Image description

মো. এমদাদুল হক

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতিকে শুধু ‘ভারতঘেঁষা’, ‘চীনবিরোধী’ কিংবা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে ব্যাখ্যা করলে পরিবর্তনের আসল প্রকৃতি ধরা পড়ে না। কারণ ভারতকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা, চীনের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ, ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা কিংবা সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা—এসব ট্রাম্পের একার উদ্ভাবন নয়। জর্জ ডব্লিউ বুশ থেকে বারাক ওবামা, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন এবং জো বাইডেন—সব প্রশাসনই বিভিন্ন মাত্রায় এই ধারাগুলো বহন করেছে।

 

দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্যকে এখন আরও স্পষ্টভাবে শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, অস্ত্র ক্রয়, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ভাষা কূটনীতি থেকে সরে যায়নি; বরং কূটনীতির ভেতর অর্থনৈতিক দর-কষাকষির ওজন বেড়েছে। হোয়াইট হাউসের ‘আমেরিকা ফার্স্ট ট্রেড পলিসি’ বাণিজ্যনীতিকে সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্পক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই সূত্র ধরেই ট্রাম্প নীতিকে বোঝা বেশি কার্যকর।

 

এই ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তন আলাদা করা জরুরি, কারণ ট্রাম্পকে পুরোপুরি ব্যতিক্রমী দেখালে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়। বাইডেন প্রশাসনও ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রধান অংশীদার, কোয়াডকে কার্যকর কাঠামো এবং চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছিল। পার্থক্য হলো, বাইডেন আমলে এই লক্ষ্যগুলোকে জোট, অংশীদার প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগিতা, গণতন্ত্র ও ‘নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা’র ভাষায় প্যাকেজ করা হতো; ট্রাম্প একই লক্ষ্যকে দ্বিপক্ষীয় বিনিময়, বাজারে প্রবেশ এবং দৃশ্যমান প্রতিদানের ভাষায় অনুবাদ করেন। তাই নীতিগত পরিবর্তনকে ‘উদ্দেশ্যের বিপ্লব’ না বলে ‘উপকরণের পুনর্বিন্যাস’ বলা বেশি নির্ভুল। এই পুনর্বিন্যাসের প্রভাব গভীর: আগে কোনো দেশের কৌশলগত গুরুত্ব তাকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় এনে দিতে পারত; এখন সেই গুরুত্বই কখনো বেশি প্রতিদান দাবি করার যুক্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ অংশীদার যত গুরুত্বপূর্ণ, তার কাছ থেকে বাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি বা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে তত বেশি প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। এটাই ট্রাম্পীয় লেনদেনবাদকে সাধারণ বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাদা করে।

 

প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের মতো প্রধানত আফগানিস্তান-পাকিস্তান নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দেখে না। ২০০১-এর পর দীর্ঘ সময় ওয়াশিংটনের কাছে অঞ্চলটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল আফগান যুদ্ধ, আল-কায়েদা, তালেবান, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের পর কৌশলগত মানচিত্র বদলে গেছে। এখন ভারত, ভারত মহাসাগর, চীন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা একসঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

এই পরিবর্তনকে কেবল ‘ইন্দো-প্যাসিফিক মোড়’ বলা যথেষ্ট নয়। আসলে দক্ষিণ এশিয়ার মূল্য এখন অঞ্চলটির নিজস্ব সংঘাতের চেয়ে বৃহত্তর মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতায় তার অবস্থানের ওপর বেশি নির্ভর করছে। এই কারণেই বন্দর, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উৎপাদনশৃঙ্খলও পররাষ্ট্রনীতির বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের ‘আমেরিকা ফার্স্ট ইনভেস্টমেন্ট পলিসি’ চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ-নির্ভরতার প্রশ্নকে নিরাপত্তার ভাষায় বর্ণনা করে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা শুধু কে কার মিত্র—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; কে কার অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার ভিত তৈরি করছে—সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

দ্বিতীয়ত, ভারতকে নিয়ে ট্রাম্প নীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য হচ্ছে—কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা এবং অর্থনৈতিক চাপ একই সঙ্গে চলতে পারে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির যৌথ বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা, সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতাকে একই প্যাকেজে রাখা হয়; সেখানে সম্পর্ককে ‘ফলাফলনির্ভর’ করার ভাষাও ছিল। তাই শুধু বন্ধুত্বের নথি নয়; এটি সম্পর্কের নতুন মাপকাঠিরও ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু একই ভারত পরে শুল্কচাপ, বাজার উন্মুক্তকরণের দাবি এবং রাশিয়া-সম্পর্কিত অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়।

 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বাণিজ্য কাঠামো ঘোষণার পরও ১ অক্টোবর ২০২৬-এ মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, পূর্ণাঙ্গ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্যচুক্তি ‘আসন্ন নয়’। রয়টার্সের ১ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। এর অর্থ, চীন-প্রতিযোগিতায় ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব তাকে অর্থনৈতিক দর-কষাকষি থেকে অব্যাহতি দেয় না।

 

 

 

দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের মতো প্রধানত আফগানিস্তান-পাকিস্তান নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দেখে না। ২০০১-এর পর দীর্ঘ সময় ওয়াশিংটনের কাছে অঞ্চলটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল আফগান যুদ্ধ, আল-কায়েদা, তালেবান, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের পর কৌশলগত মানচিত্র বদলে গেছে। এখন ভারত, ভারত মহাসাগর, চীন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা একসঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

 

 

 

এই জায়গাটিই আগের কয়েকটি প্রশাসনের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করে। ওয়াশিংটন বহু বছর ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছে; ফলে পারমাণবিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতায় নয়াদিল্লিকে কিছু বিশেষ অবকাশ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ট্রাম্প আমলে সেই ‘কৌশলগত ছাড়’-এর পরিসর সংকুচিত হওয়ার যুক্তি সামনে এসেছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণে এটিকে ভারতের জন্য ‘কৌশলগত পরোপকার’-এর অবসানসদৃশ পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—অর্থাৎ অংশীদারত্ব থাকবে, কিন্তু বাজার, প্রতিরক্ষা ক্রয় ও নীতিগত ছাড়ে প্রত্যক্ষ প্রতিদান প্রত্যাশা বাড়বে। কার্নেগির ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড এ চেঞ্জিং গ্লোবাল অর্ডার’ এই ব্যাখ্যা দেয়। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বিচ্ছেদ বলা ভুল হবে। বরং সম্পর্কটি আরও কঠোর দর-কষাকষির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে—যেখানে কৌশলগত প্রয়োজন সম্পর্ক বজায় রাখে, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় সুবিধা নিশ্চিত করে না।

 

তৃতীয়ত, পাকিস্তানকে ঘিরে ট্রাম্প নীতি দেখায় যে ‘ভারতকে অগ্রাধিকার’ মানেই পাকিস্তানকে স্থায়ীভাবে প্রান্তে সরিয়ে রাখা নয়। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সহায়তা স্থগিত হয়েছিল এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রকাশ্য চাপ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, খনিজ, জ্বালানি এবং নিরাপত্তা যোগাযোগ নতুন করে জায়গা পেয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান বাণিজ্যচুক্তির কথা ঘোষণা করেন; রয়টার্স জানায়, তাতে পাকিস্তানের তেলসম্পদ উন্নয়ন এবং খনিজ খাতের সহযোগিতার বিষয় সামনে আসে।

 

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মার্কিন এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বোয়িং উড়োজাহাজ, রিফাইনারি উন্নয়ন এবং রেকো ডিক তামা-সোনা প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনাও করেন। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানকে একক নিরাপত্তা পরিচয়ে দেখে না; যেখানে মার্কিন অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থ আছে, সেখানে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ খোলা থাকে।

 

এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বড়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল—রয়টার্স তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে মার্কিন চাপ ও কূটনীতির কথা জানিয়েছিল। কিন্তু পরে নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পকে বলেন, যুদ্ধবিরতি দুই দেশের সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে হয়েছে এবং ভারত মার্কিন মধ্যস্থতা মানে না। এই বিরোধী বয়ান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজন হলে ভারত-পাকিস্তানকে আবার একই সংকট-ফ্রেমে দেখতে পারে, যদিও নয়াদিল্লি বহু বছর ধরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়কে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে। ফলে ‘ডি-হাইফেনেশন’—অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তানকে আলাদা কৌশলগত ট্র্যাকে দেখা—ট্রাম্প আমলে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত না হলেও পরিস্থিতিভেদে দুর্বল হতে পারে।

 

চতুর্থত, বাংলাদেশ ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া নীতির একটি বিশেষ পরীক্ষাগার। কারণ এখানে নিরাপত্তা জোটের চেয়ে বাণিজ্যিক দর-কষাকষি বেশি দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য প্রথমে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পারস্পরিক শুল্কের ঘোষণা এসেছিল; পরে হার কমে, এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামায় এবং নির্দিষ্ট বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য হারের একটি ব্যবস্থা তৈরির কথা বলে; এর সঙ্গে মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহারকে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যে বাজার-সুবিধা, কিছু অশুল্ক বাধা কমানো এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। হোয়াইট হাউসের যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতি এই শর্তগুলো স্পষ্ট করেছে।

 

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী প্রশ্ন তৈরি হয়। আগে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রপ্তানি, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ভারতের সঙ্গে ভূগোল ও নিরাপত্তা—এসবকে তুলনামূলকভাবে আলাদা খাতে পরিচালনা করতে পারত। ট্রাম্পের নতুন ভূ-অর্থনৈতিক পদ্ধতি এই বিভাজনকে সংকুচিত করছে। যখন একটি বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তাবনাতেই ‘জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ বিষয়ে অধিকতর সামঞ্জস্যের কথা থাকে, তখন শুল্ক বা পোশাক রপ্তানি আর নিছক বাণিজ্যিক বিষয় থাকে না। উৎপাদনে কোন দেশের কাঁচামাল ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন প্রযুক্তি মান গ্রহণ করা হচ্ছে, কোন দেশের বিনিয়োগ কৌশলগত খাতে প্রবেশ করছে—এসবও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ পক্ষ বেছে নেওয়া অনিবার্য হয়ে গেছে—এমন নয়; বরং বহুমুখী ভারসাম্য রক্ষার খরচ বেড়েছে।

 

পঞ্চমত, ট্রাম্প নীতিকে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অবসান’ হিসেবে দেখা অতিরঞ্জিত হবে। বাস্তবে মূল্যবোধের ভাষার আপেক্ষিক গুরুত্ব কমলেও শ্রমমান, জোরপূর্বক শ্রম, বাজার-নিয়ম কিংবা সরবরাহব্যবস্থার নৈতিকতা নতুন বাণিজ্যিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেকশন ৩০১-এর অধীনে ৬০ অর্থনীতির বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ কয়েকটি দক্ষিণ এশীয় দেশের পণ্যের জন্য ১০ শতাংশ হারের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়। হোয়াইট হাউসের জুলাই ২০২৬-এর সেকশন ৩০১ পদক্ষেপ একটি নতুন বাস্তবতা দেখায়: মানবাধিকার বা শ্রম অধিকারের প্রশ্ন অদৃশ্য হয়নি; বরং কখনো কখনো তা বাজারে প্রবেশাধিকার ও শুল্ক প্রয়োগের কাঠামোয় ঢুকে পড়েছে। অর্থাৎ নীতির ভাষা ‘মূল্যবোধ’ থেকে ‘প্রয়োগযোগ্য শর্তে’ সরে যেতে পারে।

 

এখানে আরেকটি সমসাময়িক সীমা চোখে পড়ে। শুল্ককে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চাপ-উপকরণ বানালেও সেই ক্ষমতা পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের হাতে নেই। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে ট্রাম্পের বিস্তৃত বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা খারিজ করে দেয়। আদালত বলেছে, ওই আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের সাধারণ ক্ষমতা দেয় না। প্রশাসন এরপর সেকশন ১২২, সেকশন ৩০১ ও সেকশন ২৩২-এর মতো অন্য আইনি পথ ব্যবহার করে শুল্কনীতি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই আইনি স্থানান্তর দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাম্পের দর-কষাকষির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের স্থায়িত্ব আদালত, কংগ্রেস এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপরও নির্ভরশীল।

 

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত নতুন সেকশন ৩০১ শুল্কও মার্কিন বাণিজ্য আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ট্রাম্পীয় ভূ-অর্থনীতির সীমা শুধু বিদেশি প্রতিরোধ নয়; মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যও এর পরিধি নির্ধারণ করে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলোর জন্য হোয়াইট হাউসের ঘোষণাকে চূড়ান্ত বাস্তবতা ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ; আইনি ভিত্তি, বাস্তবায়ন বিধি এবং আদালতের অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

ষষ্ঠত, এই নীতির শক্তি যেমন আছে, তেমনি অন্তর্নিহিত দুর্বলতাও আছে। শক্তি হলো—দর-কষাকষি দ্রুত ফল দিতে পারে। বাংলাদেশে শুল্ক নিয়ে সমঝোতা, পাকিস্তানের সঙ্গে খনিজ ও বাণিজ্য যোগাযোগ, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সহযোগিতা—সবই দেখায় যে দ্বিপক্ষীয় চাপ ও প্রণোদনা দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। কিন্তু দুর্বলতা হলো, একই পদ্ধতি অংশীদারদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ভারতকে একদিকে চীন-প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় অংশীদার বলা এবং অন্যদিকে উচ্চ শুল্ক বা তৃতীয় পক্ষসংক্রান্ত চাপ দেওয়া হলে নয়াদিল্লি বিকল্প বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদার খুঁজতে উৎসাহিত হতে পারে। ২০২৬ সালে ভারত একাধিক নতুন বাণিজ্যচুক্তি ও বাজার-বৈচিত্র্যের পথে এগিয়েছে—এটিও মার্কিন চাপের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়ানোর একটি যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।

 

 

 

 

 

ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া নীতির নতুনত্ব ‘ভারতকে বেছে নেওয়া’ বা ‘পাকিস্তানকে বাদ দেওয়া’ কিংবা ‘বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া’—এর কোনোটিই এককভাবে নয়। মূল পরিবর্তন হলো সম্পর্ককে একটি স্থায়ী শ্রেণিবিন্যাসের বদলে চলমান দর-কষাকষির কাঠামোয় রাখা। চীন-প্রতিযোগিতা এই নীতির পটভূমি, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল চীন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; মার্কিন শিল্পনীতি, বাণিজ্য ঘাটতি, জ্বালানি রপ্তানি, অস্ত্র বিক্রি, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও সমানভাবে কাজ করছে।

 

 

 

 

 

আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির অস্থিরতা। ট্রাম্প নীতিতে রাষ্ট্রনেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দ্রুত ঘোষণা এবং বড় ‘ডিল’-এর রাজনৈতিক মূল্য বেশি। এতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ভাঙতে পারে, কিন্তু নীতির ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত নিয়ে বাণিজ্য কাঠামো ঘোষণার পর অক্টোবরেও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি আসন্ন নয়—এই ব্যবধান দেখায়, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ঘোষণা বাস্তব বাজার-সমঝোতার সমার্থক নয়। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে তেল বা খনিজ সহযোগিতার ঘোষণা সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাস্তবায়ন নির্ভর করে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর। ফলে ট্রাম্পের ‘ডিলমেকিং’ কৌশলের ফল পরিমাপ করতে ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ জরুরি।

 

আরও একটি সমালোচনামূলক দিক হলো বহুপাক্ষিকতার জায়গায় দ্বিপক্ষীয় ‘ডিল’-এর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল সমস্যাগুলো—সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, জলবণ্টন, জলবায়ু ঝুঁকি, শরণার্থী, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক বাণিজ্য—কোনোটিই একক দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সমাধানযোগ্য নয়। কিন্তু ট্রাম্পীয় পদ্ধতি সমস্যাকে এমনভাবে খণ্ডিত করে, যাতে প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা দর-কষাকষি করা যায়। এতে ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লিভারেজ বাড়তে পারে, কিন্তু আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান বা অভিন্ন নিয়ম তৈরির প্রণোদনা কমে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার দুর্বল আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃনির্ভরতা কিংবা ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে একটি দেশের সঙ্গে সফল চুক্তি অন্য দেশের উদ্বেগ কমায় না। বরং আলাদা আলাদা সুবিধা ও চাপ কখনো প্রতিযোগিতামূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই ট্রাম্প নীতির দক্ষতা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে বেশি হলেও, দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে তার ফল নির্ভর করবে সেই চুক্তিগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃহত্তর কৌশলে যুক্ত হয় তার ওপর।

 

এ কারণে ‘দক্ষিণ এশিয়া নীতি’ কথাটিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন। ওয়াশিংটনের কাছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের কৌশলগত মূল্য একই উৎস থেকে আসে না। ভারতের গুরুত্ব চীন, প্রযুক্তি ও ইন্দো-প্যাসিফিক ভারসাম্যে; পাকিস্তানের গুরুত্ব নিরাপত্তা, খনিজ, মধ্যপ্রাচ্য-সংযোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনায়; বাংলাদেশের গুরুত্ব রপ্তানি, বঙ্গোপসাগর, উৎপাদনশৃঙ্খল ও আঞ্চলিক সংযোগে। শ্রীলঙ্কা বা নেপালের ক্ষেত্রে বন্দর, ঋণ, অবকাঠামো ও চীনা অর্থনৈতিক উপস্থিতি আলাদা মাত্রা যোগ করে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন একক আঞ্চলিক নকশা প্রয়োগ করছে—এমন দাবি করা কঠিন। বরং একটি সাধারণ পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হচ্ছে: যেখানে মার্কিন লিভারেজ আছে সেখানে শুল্ক, বাজার বা অর্থায়ন; যেখানে নিরাপত্তা প্রয়োজন সেখানে সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ; আর যেখানে চীনা উপস্থিতি মুখ্য সেখানে বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে আসে। এই ভিন্নতা বুঝতে না পারলে ট্রাম্পের নীতিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা হবে। এখানেই নীতিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক জটিলতা তৈরি হয়।

 

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মিত্র না প্রতিপক্ষ’—এই দ্বৈততায় বিচার না করা। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলেছে যেখানে একই দেশ প্রতিরক্ষায় অংশীদার, বাণিজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রযুক্তিতে সহযোগী এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে চাপের লক্ষ্য হতে পারে। ভারত তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ; পাকিস্তান দেখায় সম্পর্ক দ্রুত পুনর্মূল্যায়িত হতে পারে; বাংলাদেশ দেখায় ছোট ও মধ্যম শক্তির বাণিজ্যনীতি পর্যন্ত কৌশলগত নিরাপত্তার ভাষায় প্রবেশ করছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দর-কষাকষির সুযোগও বাড়ে, কারণ ওয়াশিংটন নির্দিষ্ট বিনিময়ে দ্রুত সমঝোতায় আগ্রহী। কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে, কারণ প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পাঠ তৈরি হয়।

 

সুতরাং ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া নীতির নতুনত্ব ‘ভারতকে বেছে নেওয়া’ বা ‘পাকিস্তানকে বাদ দেওয়া’ কিংবা ‘বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া’—এর কোনোটিই এককভাবে নয়। মূল পরিবর্তন হলো সম্পর্ককে একটি স্থায়ী শ্রেণিবিন্যাসের বদলে চলমান দর-কষাকষির কাঠামোয় রাখা। চীন-প্রতিযোগিতা এই নীতির পটভূমি, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল চীন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; মার্কিন শিল্পনীতি, বাণিজ্য ঘাটতি, জ্বালানি রপ্তানি, অস্ত্র বিক্রি, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও সমানভাবে কাজ করছে।

 

এ কারণেই দ্বিতীয় ট্রাম্প আমলের দক্ষিণ এশিয়া নীতিকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় ‘লেনদেনভিত্তিক ভূ-অর্থনীতি’ হিসেবে—যেখানে কৌশলগত সম্পর্ক আছে, কিন্তু সম্পর্ক নিজেই ছাড়ের নিশ্চয়তা নয়; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুনরায় মূল্য নির্ধারিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য প্রশ্ন তাই কে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ—এটি নয়; বরং কোন রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের বাজার, ভূগোল, প্রযুক্তি, সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানকে দর-কষাকষির সম্পদে রূপ দিতে পারে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় কতটা নীতিগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে।

 

  • মো. এমদাদুল হক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন অনুষদ, শানডং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন; সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।