সুলতানা স্বাতী
মোবাইল ফোন হারানোর পর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে থানায় গিয়েছিলাম। সেখানে একজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি হতাশার সঙ্গে বললেন, ছিনতাই শুধু সংঘবদ্ধ অপরাধীরাই করে না, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাও করে। অনেকেই গ্রেফতার হন। কিন্তু বেশি দিন বা বেশিক্ষণ তাদের থানায় রাখা হয় না। আদালতে পাঠানো হয়। দ্রুতই তারা জামিন পায়। এরপর তারা এসে পুলিশেরই টুঁটি চেপে ধরে!
দেশের বর্তমান আইন নিয়ে তার এই হতাশা আমাদের ঠিক কী বার্তা দিচ্ছে?
আবার সেদিন খবরে দেখলাম, খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। শিরোনাম দেখে আকাশ থেকে পড়লাম! মানে কী? পুলিশই যদি রাতে একা বাইরে যেতে ভয় পায়, তো সাধারণ মানুষ কী করবে?
পত্রিকায় ঘটনার বিবরণ পড়ে যা বুঝলাম—এক পুলিশ কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিলেন। ছিনতাইকারীর চাপাতির আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। এরপরই ওই এলাকায় এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মানে বুঝলাম না। পুলিশের এক কর্মকর্তাকে ছিনতাইকারীরা আহত করেছে? কী হওয়া উচিত ছিল? ওই বিভাগের সব পুলিশের আগে ওই ছিনতাইকারীদের গ্রেফতারে তৎপর হওয়া দরকার ছিল না? আগে শুনতাম পুলিশে পুলিশে এক জাত। অর্থাৎ একজন পুলিশকে যদি কেউ আহত করে বা পুলিশের কেউ একজন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সব পুলিশ একজোট হয়ে যায়!
আর এখন? পুলিশই ভয় পাচ্ছে? নাকি পুলিশকে ভয় পাওয়ানো হচ্ছে? এই পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করবে কী করে? আর সাধারণ জনগণকেই-বা রক্ষা করবে কী করে? রাতে একজন পুলিশ বাইরে যেতে ভয় পেলে সাধারণ মানুষ কী করবে? জরুরি প্রয়োজনেও তারা একা বের হতে চাইবে না! তাই নয় কি?
পুলিশই যদি একা চলাচল করতে নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে একজন নারী বা তাজমিনের মতো পনেরো-ষোলো বছরের কিশোরীরা রাস্তায় বের হবে কীভাবে? তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? দায়িত্ব যাদের, তারাই যদি অপরাধীদের হামলার ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে নাগরিকের মনে নিরাপত্তার বিশ্বাস তৈরি হবে কীভাবে? সে কারণেই কি দেশে অপরাধের হার বেড়েই চলছে?
তাজমিনের হত্যাকারী সিএনজি চালক সুমন ধরা পড়েছে। খবরে দেখলাম, সে বেশ স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তার কোনও অপরাধবোধ বা অনুশোচনাও নেই। কেন?
কারণ সে জানে তার বিচার হবে না। ধরা পড়ার পর সে কিছু দিন জেলে থাকবে। তার বিরুদ্ধে মামলা চলবে। চলতেই থাকবে। একসময় হয়তো সে জামিনও পাবে। কিছু দিন পর পর তাকে আদালতে হাজিরা দিলেই হলো। চিন্তা কী? এরপর সে আবারও একই কাজ করবে। ধরা না পড়লে তাকে আর পায় কে। আর ধরা পড়লেও অসুবিধা নাই। ফাঁসি তো আর হচ্ছে না। যদি বিচারের রায়ে তার ফাঁসি হয়ও, তবু চিন্তা নাই। সেটা কার্যকর হবে না। বা কার্যকর হতে হতে সে আরও দুই যুগ বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকবে।
অথচ মনোবিজ্ঞান বলে, অপরাধের পর অপরাধীর শাস্তি না হলে বা বিচার দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীর মধ্যে ধরা না পড়ার আত্মবিশ্বাস, শাস্তির ভয় কমে যাওয়া এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই বিচারহীনতার প্রভাব শুধু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গুরুতর অপরাধের মামলাও যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, সাক্ষীরা যদি আদালতে আসতে আসতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, ভুক্তভোগী ও তার পরিবার যদি অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে, তাহলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আর আস্থা থাকে না।
সাধারণ মানুষও মনে করে যে আইন তাদের রক্ষা করতে পারবে না। এর ফলে অপরাধের শিকার হয়েও অনেকে অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে অপরাধ শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাজমিন হত্যার বিচার কতদিনে শেষ হবে? তদন্ত কতটা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হবে? অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত হবে তো? নাকি এই পরিবারকেও বছরের পর বছর আদালতের দরজায় ঘুরতে হবে? তা আমরা জানি না। তবে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করতে জানি। প্রশ্ন তোলার অধিকারও আমাদের আছে।
কঠোর শাস্তি ও তা কার্যকর করাই অপরাধ বন্ধ করার একমাত্র উপায়। তবে বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। অপরাধী যদি মনে করে, সে সহজে ধরা পড়বে না, তদন্ত এড়িয়ে যেতে পারবে, কিংবা বিচার দীর্ঘায়িত হবে, তাহলে শুধু কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেই হবে না। অপরাধ শনাক্ত করা, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়াতে হবে। কারণ অপরাধীর মনে আইনের ভয় তৈরি হয় তখনই, যখন শাস্তি কার্যকর হয়।
তাজমিনের জন্য ন্যায়বিচার চাই। কিন্তু তার সঙ্গে চাই এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধী গ্রেফতারের পর তদন্ত ও বিচার থেমে থাকবে না, যেখানে পুলিশ ভয়হীনভাবে কাজ করতে পারবেন; যেখানে নারী ও শিশুদেরও নিরাপদ চলাচলের অধিকার থাকবে।
বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাজমিনের মৃত্যু যেন আরেকটি দীর্ঘ বিচারিক অপেক্ষার গল্প না হয়ে ওঠে।
লেখক: সাইকোলজিস্ট