Image description
আলফাজ আনাম

আলফাজ আনাম

বাংলাদেশের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ বরাবরই ভারতপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর শিকড় যে কতটা গভীর, তা বোঝা গেছে আওয়ামী লীগের বিগত দেড় দশকের শাসনামলে। গণবিক্ষোভে আওয়ামী শাসনের পতন হলেও দলটি এখন দিল্লির নির্দেশনায় নানাভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দল সবসময় ভিনদেশি শক্তির প্রক্সি হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন দেশে থাকা এ ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

 

বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দল কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা শক্তির আর্থিক, নীতিগত বা কৌশলগত সহায়তায় পরিচালিত হয়। এ ধরনের রাজনৈতিক দল দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদার চেয়ে বিদেশি প্রভু বা মদতদাতা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে নীতিনির্ধারণে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত, ট্রানজিট বা প্রাকৃতিক সম্পদের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে বিদেশি দেশের সুবিধার্থে অবস্থান গ্রহণ করে। দেশীয় জনসমর্থন বা অভ্যন্তরীণ গণআন্দোলনের চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বা বিদেশি দূতাবাসের সহায়তায় ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করে থাকে। স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি বা জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বিদেশি মদতদাতা রাষ্ট্রের ভাবধারা বা ভূরাজনৈতিক মতাদর্শ অনুকরণ এ ধরনের দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এছাড়া দেশীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি সংস্থার তৈরি করা বয়ান (Narrative) বা তথ্য প্রচার তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হয়।

 

বিখ্যাত জার্মান-মার্কিন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক দার্শনিক হ্যান্স মরগেনথাউ বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, “যখন কোনো রাষ্ট্র সরাসরি অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন সে রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি বা দলকে মদত দেয়। ফলে দলটি বিদেশি রাষ্ট্রের একটি ‘অভ্যন্তরীণ প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করে এবং জাতীয় স্বার্থের বদলে বিদেশি দাতাদের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করে।”

 

আমরা দেখছি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন অবস্থায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। তবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি ছক সবসময় কাজ করে না। বরং জনমত বুঝতে না পারার ব্যর্থতার কারণে নির্দেশদাতা দেশ ও প্রক্সি দলকে অনেক সময় চড়া খেসারত দিতে হয়।

 

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভারত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। হাসিনার শাসনামলে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, তার প্রতিটি নির্বাচনে ভারত ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে ভারতের নির্দেশিত পথে।

 

২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারত কোনো রাখঢাক না করে জেনারেল এরশাদকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করেছিল। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এসে এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনে যেতে নির্দেশ দেন। এরশাদ পরে তা নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে একতরফা নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ সৃষ্টি করেন সুজাতা সিং।

 

২০১৮ সালের রাতের ভোটের পুরো আয়োজন করেছিল পুলিশ। ঢাকার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় যোগাযোগের খবর সে সময় ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী দল যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছিল, তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গড়া হবে কি না, সে বিষয়টি সে দেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তাই এ নিয়ে কিছু বলা সংগত নয়। অর্থাৎ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কৌশলের সঙ্গে ভারত পুরোপুরিভাবে জড়িত ছিল।

শুধু তাই নয়, বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাব ছিল, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কত বেশিসংখ্যক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কোন দল নির্বাচনে এলো, না এলোÑসে বিবেচনার বিষয় নয়। হাসিনা আমলে প্রতিটি একতরফা নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা না এলেও ভারত থেকে পর্যবেক্ষক এসেছে এবং ‘সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন’ হয়েছে বলে সার্টিফিকেট দেওয়া হতো।

 

ভারত শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেনি, রাজনৈতিক নেতাদের গুম ও খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার প্রমাণ আছে। যেমন : জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন তিনি ভারতের কারাগারে ছিলেন। পরে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন।

 

একইভাবে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে নেওয়া হয়েছিল। বছরের পর বছর তিনি সেখানে বন্দি ছিলেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে ফিরে আসেন। লক্ষ করার বিষয় হলো, সুখরঞ্জন বালি কিংবা সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতের মদতপুষ্ট সরকারের পতনের পর শুধু দেশে ফিরে আসতে পেরেছিলেন।

 

আওয়ামী লীগ সরকার কীভাবে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করেছে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে এ দেশে ভারত কার্যত এক ধরনের ঔপনিবেশে পরিণত করেছিল। কী ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার উদাহরণ দিয়ে নূরুল ইসলাম মনি জানান, চট্টগ্রাম পোর্টে বাংলাদেশ ও বন্ধুদেশের দুটি জাহাজ একসঙ্গে এলে বন্ধুদেশের জাহাজ আগে খালাস হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী এমন অসংখ্য চুক্তি করে গেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলছেন, সরকার সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

 

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির প্রধানসহ শীর্ষ নেতারা দ্রুত ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে বসে এখন তারা বাংলাদেশবিরোধী নানা ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে থাকছে ভারত সরকারের সমর্থন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় যারা সরাসরি ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

মাঠপর্যায়ে থাকা নেতাকর্মীদের এক ধরনের ফ্যান্টাসিতে আচ্ছন্ন করা হয়েছে, তাদের নেত্রী আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের প্রচারবিদরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এ ধরনের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন—ভারত সরকার চাইলে চাপ প্রয়োগ করে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করবে হাসিনাকে ফেরত আনতে। এমনকি ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করবে—এমন অলীক কল্পনার মধ্যেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, পরাজিত-বিধ্বস্ত নেতাকর্মীদের এই ধারণা দেওয়া হচ্ছে, ভারত হতে পারে তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ।

 

আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের একটি অংশ আবার মূলধারার গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে। যেহেতু ফ্যাসিস্ট কাঠামো এখনো বহাল আছে, সে কারণে আমলাতন্ত্র ও গণমাধ্যমের একটি অংশ নীরবে এদের জন্য পথ তৈরি করছে।

 

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যখন কোনো রাজনৈতিক দল বিদেশি রাষ্ট্রের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন আর সে দলটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington) তার পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটি (Political Order in Changing Societies) বইয়ে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বা বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বলছেন, যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতা অর্জন বা তা বজায় রাখার জন্য অভ্যন্তরীণ সংগঠনের চেয়ে বিদেশি সহায়তার ওপর বেশি নির্ভর করে, তা স্বভাবগতভাবেই ভঙ্গুর এবং সেই সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে দলটির টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতার সুবিধা বা বাহ্যিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে এদের পরিণতি অত্যন্ত বিপর্যয়কর হয়। আওয়ামী লীগের পরিণতিও একই রকম হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের দলগুলো ইতিহাস ও জনগণের আদালতে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘প্রক্সি শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে চরম পরিণতি ভোগ করেছে।

 

গণঅভ্যুত্থান কিংবা পটপরিবর্তনের পর মদতদাতা রাষ্ট্র যখন সমর্থন গুটিয়ে নেয়, তখন এই দলগুলোর শীর্ষ নেতারা নিজেদের দেশে আর টিকে থাকতে পারেন না। তাদের জীবন বাঁচাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে হয় অথবা জনগণের হাতে তারা বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হন। বিদেশি মদতপুষ্ট দলগুলোর পরিণতি প্রায় সবসময়ই একসূত্রে গাঁথা—তারা সাময়িক ক্ষমতা অর্জন করলেও দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় রাজনীতি থেকে চিরতরে মুছে যায়। আওয়ামী লীগ এখন এই পরিণতি ভোগ করছে।

 

ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে দেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য বিদেশি মদতপুষ্ট রাজনীতি চলতে পারে না।