক্টোবর দুপুরে মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন শিশুটির স্বজনেরা। একপর্যায়ে ওই শিক্ষককে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এতে ওই মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
অন্যদিকে মাদ্রাসায় ঢুকে অভিযুক্ত শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর, ভাঙচুর, ১৭ লাখ টাকা ও ৫টি মুঠোফোন লুটের অভিযোগ করেছেন মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন। এসব অভিযোগ এনে থানায় পৃথক অভিযোগও দিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনার পর শাহজালাল রুমিকে বিভিন্ন জায়গা থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হুমকিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন শাহজালাল। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় স্ট্রিম। পরে কথা হয় তার ভাগনে ইসমাইল হোসেন রানার সঙ্গে।
স্ট্রিমকে রানা বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে মামাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকে লাইভ করে তাকে “দশবার” হত্যার কথা বলা হচ্ছে। এবং মামার ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিও হ্যাক করা হয়েছে। মামা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ জন্য এখন কারও সঙ্গে কথাও বলছেন না।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা পৃথক দুটি মামলা গ্রহণ করেছি। মামলা দুটি বর্তমানে তদন্তাধীন আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শাহজালাল রুমিকে যদি কেউ কোনো হুমকি দেয়, আমরা যদি অভিযোগ পাই তাহলে ব্যবস্থা নেব।’
মামলা তুলে নিতে হুমকি
চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল নরসিংদীর রায়পুরা থানার ‘জান্নাতুল বুশরা বালিকা মাদ্রাসার’ ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিমের (প্রধান শিক্ষক) বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম জুনায়েদ আহমদ। ঘটনা জানাজানি হলে তা ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে চাপ দেওয়া হয় ভুক্তভোগীর পরিবারকে। মামলা না করতে দেখানো হয় ভয়ভীতি।
পরে ২৬ এপ্রিল দুপুরে রায়পুরা থানায় মামলা দায়ের করেন ওই শিক্ষার্থীর মা পারুল বেগম। ২৭ তারিখ রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যোগাযোগ করা হলে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘মামলা দায়েরের পর ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছি। এই মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন আছে।’
এদিকে এখনও মামলা তুলে নিতে বাদীপক্ষকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আবুল কালাম। তিনি জানান, ঢাকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন তিনি। তার ছেলে এবং মেয়ে ওই মাদ্রাসায় আবাসিক শিক্ষার্থী ছিল। ধর্ষণের খবর পেয়ে তিনি নরসিংদী যান। শুরুতে তাকে মামলা না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এখন মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্ট্রিমকে আবুল কালাম বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। মামলার খরচ চালানো আমার জন্য কঠিন। তবুও আমি মামলা লড়ে যাচ্ছি। কিন্তু আসামিপক্ষের লোকজন আমাদের নিয়মিত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আমরা মামলা উঠিয়ে না নিলে আমাদের বিভিন্ন ক্ষতি হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে।’
আবুল কালাম আরও বলেন, ‘আমার ছেলের ক্ষতির কথা চিন্তা করে তাদের ঢাকায় নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার অল্প টাকার চাকরিতে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করাই কঠিন, সেখানে পড়াশোনা কীভাবে করাব। আমি সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে মাদ্রাসায় দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ তাদের পড়ালেখাই বন্ধ হয়ে গেছে।’
সাভারের মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসা। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটিতে সাত বছরের এক শিশুকে ভর্তি করেন তার বাবা। তবে ভর্তির ২২ দিন না যেতেই শিশুটিকে বলাৎকার করে বয়সে বড় তার এক সহপাঠী। সেই খবর জেনে যায় আরেক শিক্ষার্থী। পরে বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে সেই শিক্ষার্থীও ধর্ষণ করে। এভাবে ক্রমান্বয়ে শিশুটিকে নির্যাতন করে ওই মাদ্রাসারই আরও ৪ শিক্ষার্থী।
সহপাঠীদের কাছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এক শিক্ষকের দ্বারস্থ হয় শিশুটি। কিন্তু ওই শিক্ষকও শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। একে একে শিশুটিকে ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকারের অভিযোগ আনেন তার বাবা।
এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন ওই শিশুর বাবা। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণ করে সাভার মডেল থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। গত ২৬ আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলায় মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী ও ৪ শিক্ষককে আসামি করা হয়েছে। শিক্ষকদের একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং চারজনের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে জানান, গ্রেপ্তার ৫ জনের মধ্যে ২ জন জামিনে আছেন। অন্য আসামিরা পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী ওই শিশুর বাবার অভিযোগ, মামলার কয়েক মাস চলে গেলেও বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। এছাড়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ও বিভিন্ন হুমকি দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, ‘তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে—এমন ঘটনা আমরা শুনেছি। আমরা বলেছি, কোনো হুমকি দেওয়া হলে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
কীভাবে চলে কওমি মাদ্রাসা
বাংলাদেশে প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষার প্রধান দুই ধারা হলো কওমি ও আলিয়া। কওমি ধারার শিক্ষাব্যবস্থাটি মূলত দেওবন্দি মাদ্রাসা নামে পরিচিত। ভারতের প্রাচীন মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাস ও মতাদর্শে এসব মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। মাদ্রাসাগুলোতে কোরআন, হাদিস ও ফিকহ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হয়।
কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরআন, হাদিস ও ফিকহের পাশাপাশি এসব মাদ্রাসায় পড়ানো হয় বাংলা, ইংরেজি ও গণিত। তবে কওমি মাদ্রাসায় একাধিক সিলেবাস রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা বা এই ধারার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আসলে কত, তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। কওমি, কওমির কয়েকটি শ্রেণি, মক্তব, ক্যাডেট বা প্রাইভেট মিলিয়ে সারা দেশে মাদ্রাসা আছে ৪০ হাজারের বেশি।
পরিচালনায় ৬ বোর্ড
২০১৮ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান দিয়ে আইন করে সরকার। এই সনদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ‘আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ (হাইয়াতুল উলয়া), যা চূড়ান্ত পরীক্ষা পরিচালনা করে। এই বোর্ডের অধীনে সরকার স্বীকৃত ছয়টি শিক্ষাবোর্ড রয়েছে। বোর্ডগুলো হলো বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক), বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, তানযীমূল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ ও জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ।
এর মধ্যে বেফাক দেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন শিক্ষা বোর্ড। বেফাকের তথ্য অনুযায়ী, বোর্ডটির অধীনে বর্তমানে ৩৩ হাজারের বেশি মাদ্রাসা নিবন্ধিত আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী আছে প্রায় ৭০ লাখ। অন্যান্য বোর্ডের আওতায় রয়েছে আরও প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠান।
বেফাকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে এই বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩,৫৪,০৩৬ জন শিক্ষার্থী। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২,২৫,৬৩১ জন। চার বছরের ব্যবধানে যা প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে প্রতি বছর শিক্ষার্থী বাড়লেও শিশু সুরক্ষায় বোর্ডগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোর্ডগুলো পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া কার্যকর কাজ করে না। তবে বোর্ডের দাবি, পরিদর্শক দল মাদ্রাসা পরিদর্শন করে। এছাড়া আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন কমিটি, নিয়মিত সভা ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
গত আগস্টে সাভারের একটি মাদ্রাসায় এক শিশুকে টানা বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। এতে সারা দেশে সমালোচনা শুরু হলে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে হাইয়াতুল উলয়া।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান রোধ, ইসলাহি কার্যক্রম জোরদার ও শিক্ষার্থী-সুরক্ষা কমিটি কার্যকরের কথা উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিটি মাদ্রাসায় ‘সুরক্ষা কমিটি’ গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখতে হবে। যেকোনো অভিযোগ অবশ্যই কমিটির কাছে দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে। কমিটি না থাকা বা নিষ্ক্রিয় থাকা প্রমাণিত হলে তা ইলহাক (অধিভুক্তি বা নিবন্ধন ) স্থগিত বা বাতিলের কারণ হতে পারে।
এদিকে সব মাদ্রাসায় কমিটি বাস্তবায়নে ‘মৌখিকভাবে বলা’ ছাড়া আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর প্রমাণ মেলে বেফাকের প্রধান পরিচালক ও হাইয়াতুল উলয়ার সদস্য মাওলানা উবাদুর রহমান খান নদভীর বক্তব্যে।
মাওলানা উবাদুর রহমান খান নদভী স্ট্রিমকে বলেন, ‘অনেক মাদ্রাসায় আগে থেকেই এমন কমিটি বা সেল ছিল। বাকি পরিস্থিতির কারণে আমরা একটা সেল গঠন করতে বলেছি। যাদের এই কমিটি নাই তারা এই আইডিয়াটা নিচ্ছে।’
হাইয়াতুল উলয়া প্রজ্ঞাপন জারির পরও যেসব মাদ্রাসায় কমিটি গঠন করা হয়নি তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না—এমন প্রশ্নে নদভী বলেন, ‘ব্যবস্থা গ্রহণ বলতে আমরা মাদ্রাসাগুলোকে বলছি। তারা যখন ছাত্র নিবন্ধন করতে আসে তখন তাদেরকে আবার বলে দেওয়া হয়। টিচার্স ট্রেনিংয়েও বলা হয়। তবে এসব ব্যাপারে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।’
নেই সরকারি নজরদারি
বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। এসব মাদ্রাসা চলে মূলত জনসাধারণের টাকায়। তবে এসব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে দুঃখজনক ও লজ্জাকর বলে মন্তব্য করেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
গত শনিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী। সম্মেলন শেষে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বলাৎকার, চুমু দেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে কি না এবং এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না?
জবাবে ধর্মমন্ত্রী বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাকর এবং আশা করি ভবিষ্যতে এ জিনিসটা ঘটবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সে ব্যাপারে যা করা প্রয়োজন, তাই করব।’
ধর্মমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না জানতে চায় স্ট্রিম। যোগাযোগ করা হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন অধিশাখা-২) সৈয়দ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা সরকারি নিবন্ধনের আওতায় নাই। ফলে যেটা সরকারি না, সেখানে সরকার নজরদারি করবে কীভাবে?’
এ বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। পলিসি মেকারদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
অন্যদিকে সরকারি সনদ থাকলেও নজরদারি চান না কওমি সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকার বা তৃতীয় কোনো পক্ষের নজরদারিতে এলে মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষতির মুখে পড়বে।
মাওলানা উবাদুর রহমান খান নদভী স্ট্রিমকে বলেন, ‘গত দেড়শ বছরে বাংলাদেশের যেসব মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে, সেখানে সরকারি নজরদারি বা সরকারের নিয়ন্ত্রণে গেলে সুবিধার চেয়ে সমস্যা বেশি হতে পারে। মাদ্রাসায় তখন ঘুষ ঢুকবে। স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য জায়গার মতো দুষ্ট লোকেরা আসবে, দুর্নীতি ও জালিয়াতি হবে। এসব এড়ানোর জন্যই দ্বীনি শিক্ষাকে রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় নজরদারিমুক্ত রাখা হয়েছে।’
হেফাজতে ইসলামের বিবৃতি
টঙ্গীর ঘটনা সামনে আসার পর গতকাল (২৪ অক্টোবর) সাম্প্রতিক বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ (হেফাজত)। যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো অনৈতিক আচরণ বা শিশু নিপীড়ন যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আইন হাতে তুলে নেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়। যেকোনো ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করাটা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিশু যৌন নির্যাতনের সমস্যাটি পুরনো অভ্যন্তরীণ সামাজিক সমস্যা। এটি শুধু কোনো একটি কমিউনিটিকেন্দ্রিক সমস্যা নয়; স্কুল, মাদ্রাসা এমনকি অন্যান্য পরিসরেও সমস্যাটি কমবেশি বিদ্যমান। নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শিক্ষার্থী নিপীড়ন রোধ করতে এ বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দেশের ৬টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড এবং এর আওতাভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এতে প্রতিটি মাদ্রাসায় ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি’ গঠন বা সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে হেফাজতের মহাসচিব ও হাইয়াতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান আল্লামা সাজেদুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। এই সমস্ত বিষয়গুলো মনিটর করার জন্য আমরা হাইয়া থেকে একটা পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করেছি। মাদ্রাসাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছি। যদি কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’