Image description

কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা রাখা হয়েছিল; কিন্তু ভাগ্য ভালো, বিস্ফোরণের আগেই তা নিষ্ক্রিয় করা গেছে। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ষড়যন্ত্রের গভীরতাটা কি বুঝতে পারছেন? এটা শুধু আপনাকে ডিফেইম করার জন্য নয়, এটা দেশের মানুষের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে একটি পুরোপুরি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনা। এই বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে বিস্ফোরণ ঘটত আমাদের দেশের চিহ্নিত কিছু গণমাধ্যম ও কথিত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করত—আপনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ। আপনার সময় লালনের আখড়ায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের সংখ্যা বেশি হলে তো কথাই নেই। পোয়াবারো অবস্থা। টেনে আনা হতো বিগত সময়ের গ্রেনেড হামলার ঘটনা। চেষ্টা করা হতো সেই ঘটনার সঙ্গে আপনার যোগসাজশের যৌক্তিকতা প্রমাণের। খুব অল্প কথায় সারলাম, বোঝা গেলে এতটুকুতেই বোঝা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
ষড়যন্ত্র প্রতি ক্ষেত্রেই। বিশেষ করে সার ও বিদ্যুতের সাময়িক সংকটকে সামনে রেখে চলছে ষড়যন্ত্র। এখন পর্যন্ত সার সংকটকে সামাল দেওয়া গেছে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। কিন্তু তারপরও গণমাধ্যমে এসেছে কিছু কিছু জায়গায় সংকটের কথা। কুড়িগ্রামের সার লুট হয়েছে। সার নিয়ে কথা রয়ে গেছে বিগত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে। অবশ্য তখনকার সংকটের কথা অস্বীকারের জো নেই। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর এটুকু বোঝাতে যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলেই সার সংকটের ঘটনা ঘটে।

এ ব্যাপারে আমার নিজের জেলা শেরপুরের কেস স্টাডি বলি। এখান থেকেই ষড়যন্ত্রের ধারণাটা পাওয়া যাবে। শেরপুর সদর উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন ছাত্রলীগের এক নেতা। তিনি এই মৌসুমে সার চোরাকারবারের অজুহাতে স্থানীয় ১৪ সার ডিলারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই মামলা দায়েরের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে জেলার সব সার ডিলার আন্দোলনে যায় এবং স্ট্রাইক করে, যাতে জেলায় অবধারিতভাবে সার সংকটের সৃষ্টি হয়। এটা হওয়া স্বাভাবিক ছিল, যেহেতু সার ডিলারদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি বিগত আওয়ামী সরকারের অনুগ্রহভাজন ছিলেন। সুতরাং বিদ্রোহের ঘটনা ঘটা অসম্ভব ছিল না। জেলায় শুরু হতো সারের তীব্র সংকট। আর সংকটের ধারাবাহিকতা ছড়িয়ে যেত সারা দেশে।

সারা দেশের সার ডিলাররা এই ঘটনার কারণে আন্দোলনে যেত। ভাগ্য ভালো, স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার কারিশমায় শেরপুরের ঘটনাটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা সারা দেশে আর ঘটবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া কি সম্ভব? সম্ভব নয়। সুতরাং সতর্ক থাকতে হবে, যাতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর থাকে এবং এসব রোখা যায়।

বিদ্যুৎ নিয়ে একই ঘটনা। বিদ্যুতের ষড়যন্ত্র আরো ব্যাপক, যেখানে জড়িত কথিত বন্ধুদেশের কুশীলবরাও। আদানি-বিষয়ক ঘটনা তো সবারই জানা। তারপর রয়েছে জ্বালানির বিষয়। জ্বালানি নিয়েও চলছে ষড়যন্ত্র। সব ষড়যন্ত্রের মূলেই হলো জুলাই-পরবর্তী সরকারকে যেন কালিমালিপ্ত করা যায়; যাতে দেখানো যায়, আগের সরকারই ভালো ছিল, সেসময় কোনো সংকট ছিল না। মূলকথা হলো জুলাই রেভল্যুশন যে ভুল ছিল, তা জানান দেওয়া।

সঙ্গে বিরোধী দলকেও বলি, শুধু রাজনৈতিক ফায়দার ব্যাপারটি কিন্তু জুলাইকে কলঙ্কিত করবে। আর জুলাই ব্যর্থ হওয়া মানে বাংলাদেশের ব্যর্থ হওয়া। কেন বাংলাদেশের ব্যর্থ হওয়া, সে সম্পর্কে আলাপে যাই। প্রথমত, জুলাই ব্যর্থ হলে দীর্ঘদিনের জন্য বাংলাদেশে কায়েম হবে জমিদারতন্ত্র আর সাধারণ মানুষ হবে রায়ত-প্রজা। গত দেড় দশকে যে জুলুমতন্ত্র গড়ে উঠেছিল, তার থেকে বেশি জাহেলিয়াতের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। সঙ্গে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যাবে। জুলাই রেভল্যুশনের মতো একটি রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ব্যর্থ হলে কেউ আর সাহস পাবে না প্রতিরোধ গড়ে তোলার। এটা কোনো কঠিন অঙ্ক নয়, সোজা-সরল হিসাব। এটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি বোঝেন বলেই মনে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী জানান দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আগের সরকারের সুবিধাভোগীরা রয়ে গেছে। তাছাড়া অতীতের অপরিকল্পিত পরিকল্পনার ফলে দেশের জ্বালানি খাত ধ্বংসের মুখে পড়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর এসব কথায় মনে হয়েছে তিনি বিষয়টি বুঝেছেন। কিন্তু শুধু বুঝলে তো চলবে না, কাজেও দেখাতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের বেছে ফেলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি পদক্ষেপ সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে দুটি পদক্ষেপ সারা দেশের মানুষকে আশান্বিত করেছে। প্রথমত, রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপিকে পদত্যাগ করানো; এবং দ্বিতীয়ত, যখন লিখছি, তার কিছুক্ষণ আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন। একজন মন্ত্রী পিস্তল হাতে দৌড়াদৌড়ি করছেন—এমন দৃশ্যটিই দৃষ্টিকটু এবং তা স্বাভাবিক সেন্সেই। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয় এবং দেওয়ার সময় শর্ত থাকে, এটা ভীতি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং প্রতিমন্ত্রীর ঘটনাটি আইনের ব্যত্যয় বলেই প্রতীয়মান হয়। এ ঘটনা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে খ্যাত কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের, তথা সাবের ভাইয়ের সামাজিক মাধ্যমের লেখাটি তুলে দিই।

তিনি লিখলেন, ‘ইশরাক সাহেবের জালে ধরা পড়ল গুটিকয়েক, বাকিরা পালাল। ধরা পড়াদের মধ্যে সবচেয়ে হ্যাংলা যেটা, সেটাকে সামনে আনা হলো—‘অই, তুই কে রে?’

‘আমি স্যার গরিব।’

‘নেশা করিস?’

‘সেজন্যই তো ধরলেন। নাকি?’

‘গরিবই যদি হোস, নেশা করিস কেন?’

‘স্যার, আমি যে গরিব, এইটা ভুলে থাকার জন্য নেশা করি।’

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি এমন বাবা-মায়ের সন্তান, যারা এদেশের মানুষের বাতিঘর। বিশেষ করে জুলাই রেভল্যুশনে অংশগ্রহণকারীদের কাছে আন্দোলনের সিম্বলই ছিল আপনার মা বেগম খালেদা জিয়ার অদম্য সাহস, দেশপ্রেম ও আপসহীনতা। জুলাই রেভল্যুশন মানে এদেশের পুনর্জন্ম। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ যেন কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে ব্যর্থ না হয়, যেন বাইরের শত্রুর সঙ্গে ঘরের শত্রু বিভীষণদের প্রতিও আপনার নজর থাকে। লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা পাওয়ার মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে। আর সাবের ভাই যেন আর না লেখেন—‘আমি যে গরিব, এইটা ভুলে থাকার জন্য নেশা করি।’

লেখক: কাকন রেজা

সাংবাদিক ও কলামিস্ট